এরজন্যই আমি এখানে এসে থেকে তাকিয়ে আছি তোমার দিকে। তোমাকে পূজা করতে ইচ্ছা করছে। হে আদি মানবমাতা, মানবী হয়েও তুমি দেবী।
চতুর সর্পরূপী শয়তান এই কথা বললে তার চাতুর্য ও ছলনা কিছু ধরতে না পেরে ঈভ বলল, সেই আশ্চর্য ফলের গুণ সম্বন্ধে তোমার অতি প্রশংসার কথা শুনে মনে সন্দেহ জাগছে আমার। বল, সে ফলের গাছ কোথায় আছে? এখান থেকে কত দূরে? কারণ এই স্বর্গদ্যানে ঈশ্বরের অনেক রকমের গাছ আছে এবং তাদের সংখ্যা এত বেশি যে অনেক গাছের ফল আমরা স্পর্শ করিনি এখনো পর্যন্ত। কারণ আমাদের পছন্দমত ফল হাতের কাছেই প্রচুর পেয়ে যাই। আরো অনেক মানুষ না আসা পর্যন্ত অনেক গাছের ফল ঝুলতে থাকবে, কেউ তাদের পাড়বে না।
তা শুনে সর্পরূপী শয়তান খুশি হয়ে বলল, হে রানী, পথ তো প্রস্তুত হয়েই রয়েছে এবং সে পথ দীর্ঘ নয়। কয়েকটা গাছের সারির পাশ দিয়ে গিয়ে একটা ঝর্ণার ধারে একটা সমতল জায়গা পাওয়া যাবে। সেখানে একটা ঝোঁপের ধারেই। আছে সেই গাছটা। তুমি চাইলে আমিই সেখানে তোমাকে নিয়ে যাব।
ঈভ বলল, তাহলে আমাকে সেখানে নিয়ে চল।
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে এক অদম্য আনন্দে বুকটা স্ফীত হয়ে উঠল শয়তানের। রাত্রির পুঞ্জীভূত একধরনের বাষ্প থেকে হঠাৎ জ্বলে ওঠা আলেয়ার আলো যেমন নৈশপথিককে ভুল পথে চালিত করে তেমনি সেই আপাত-উজ্জ্বল চকচকে সর্পরূপ শয়তান আমাদের সরলতম আদিমাতাকে প্রতারিত করে সেই নিষিদ্ধ গাছটির কাছে নিয়ে গেল। সেই গাছই হলো মানবজাতির সকল দুঃখের মূল।
সে গাছ দেখে ঈভ বলল, হে সর্পরাজ, এখানে না এলেই ভাল হত। এ গাছে অনেক ফল থাকলেও আমার কাছে তা নিষ্ফল। এ গাছের ফলের গুণ তোমার কাছেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাক। তাতে আমার কোন প্রয়োজন নেই কারণ এ গাছের ফল আমরা স্পর্শ বা ভক্ষণ করতে পারব না। ঈশ্বরের আদেশ। আর সব বিষয়েই আমরা স্বাধীন হলেও এই একটা বিষয়ে তাঁর এই নিষেধাজ্ঞাকে মেনে চলতে হয় আমাদের। অন্য সব বিষয়ে আমাদের আইনের বিধান আমরাই রচনা করি। আমাদের যুক্তিই আমাদের আইন।
তখন সর্প বলল, তাই নাকি? এই বাগানের সব গাছের ফল খেতে ঈশ্বর তোমাদের তাহলে নিষেধ করেছেন?
নিষ্পাপ ঈভ তখন বলল, এই বাগানের মধ্যে এই একটিমাত্র গাছের ফল ছাড়া আর সব গাছের ফল আমরা খেতে পারি। ঈশ্বর শুধু বলেছেন এ গাছের ফল তোমরা খাবে না বা স্পর্শ করবে না। তাহলে তোমাদের মৃত্যু ঘটবে।
এই কথা শেষ হতে না হতে সর্পরূপী শয়তান একই সঙ্গে মানবজাতির প্রতি ভালবাসা এবং ঈশ্বরের অন্যায়ের প্রতি এক ঘৃণামিশ্রিত ক্রোধের ভাব দেখাল। তারপর প্রাচীন এথেন্স বা রোমের কোন কুশলী বাগ্মীর মতো কোন ভূমিকা না করেই আবেগের সঙ্গে বলতে লাগল, হে পবিত্র প্রজ্ঞাসম্পন্না, জ্ঞানদাত্রী বৃক্ষলতা, সকল জ্ঞানবিজ্ঞানের জননী, এখন আমি তোমার শক্তি আমার সমস্ত অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করতে পারছি। তোমার প্রসাদে শুধু জাগতিক সমস্ত বস্তু ও ঘটনার কারণ জানতে পারা যায় না, তোমার দ্বারা যাদের আমরা পরম জ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ বলে মনে করি সেই স্বর্গবাসী দেবতাদের জীবনযাত্রাপ্রণালী ও কর্মপদ্ধতির বা রীতিনীতিরও অনেক কিছু জানতে পারি আমরা।
হে বিশ্বজগতের রানী! বিধাতার কঠোর বিধানজনিত মৃত্যুর ভয় তুমি করো না। ও বিধানে বিশ্বাস করো না। মৃত্যু তোমার হতে পারে না। কেন মরবে তুমি? ঐ ফল খেয়ে? বরং তুমি ঐ ফল ভক্ষণ করে প্রভাপূর্ণ এক নবজীবন লাভ করবে। আমার দিকে একবার তাকিয়ে দেখ, আমি ঐ ফল স্পর্শ করে ও ভক্ষণ করে এখনো বেঁচে আছি। শুধু তাই নয়, বিধির বিধানে যে জীবন আমি লাভ করেছিলাম তার থেকে পূর্ণতর এক জীবন লাভ করেছি। আমি আমার বিধিনির্দিষ্ট সীমাকে লঙঘন করে ঊর্ধ্বে হাত বাড়িয়ে চেষ্টা করে এ জীবন লাভ করেছি। যে জ্ঞান পশুর কাছে উন্মুক্ত তা কি মানুষের কাছে রুদ্ধ থাকতে পারে? মৃত্যুযন্ত্রণার ভয়ের গণ্ডীর মধ্যে আবদ্ধ ছিল যে জ্ঞান, অদম্য নির্ভীক প্রচেষ্টার দ্বারা সে জ্ঞান তুমি লাভ করবে, ঈশ্বর তোমার উপর ক্রুদ্ধ হবেন না, বরং তোমার গুণের প্রশংসা করবেন, বরং তিনি স্বীকার করবেন, মৃত্যু যে পদার্থই হোক, তার যন্ত্রণা যত দুঃসহই হোক, তার দ্বারা নিবারিত না হয়ে তুমি সেই পরম বস্তু লাভ করেছ যা তোমাকে দেবে বৃহত্তর সুখের সন্ধান, যা দেবে ভালমন্দের পরম জ্ঞান। শুধু ভালর জ্ঞানই যথেষ্ট নয়, যা কিছু মন্দ বা অশুভ, যা জীবনে একটি অতি বাস্তব ও অপরিহার্য ঘটনা, তার জ্ঞান যদি আমরা লাভ করতে না পারি তাহলে কেমন করে তাকে পরিহার করি বলতো?
সুতরাং ঈশ্বর তোমার কোন ক্ষতি করতে পারেন না, বরং তিনি ন্যায়সম্মত আচরণ করবেন। ঈশ্বর যদি ন্যায়পরায়ণ না হন তাহলে তিনি ঈশ্বরই নন। তাহলে কেন কে ভয় করবে? কেন তাঁকে মান্য করে চলবে? তোমার এই অর্থহীন মৃত্যুভয়ই অন্য সকল ভয় দূরীভূত করে দিচ্ছে।
একবার ভেবে দেখতো, এই ফল কেন নিষিদ্ধ হয়? কেন ভীতি প্রদর্শন করা য়? তুমি তার ভক্ত ও উপাসিকা হলেও নে তোমাকে নীচু ও অজ্ঞ করে রাখা হবে? তিনি জানেন যেদিন তুমি ঐ ফল ভক্ষণ করবে সেদিন তোমার ঐ ম্লান চক্ষুদুটি পরিষ্কার ও উজ্জ্বল হয়ে উঠবে এবং তুমি তখন দেবতাদের মতোই ভাল-মন্দ সব কিছুই জানতে পারবে। আমি যেমন পশু হলেও অন্তরের দিক থেকে মানুষের গুণ লাভ করেছি, মানুষের মতো কথা বলতে পারছি তেমনি মানুষ হয়েও তুমি দেবতাদের গুণ লাভ করবে। তাদের সব জ্ঞানের অধিকারিণী হবে। আর তাতে যদি তোমার মৃত্যুও ঘু অহলে সে মৃত্যুর অর্থ হবে তোমার এই মানবজীবন ও মানবদেহ ত্যাগ করে দৈবজীবন লাভ করা। সে মৃত্যু মোটেই খারাপ হবে না। দেবতাদের এমন কি গুণ আছে যা মানুষ লাভ করতে পারবে না? মানুষ তো দেবতাদেরই দেহের অনুরূপ। দেবতাদের খাদ্য তারাও কেন গ্রহণ করতে পারবে না?
