তাছাড়া আমরাই দেবতাদের বড় করে দেখি। আমাদের বিশ্বাস তারা আমাদের থেকে শ্রেষ্ঠ। তারাই সব কিছু সৃষ্টি করে, দান করে। এই শ্রেষ্ঠত্বের সুযোগ নেয় তারা।
কিন্তু আমি এসব বিশ্বাস করি না। এই সুন্দর পৃথিবীতে সূর্যালোক পতিত হয়ে সব বস্তু সৃষ্টি করে, স্বর্গলোকে তা করে না। ঈশ্বর বা দেবতারাই যদি সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা, তাহলে ভালমন্দের জ্ঞানসমন্বিত এই জ্ঞানবৃক্ষ কে সৃষ্টি করল? যে বৃক্ষের ফল খেয়ে দেবতাদের অনুমতি ছাড়াই সব জ্ঞান লাভ হবে সে বৃক্ষ সৃষ্ট হলো কেন এবং কার দ্বারা? মানুষ যদি জ্ঞান লাভ করে, ভালমন্দের কারণ জানতে পারে, তবে তাতে অপরাধ কোথায়? তাতে ঈশ্বর বা দেবতাদেরই বা কি ক্ষতি হবে? আর সকল বস্তুই যদি ঈশ্বরের দ্বারা সৃষ্ট হয়, তাঁর বিধান মেনে চলতে বাধ্য হয় তাহলে এই বৃক্ষ কি শুধু অর সে বিধানের বাইরে? এ বৃক্ষ তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেনই বা নিষিদ্ধ ফল দান করে? এখানে কোন বাধা নেই। আমি তো ইচ্ছামতো সে ফল তুলে খেয়েছি। এই বৃক্ষ তো আমায় বাধা দেয়নি। কোন অসম্মতি প্রকাশ করেনি। তবে কি শুধু মানবজাতির প্রতি ঈর্ষাবশতই ঈশ্বর এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন? কিন্তু ঈর্ষা ঈশ্বরের মনে থাকবে কেন? যিনি সমস্ত গুণের আকর তিনি ঈর্ষার মত একটি কুটিল দোষকে লে পোষণ করে রাখবেন আঁর বুকে?
সুতরাং গেমার এই সুন্দর ফলভক্ষণের যে প্রয়োজন আছে সে প্রয়োজন সিদ্ধ করার পিছনে অনেক কারণ অনেক যুক্তি আছে। অতএব হে মানবরূপিণী দেবী, তুমি অবিলম্বে ঐ ফল অবাধে ভক্ষণ করে।
এই বলে থামল সেই সরূপী শয়তান। তার ছলনার কথাগুলি সহজেই প্রবেশ করুল ঈরে অন্তরে।
জ্ঞানবৃক্ষের ফলগুলির পানে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল ঈভ। সেই সুন্দর ও সুগন্ধি ফলগুলি দেখামাত্রই লোভ আসছিল তার মনে, তার উপর শয়তানের প্ররোচনামূলক ও যুক্তিপূর্ণ কথাগুলি তখনো কানে বাজছিল তার। সে কথাগুলিকে সত্য বলে মনে হচ্ছিল তার।
এদিকে তখন বেলা দুপুর হয়ে ওঠায় ক্ষুধা জেগে উঠল তার মধ্যে। ফলগুলির মিষ্ট গন্ধ তার সে ক্ষুধাকে আরও বাড়িয়ে দিল। সে ফল খেয়ে ক্ষুধা নিবৃত্ত করতে ইচ্ছা হলো তার। কামনাতুর হয়ে উঠল তার দৃষ্টি। তবু সেই বৃক্ষতলে দাঁড়িয়ে একবার ভাবতে লাগল ঈভ।
ঈভ তখন মনে মনে বলল, হে সর্বোত্তম ফরাজি, নিঃসন্দেহে তোমাদের গুণ কত মহান। তুমি মানুষের কাছে নিষিদ্ধ, তবু প্রশংসার যোগ্য। তোমার ঐন্দ্রজালিক আস্বাদ মূককে দিয়েছে বাকশক্তি, বাকশক্তিহীন পশুর জড় জিহ্বা মুখর হয়ে উঠেছে তোমার গুণগানে।
যে ঈশ্বর তোমাকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন আমাদের কাছে, তিনিও তোমার গুণের কথা গোপন রাখেননি আমাদের কাছে। তাই তিনি তোমার নামকরণ করেছেন জ্ঞানবৃক্ষ। তোমার মধ্যে ভালমন্দের দুই জ্ঞানই আছে। তিনি তোমার সম্বন্ধে যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন সেই নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তোমার আলোকসামান্য গুণের কথাই প্রমাণিত হয়। তোমার আস্বাদনকারী জীবকে যে মঙ্গল দান করো সে মঙ্গলে আমাদের প্রয়োজন। আছে। কারণ শুধু মঙ্গলই যথেষ্ট নয়, মঙ্গলের জ্ঞানই হলো সবচেয়ে বড় কথা। যে ভাল বা যে মঙ্গল সম্বন্ধে আমাদের কোন জ্ঞান নেই সে জ্ঞান বা মঙ্গল লাভ করা বা না করা দুই-ই সমান আমাদের কাছে।
মঙ্গল-অমঙ্গলের এই জ্ঞানকে ঈশ্বর নিষিদ্ধ করেছেন আমাদের জন্য। আমরা জ্ঞানী হতে পারব না। এই নিষেধাজ্ঞা লঙঘন করা এখন এমন কিছু কঠিন নয়। এই নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করলে যদি মৃত্যু আমাদের গ্রাস করে তাহলে আমরা জ্ঞান বা অন্তরে স্বাধীনতা নিয়ে কি করব?
ঈশ্বর বলেছেন, যেদিন আমরা এই ফল ভক্ষণ করব সেইদিনই আমাদের মৃত্যু ঘটবে। কিন্তু এই সর্পের মৃত্যু হলো না তো। সে এই ফল ভক্ষণ করেও এখনো বেঁচে আছে। যুক্তির সঙ্গে কথা বলছে, তার জ্ঞানের পরিচয় দিচ্ছে। তাহলে এ নিষেধাজ্ঞার মধ্যে যুক্তি কোথায়?
তাহলে এ বিষয়ে মৃত্যু কি শুধু আমাদের জন্য উদ্ভাবিত হয়েছিল? তবে কি এই সব জ্ঞানগর্ভ ফলগুলি থেকে মানবজাতিকে বঞ্চিত করে পশুদের জন্য সংরক্ষিত করে রাখা হয়েছে?
আমরা একে পশু বলছি বটে, কিন্তু এর আচরণ তো পশুর মতো নয়। পশু হলেও এর মনে কোন ঈর্ষা নেই। ফলভক্ষণের সঙ্গে সঙ্গে যে শুভ ফল লাভ করেছে জীবনে, মানুষকে বন্ধুভাবে সেই ফলের গুণের কথা আনন্দের সঙ্গে বলতে এসেছে। তাহলে আমার ভয়ের কি আছে? ভাল-মন্দের জ্ঞানবিবর্জিত হয়ে অজ্ঞতার অন্ধকারে থাকাটাই তো সবচেয়ে খারাপ অবস্থা। কিসের ভয়? ঈশ্বরের বিধানের ভয়? না কি অন্য কোন শক্তির ভয়?
এই স্বর্গীয় ফলের মধ্যেই আছে সকল ভয়, সকল উদ্বেগ হতে মুক্তি এবং শান্তি। এ ফল দেখতে যেমন সুন্দর, আস্বাদে যেমন মধুর, তেমনি গুণের দিক থেকে জ্ঞানদানের শক্তিসম্পন্ন।
সুতরাং এ ফল স্পর্শ করতে বাধা কোথায়? এ ফল ভক্ষণ করে কেন আমি দেহ ও মনকে পরিতৃপ্ত করব না?
এই কথা বলা শেষ হতেই সে সেই অভিশপ্ত মুহূর্তে হস্ত সঞ্চালন করে সেই জ্ঞানবৃক্ষ হতে ফল তুলে খেতে শুরু করল।
সঙ্গে সঙ্গে ব্যথা বাজল পৃথিবীর বুকে। যেন এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি হলো। বাতাস ও গাছপালার মধ্য দিয়ে দুঃখে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল পৃথিবী। পৃথিবী বুঝতে পারল আজ শেষ হয়ে গেল মানবজাতির ভবিষ্যৎ।
