নিজের মনে এই কথা বলার পর মানবজাতির শত্রু শয়তানরূপী সর্প ঈভের দিকে এগিয়ে এল। মাটির উপর শুয়ে হেঁটে চলতে লাগল সে। তারপর নীচের দিকটা কুণ্ডলী পাকিয়ে মাথাটা উঁচু করে তুলে রাখল ঘাসের উপর তরঙ্গায়িত ভঙ্গিতে এঁকেবেঁকে এল সে। তার আকারটা সত্যিই খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। ইতিলরিয়াতে থীবস-এর রাজা ক্যাডমাস ও তার রানী হার্মিওন যে সর্পদেহ ধারণ করে অথবা এপিডরাসে ওষুধের দেবতা এপিকনিপাম যে সর্পরূপ ধারণ করে রোমে প্লেগরূপ মহামারীর অবসান ঘটাতে যান, সেই সব সর্পরূপের থেকে সর্পরূপী শয়তানকে আরও সুন্দর দেখাচ্ছিল।
নিয়ত পরিবর্তনশীল কোন বায়ুপ্রবাহের মত সর্পরূপী শয়তান তার দেহটাকে আঁকিয়ে-বাঁকিয়ে ঈভের মন ভোলাবার চেষ্টা করছিল। তার মুগ্ধ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছিল।
ঈভ কিন্তু তার উপস্থিতির কথা কিছুই বুঝতে পারেনি। সে শুধু গাছপালার পাতার পতপত শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ শুনতে পায়নি। বনের মধ্যে জীবজন্তু চলাফেরার সময় তাদের পায়ের এরকম শব্দ প্রায়ই হয়। তাই সে কিছু মনে করেনি।
এদিকে সর্পরূপী শয়তান সেখানেই থেমে রইল। সে তার সোনালী ঘাড়টা প্রায়ই উঁচু করছিল।
অবশেষে তার এই নীরব ক্রীড়াভঙ্গির প্রকাশ ঈভের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ঈভের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরে শয়তান খুশি হয়ে তার কুটিল প্রলোভনজাল বিস্তার করার জন্য মানুষের মত বলতে লাগল, হে মর্ত্যলোকের অধীশ্বরী, আশ্চর্যান্বিত হয়ো না। ঘৃণামিশ্রিত ও কঠোর করে তুলো না তোমার দৃষ্টিকে। তুমি হচ্ছ বিধাতার অপূর্ব সৃষ্টি। সৌন্দর্য ও স্নিগ্ধতার রানী। আমি এখানে এসে মুগ্ধ ও অতৃপ্ত নয়নে তোমাকে অবলোকন করছি। এই দেখ, আমি একা হলেও তোমার কুটিকে ভয় পাচ্ছি না।– তোমার স্রষ্টার অনুরূপ সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ তোমার দেহ। এ জগতের সব বস্তুই তুমি পেয়েছ উপহার হিসাবে। এখানকার সব জীবন্ত প্রাণীই মুগ্ধ দৃষ্টিতে তোমাকে দেখে। কিন্তু শুধু মুগ্ধ দৃষ্টির সার্থকতা কোথায় যদি না সে দৃষ্টির মুগ্ধতা প্রশংসা বা বন্দনার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত না হয়?
এখানকার বন্য পশুরা তোমার স্বর্গীয় সৌন্দর্য শুধু মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখে কিন্তু শুধুমাত্র একজন মানুষ ছাড়া আর কোন পশু বা প্রাণী তোমার এই স্বর্গীয় সৌন্দর্যের মহিমার মর্ম বুঝতে পারে না। যিনি দেবতাদের মধ্যে মানবীর মত, যিনি অসংখ্য দেবদূতদের সেবালাভের যোগ্য তাঁকে সামান্য এক মানুষ প্রশংসা করে কি করবে?
এইভাবে প্রলোভনের জালবিস্তারকারী শয়তানের ছলনাময় কথাগুলি ধীরে ধীরে প্রবেশ করল ঈভের অন্তরে। সর্পের মুখে মানুষের কণ্ঠস্বর শুনে আশ্চর্য হয়ে উঠল সে। পরে বিস্ময়ের ঘরটা কাটিয়ে উঠে সে বলল, এর মানে কি? পশুর কণ্ঠে মানুষের কথা ব্যক্ত হচ্ছে আর মানুষের জ্ঞানের কথা প্রকাশিত হচ্ছে?
আমি তো জানতাম পশুরা মানুষের মতো কথা বলতে পারে না। কারণ ঈশ্বর সৃষ্টিকালে পশুদের মূক হিসাবেই সৃষ্টি করেছিলেন। যদিও অদের সৃষ্টি ও কর্মের মধ্যে মানবিক যুক্তিবোধ ও জ্ঞানের অনেক পরিচয় পাওয়া যায়। হে সর্প, আমি জানতাম তুমি খুব চতুর একটি জীব, কিন্তু তুমি যে মানবসুলভ কণ্ঠস্বরের অধিকারী তা তো জানতাম না।
এখন বল, কিভাবে তুমি তোমার মূক অবস্থা থেকে এমন কণ্ঠস্বর লাভ করলে এবং কেমন করেই বা এখানকার অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যে আমার প্রতি সবচেয়ে বন্ধুভাবাপন্ন হয়ে উঠলে? একথা বলে আমার বিস্ময়কে দ্বিগুণীকৃত করে দাও।
একথা শুনে সুচতুর প্রলোভনকারী বলল, সৌন্দর্যের সম্রাজ্ঞী, হে জ্যোতির্ময়ী ঈভ, তুমি যা বলতে আমাকে আদেশ করেছ সে কথা বলা খুবই সহজ আমার পক্ষে। তাছাড়া তোমার আদেশ মান্য করা আমার উচিত।
আমিও প্রথমে অন্যান্য প্রাণীর মত বনের ঘাসপাতা প্রভৃতি সামান্য খাদ্য খেয়ে বিচরণ করে বেড়াতাম। কোন্ খাদ্য ভাল বা মন্দ, কে নারী কে পুরুষ, কোন বিষয়েরই কোন বিশেষ জ্ঞান ছিল না আমার।
একদিন মাঠে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে দূরে একটি সুন্দর গাছ দেখতে পেলাম। সোনালী ও লালে মেশানো অসংখ্য সুন্দর সুন্দর ফলে ভরা গাছটি। গাছটিকে ভাল করে দেখার জন্য তার কাছে গেলাম আমি। সহসা গাছটির শাখাগুলি থেকে একঝলক গন্ধ বাতাসে ভেসে আসায় জাগ্রত হয়ে উঠল আমার ক্ষুধা। সেই মধুর গন্ধে মন আমার মাতোয়ারা হয়ে উঠল। আমি সেই ফল ভক্ষণ করে একই সঙ্গে আমার ক্ষুধা ও তৃষ্ণা নিরসনের সংকল্প করলাম। এরপর আমি শ্যাওলাধরা গাছের গুঁড়িটিকে জড়িয়ে ধরলাম। সেই গাছের ডালগুলো এত উঁচু ছিল যে আদমের মত লম্বা কোন মানুষ ছাড়া তা নাগাল পাবে না।
সেই গাছের তলায় আরো যে সব পশু ফল খাবার আশায় দাঁড়িয়ে ছিল তারাও তার নাগাল পেল না।
কিন্তু আমি সেই গাছটির উপর সর্পিল গতিতে উঠে গেলাম। দেখলাম আমার হাতের কাছে প্রচুর ফল ঝুলছে। তা আমি তখন পেড়ে মনের সাধ মিটিয়ে পেট ভরে খেতে লাগলাম। সেই রসাল ফল খেয়ে যে মধুর আস্বাদ আমি পেয়েছিলাম তার আগে কোন খাদ্য বা কোন ঝর্ণার জল খেয়ে সে আস্বাদ আমি পাইনি।
সেই ফল খাবার সঙ্গে সঙ্গে এক আমূল পরিবর্তন এল আমার অন্তরে। আমার মনের জোর বেড়ে গেল। আমার জ্ঞানবুদ্ধি ও যুক্তিবোধ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। আমার বাকশক্তি ফুরিত হলো। স্বর্গ, মর্ত্য দুইয়ের মধ্যবর্তী এই জগৎ সম্বন্ধে সব জ্ঞান স্পষ্টভাবে ধরা দিল আমার কাছে। আমি যেন ত্রিভুবনের সব কিছু দেখতে পেলাম। তবে আমার দেহটি তেমনই রয়ে গেল। বহিরঙ্গের কোন পরিবর্তন হলো না। কিন্তু এই ত্রিভুবনের মধ্যে তোমার মত সুন্দরী কোথাও দেখিনি। স্বর্গের সমস্ত অপ্রাকৃত জ্যোতি যেন মিলিত হয়েছে তোমার রূপের মধ্যে। সৌন্দর্য ও সততায় ত্রিজগতে তোমার তুলনীয় দ্বিতীয় একজন কেউ নেই।
