সর্পটি মানুষের মত যুক্তি খাড়া করে এমনভাবে ফলের গুণ সম্বন্ধে বোঝাতে লাগল যে আমিও এই ফল ভক্ষণ করে দেখলাম তার কথাই ঠিক। আমার জ্ঞানচক্ষু সত্যিই খুলে গেল। মনের তেজ বেড়ে গেল। আমার অন্তর প্রসারিত হলো। আমি দেবতাদের মত হয়ে উঠলাম। তখন তোমার কথা মনে পড়েছিল, কারণ যে সুখে তোমার অংশ নেই, সে সুখ তুচ্ছ আমার কাছে।
সুতরাং তুমিও এ ফল আস্বাদন করো। দুজনের ভাগ্য, আনন্দ, প্রেম এক হোক। আমাদের দুজনের মধ্যে যেন কোন পার্থক্য বা তারতম্য না থাকে। ভাগ্য সুপ্রসন্ন না হলে দুজনেই আমরা সমান দুঃখ ভোগ করব।
ঈভ তার গণ্ডদ্বয়কে আনন্দে উজ্জ্বল করে এই কথা বলল। কিন্তু অচিরেই সে গণ্ডদ্বয় ম্লান হয়ে গেল।
এদিকে আদম ঈভের এই মারাত্মক নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের কথা শুনে বিস্ময়ে ও বেদনায় অভিভূত হয়ে পড়ল। প্রাণহীন প্রস্তরস্তম্ভের মত শূন্যদৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে রইল সে। এক হিমশীতল ভয়ের স্রোত শিরায় শিরায় বয়ে যেতে লাগল তার। ঈভকে পরাবার জন্য যে মালাটি হাতে ছিল তার, সে মালাখানি মাটিতে পড়ে গেল তার হাত থেকে।
অবশেষে সে সেই অস্বস্তিকর নীরবতা ভঙ্গ করে বলল, হে সকল সৌন্দর্যের রানী, সব বিশ্বের সকল বস্তুর সারভৃতা সত্তা! আজ মুহূর্তের মধ্যে কিভাবে সকল মহিমা হারিয়ে ফেললে তুমি! আজ তুমি সকল সৌন্দর্য ও সকল সম্মান হতে বিচ্যুত হয়ে নিজের মৃত্যুকে নিজেই ডেকে আনলে। আজ তোমার সত্তার সকল মহিমা অপগত! কেমন করে লোভের বশবর্তী হয়ে ভুলে তুমি নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ করলে? কেমন করে কোন্ সাহসে ঈশ্বরের নিষেধাজ্ঞা লঙঘন করলে? নিশ্চয় কোন অজাতশত্রু অলক্ষ্যে থেকে প্রভাবিত করেছে তোমাকে। নিজের সঙ্গে সঙ্গে তুমি আমার সর্বনাশ নিয়ে এলে। কারণ তোমার সঙ্গে আমিও মৃত্যুবরণ করার জন্য দৃঢ়সংকল্প।
তোমাকে ছাড়া কি করে আমি বাঁচব? তোমার মধুর কথাবার্তা, তোমার গভীর ভালবাসা, তোমার অবিরাম সাহচর্য সব হারিয়ে কেমন করে একা থাকব আমি এই বিশাল অরণ্যপ্রদেশে?
ঈশ্বর কি আর এক ঈভ সৃষ্টি করবেন আমার আর একটি পাঁজর থেকে? লু আমার অন্তর থেকে তোমার অন্তরের ক্ষত মুছে যাবেনা কখনো। হে আমার অর্ধাঙ্গিনী, আমার অস্থিমজ্জার আর এক প্রতিমূর্তি, একই প্রকৃতির দ্বারা অবিচ্ছেদ্যভাবে আবদ্ধ আমরা। সুখ-দুঃখ যাই হোক, আর কখনই আমরা বিচ্ছিন্ন দ্য না পরস্পরের কাছ থেকে।
এই কথা বলে কিছুটা সান্ত্বনা পেল আদম। এরপর ঈভের দিকে ঘুরে আবার শান্ত কণ্ঠে বলতে লাগল, হে দুঃসাহসী ঈত, তুমি ঐ নয়নমনোস্ত্র পবিত্র ফল আস্বাদন করে এক বিপজ্জনক কাজ করেছ। যে ফল স্পর্শ করা নিষিদ্ধ তা তুমি ভক্ষণ করেছ। কিন্তু যা হয়ে গেছে তা আর ফিরবে না। হয়ত ঈশ্বর বা নিয়তি সর্বশক্তিমান নয়। হয়ত তুমি মরবে না। কাজটা হয়ত যতটা ভয়ঙ্কর ভেবেছিলে ততটা ভয়ঙ্কর নয়। সর্প তোমার আগেই সে ফল ভক্ষণ করায় সে ফল তার অলৌকিকত্ব হারিয়ে সাধারণের ভক্ষ্য হয়ে উঠেছে। তুমি বলছ সে এখনো জীবিত আছে এবং পশু হয়ে বাকশক্তি লাভ করেছে মানুষের মত। তাহলে এ ফল ভক্ষণ করে আমরাও সেই অনুপাতে উন্নততর জীবন লাভ করতে পারি। দেবতা অথবা দেবতার সমান দৈবীশক্তি লাভ করতে পারি। পরম স্রষ্টা ঈশ্বরের মত সর্বজ্ঞ আমাদের যতই ভীতি প্রদর্শন করুন ধ্বংস করবেন বলে, তিনি নিশ্চয়ই তাঁরই সৃষ্ট জীব আমাদের ধ্বংস করবেন না। শেষ পর্যন্ত। আমরা হচ্ছি তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, উদার মর্যাদাসম্পন্ন। আমাদের যদি পতন হয় তাহলে যে কাজের জন্য ঈশ্বর আমাদের নিযুক্ত করেছেন, সে কাজ পণ্ড হয়ে যাবে। তাহলে ঈশ্বরকে নিজের হাতে তাঁর সৃষ্টিকে ধ্বংস করে তার সমস্ত শ্রমকে ব্যর্থ করে দিতে হবে নিজের হাতে। ঈশ্বর সম্বন্ধে এমন ধারণা আমরা পোষণ করতে পারি না। আবার নূন করে কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতা ঈশ্বরের আছে। কিন্তু সেই সঙ্গে আমাদের উচ্ছেদসাধন করতে নিশ্চয়ইরমন চাইবেনা। তাহলে তার প্রতিপক্ষের জয় হবে এবং সে বলবে ঈশ্বরের অনুগ্রহ কত চঞ্চল, কত অস্থায়ী। তিনি প্রথমে আমাকে ধ্বংস করে পরে মানবজাতিকে ধ্বংস করবেন। এরপর কাকে ধ্বংস করবেন? এইভাবে তাঁকে ঘৃণা করার সুযোগ তিনি ভঁর শত্রুকে দেবেন না নিশ্চয়। আমি তোমার সঙ্গে আমার ভাগ্যকে নির্ধারিত করে ফেলেছি। মৃত্যু বা ধ্বংসের অভিশাপ যদি নেমে আসে তাহলে দুজনে একসঙ্গে তা ভোগ করব। তোমার যদি মৃত্যু হয় তাহলে সে মৃত্যু জীবনে খুবই বরণীয় হয়ে উঠবে আমার কাছে। প্রকৃতির এক অচ্ছেদ্য বন্ধনে এমনভাবে আবদ্ধ আছি আমরা যে আমাদের মধ্যে কেউ সে বন্ধন ছিন্ন করতে পারবে না। আমরা হৃদয়ে এক, একই রক্তমাংসে গঠিত। তোমাকে হারানো মানেই আমার নিজেকে হারানো।
আদম এই কথা বললে ঈভ তাকে বলল, তোমার প্রেমাতিশয্যের কী অপূর্ব পরীক্ষা, কী উজ্জ্বল ও উচ্চমানের দৃষ্টান্ত! কিন্তু তোমার পূর্ণতার অংশ কেমন করে আমি লাভ করব আদম যাতে আমি তোমার পার্শ্বদেশ থেকে উদ্ভূত হয়েছি একথা আমি গর্বের সঙ্গে বলতে পারি? তুমিই এমনি আমাদের অচ্ছে মিলনের কথা বললে। তোমার সংকল্পের কথা ঘোষণা করে আমাদের মিলন কত নিবিড় তার প্রমাণ দিলে। মৃত্যু বা মৃত্যুর থেকে ভয়ঙ্কর কোন শক্তিই আমাদের বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না। তুমি আমার প্রতি এক গভীর ভালবাসার বন্ধনে এমনভাবে বিজড়িত হয়ে আছ যে, এই ফল ভক্ষণের জন্য যদি কোন অপরাধ বা পাপ হয়ে থাকে আমার তাহলে সে অপরাধ ও সে পাপের শাস্তি মাথা পেতে নিতে রাজি আছ তুমি। আজ এই ফলের আস্বাদ এক মহা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আমাদের প্রেমের গুণ ও শক্তিকে অভ্রান্তভাবে প্রমাণ করে দিল যার কথা এর আগে কখনো জানতে বা বুঝতে পারিনি আমরা।
