কুটিল সর্পরূপী শয়তান তার কু-অভিসন্ধি সিদ্ধ করে ঝোঁপের মধ্যে নিঃশব্দে প্রবেশ করল। এদিকে ঈভ সব কিছু ভুলে গিয়ে ফলের আস্বাদে মত্ত হয়ে শুধু ফল খেয়ে যেতে লাগল। এমন ফল জীবনে কোনদিন আস্বাদন করেনি সে।
আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে উঠল সে। সে আনন্দের সঙ্গে ছিল জ্ঞানলাভের এক নিশ্চিত প্রত্যাশা। কোন ঈশ্বরচিন্তা ছিল না তার মনে। কোন মৃত্যুভয় ছিল না অন্তরে। সে শুধু অবাধে একান্ত অসংযতভাবে জ্ঞানবৃক্ষের নিষিদ্ধ ফলগুলি খেয়ে যেতে লাগল।
অবশেষে অতিমাত্রায় তৃপ্ত হয়ে আপন মনে সে বলতে লাগল, হে বৃক্ষদের রানী, এতদিন তোমার গুণ ও মূল্যের কথা জানা ছিল না। আজ বুঝলাম, গুণ ও মূল্যের দিক থেকে তুমি সকল বৃক্ষের শ্রেষ্ঠ। এতদিন তোমার শাখায় যে ফলগুলি ঝুলত তা আস্বাদন করতে পেতাম না আমরা। তাই কোন মূল্যই ছিল না তাদের আমাদের কাছে।
এবার থেকে প্রতিদিন তোমার ফল খেয়ে জ্ঞান বৃদ্ধি করব আমাদের। তোমার প্রশংসা ও গুণগান করব প্রতিদিন সকালে। তোমার শাখা-প্রশাখাগুলি সব সময় প্রচুর পরিমাণ ফলে পরিপূর্ণ হয়ে থাক। সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে তুমি।
যে বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করে জ্ঞানের দিক থেকে পরিণতি লাভ করব আমরা সে বৃক্ষ দেবতারা আমাদের দান করেননি। এ বৃক্ষ তারা দান করতে পারেননি বলে ঈর্ষাবশত তার ফলকে নিষিদ্ধ করে রেখেছেন আমাদের কাছে।
হে বৃক্ষ, তোমার দ্বারাই আমি অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। আমার সকল জ্ঞানের জন্য তোমার কাছে ঋণী আমি। তুমিই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক। তোমাকে এতদিন অনুসরণ করিনি বলেই আমি এতদিন অজ্ঞ ছিলাম। আজ জ্ঞানের পথকে উন্মুক্ত ও প্রসারিত করো আমার জীবনে। এই জ্ঞান গোপনতার গুহার মধ্যে নিহিত থাকলেও সেখানে আমাকে প্রবেশাধিকার দাও।
ঈশ্বর এই পৃথিবীর থেকে অনেক দূরে মনের ঊর্ধ্বে বিরাজ করেন। অসংখ্য চরদ্বারা পরিবৃত আমাদের মহান বিধাতাপুরুষ সদাজাগ্রত প্রহরীর মত এই মর্ত্যলোকের সব কিছু লক্ষ্য করলেও এখানকার অনেক ঘটনা হয়ত অজানিত রয়ে যায় তার কাছে।
কিন্তু আদমের কাছে আমি কিভাবে যাব? আমি কি তাকে আমার এই পরিবর্তনের কথা জানিয়ে আমার এই নবলব্ধ জ্ঞানসমৃদ্ধ সুখের সমান অংশ দান করব অথবা তাকে কিছুই না জানিয়ে এই জ্ঞানকে আমার শক্তির মধ্যে, আমার মধ্যে, আমার অধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখব? তাকে আমার সহ অংশীদার করব না এ বিষয়ে? আমি তার সমান হয়েও নারী হিসাবে কি তার প্রেমাকর্ষণের জন্য আমার জ্ঞানগত স্বাধীনতা ও শ্রেষ্ঠত্বকে বজায় রেখে চলব? এটাই হয়ত ভাল হতে পারে।
কিন্তু যদি এই ঘটনা ঈশ্বর প্রত্যক্ষ করে থাকেন এবং যদি এর ফলে আমাকে মৃত্যুবরণ করতে হয়? তাহলে আমি আর এ পৃথিবীতে থাকব না এবং আদম তখন আর একজন ঈভকে বিবাহ করে তাকে তার জীবন-সঙ্গিনী করে তুলবে। তখন আমার অবর্তমানে তাকে নিয়ে সুখে বাস করতে থাকবে সে। সুতরাং আমি নিশ্চিতরূপে দৃঢ়তার সঙ্গে স্থির করলাম আদমকেও আমি আমার এই পরম স্বর্গীয় সুখের সমান অংশ দান করব। আমি তাকে এত গভীরভাবে ভালবাসি যে আমি তার সঙ্গে হাসিমুখে মৃত্যুবরণ করতে পারব। কিন্তু তাকে ছেড়ে জীবনে বেঁচে থেকেও বাঁচার কোন আনন্দ পাব না।
এই বলে সেই বৃক্ষতল হতে তার স্বামীর সন্নিধানে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়াল ঈভ। কিন্তু যাবার আগে যে অলৌকিক বৃক্ষ দেবতাদের পানীয় অমৃত থেকে তার প্রাণরস আহরণ করে, তার অন্তর্নিহিত শক্তির প্রতি নত হয়ে শ্রদ্ধা জানাল।
এদিকে আদম সর্বক্ষণ ঈভের প্রত্যাগমন কামনায় উন্মুখ হয়ে অধীর আগ্রহের সঙ্গে প্রতীক্ষা করছিল তার। তার একক শ্রমকে সম্মানিত করার জন্য উপহারস্বরূপ তার গলদেশকে শোভিত করবে বলে বাছাই করা বিচিত্র ফুল দিয়ে একখানি মালা গেঁথে রেখে দিয়েছিল সযত্নে। চাষীরা প্রায়ই ফসলের রানী বা দেবীর উদ্দেশ্যে এমনি করে মালা গেথে রাখে।
ঈভের দীর্ঘ বিলম্বিত প্রত্যাবর্তনে কতখানি আনন্দ ও সান্ত্বনা লাভ করবে আদম শুধু একা একা সেই কথাই ভাবছিল। তবে সেই সঙ্গে এক অজানিত আশঙ্কা মনটাকে পীড়িত করছিল তার।
এইসব ভাবতে ভাবতে আজ সকালে তার কাছে বিদায় নিয়ে যে পথে গিয়েছিল ঈভ সেই পথ ধরে এগিয়ে যেতে লাগল আদম। যেতে যেতে জ্ঞানবৃক্ষের কাছে আসতেই ঈভের দেখা পেয়ে গেল। তখন সবেমাত্র সেই জ্ঞানবৃক্ষের তলা থেকে ফিরছিল ঈভ। তার হাতে ছিল কতকগুলি উজ্জ্বল ফলে ভরা একটি সদ্যভগ্ন শাখা। অমৃতের সুবাস ছড়িয়ে পড়ছিল চারদিকে।
ঈভ বলল, আমার দেরি হওয়াতে তুমি হয়ত আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলে। তোমার সাহচর্য হতে বঞ্চিত হওয়ায় তোমার অভাবটাকে দীর্ঘ মনে হচ্ছিল আমার। বিরহের বেদনা আজকের মত আর কখনো অনুভব করিনি। তবে এই শেষ। এ ভুল আর কখনো করব না আমি। বিচ্ছেদের বেদনা আর কখনো অনুভব করতে হবে না কাউকে। আর আমি হটকারিতার সঙ্গে আমার শক্তি পরীক্ষার জন্য আর কোথাও যাব না তোমাকে ছেড়ে।
তবে আমার বিলম্বের কারণটা বড় অদ্ভুত। আশ্চর্য হয়ে যাবে তা শুনে। আমাদের যা বলা হয়েছিল তা কিন্তু সত্য নয়। এই বৃক্ষের ফল আস্বাদন মোটেই বিপজ্জনক নয়। এ ফল ভক্ষণ করলে অজানিত কোন অশুভ শক্তি মুখব্যাদান করে গ্রাস করতে আসে না। বরং যারা এ ফল আস্বাদন করে তাদের দেবতাদের মত জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হয়ে যায়। একটি সর্প এই ফল ভক্ষণ করে মরেনি বরং সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মত জ্ঞান ও কণ্ঠস্বর লাভ করেছে। অথচ আমাদের মৃত্যুভয় দ্বারা শাসানো হয়েছিল।
