তার পথপানে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে যতদূর দেখা যায় ততদূর দেখতে লাগল আদম। তার শুধু মনে হচ্ছিল ঈভ তার কাছে আরো কিছুক্ষণ থাকলে ভাল হত। যাবার সময় সে ঈভকে তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে বলে দেয় বারবার। ঈভও তাকে জানিয়ে দেয় সে দুপুর হলেই ফিরে আসবে তাদের কুঞ্জে। তারা একসঙ্গে মধ্যাহ্ন ভোজন করবে এবং একসঙ্গে বিশ্রাম গ্রহণ করবে।
হে অতিপ্রতারিত, অতিব্যর্থ, ভাগ্যহীনা ঈভ, প্রতিকূল ঘটনার দ্বারা তোমার প্রস্তাবিত প্রত্যাবর্তন হবে কত কলুষিত। সেই প্রত্যাবর্তনের পরমুহূর্ত হতেই তুমি আহার ও বিশ্রামে আর কোন মাধুর্য বা আনন্দ পাবে না। কারণ শয়তান সকাল থেকেই তোমার পথে অতর্কিত আক্রমণে তোমার সকল নির্দোষিতা, ঈশ্বরবিশ্বাস ও স্বর্গীয় সুখ হতে চিরতরে তোমাকে বঞ্চিত করার জন্য সাপের রূপ ধরে ছায়াচ্ছন্ন ফুলবনে ওৎ পেতে লুকিয়ে আছে। যে দুটিমাত্র আদি মানব-মানবীর মধ্যে ভাবী কালের সমগ্র মানবজাতি নিহিত আছে সেই দুটি মানব মানবীই তার উদ্দিষ্ট শিকারের বস্তু।
মাঠে, বাগানে, কুঞ্জবনে কত খুঁজেছে তাদের। সে তাদের দুজনকেই কোন ঝর্ণা বা ছায়াচ্ছন্ন নদীতটে নির্জনে দেখতে চেয়েছে। তবে ঈভকে একা পেলেই ভাল হয়। কিন্তু ঈভকে সে তার স্বামীর থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় একা পেতে ইচ্ছা করলেও সে ইচ্ছা পূরণ তার আশাতীত। কারণ তারা সব সময় দুজনে একসঙ্গে থাকে। একসঙ্গে কাজ করে অথবা বেড়ায়।
কিন্তু শয়তান তার গুপ্তস্থান থেকে ঈভকে সেদিন একাই দেখল। দেখল একটি ফুটন্ত গোলাপের ঝোঁপের পাশে একা একা দাঁড়িয়ে কাজ করছে ঈভ আপন মনে। গোলাপগাছের যে সব সরু সরু শাখাগুলি ফোঁটা ফুলের ভারে নুইয়ে পড়ছিল তাদের তুলে ধরে এক একটি অবলম্বন দান করছিল সে। গাছের আড়ালে থাকায় ঈভকে সম্পূর্ণ দেখা যাচ্ছিল না।
শয়তান এবার তার গুপ্তস্থান থেকে বেরিয়ে এসে গাছপালার মধ্যে দিয়ে ঈভের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল সন্তর্পণে। গোলাপের গন্ধে আমোদিত ও তার রূপ সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ দেখে তার গাটাকে সত্যিই খুব মনোরম দেখাচ্ছিল। মুক্তবায়ুহীন শহরে দীর্ঘকাল আবদ্ধ থাকার পর কোন লোক যদি গ্রীষ্মের কোন এক সকালে গ্রামের মুক্ত বাতাসে ভরা খোলা মাঠে এসে পড়ে তাহলে সে গ্রামের প্রতিটি বস্তু ও শব্দদৃশ্য দেখেই আনন্দ পায়। নরকবাসী শয়তানরাজও তেমনি সেই গোলাপকুঞ্জের কাছাকাছি এসে অনুরূপ আনন্দ লাভ করল। দেখল ঈভও প্রস্ফুটিত ফুলের মতই সুন্দর। সকল আনন্দ যেন মূর্ত হয়ে উঠেছে ঈভের চোখে।
সর্পরূপী শয়তান দেখল ঈভের চেহারাটা অনেকটা দেবদূতের মত, কিন্তু এক অপরূপ সৌন্দর্যসুষমায় মণ্ডিত নারীমূর্তি। তার চেহারার মধ্যে এমনই একটি স্বর্গীয় ছবি ছিল যা দেখে শয়তানের ভয়ঙ্কর অভিলাষ ও প্রতিহিংসার সকল ভীষণতাও যেন ভয় পেয়ে গেল।
ঈভকে দেখতে দেখতে ক্ষণকালের জন্য সেখানে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল শয়তান। ক্ষণকালের জন্য সে সমস্ত শত্রুতা, হিংসা, দ্বেষ, ঘৃণা ও প্রতিশোধ-বাসনার কথা সব ভুলে গিয়ে খুব ভাল হয়ে উঠল মনে মনে। হয়ে উঠল পবিত্রচিত্ত। ঈভকে দেখে এক সত্যিই বিশুদ্ধ আনন্দ লাভ করল।
কিন্তু সে শুধু ক্ষণকালের জন্য। তার বুকের মধ্যে যে ভয়ঙ্কর নরকাগ্নি অনির্বাণভাবে জ্বলে চলছিল, সে অগ্নি প্রবল হয়ে উঠল আবার। সে আগুন মুহূর্তে পুড়িয়ে ছারখার করে দিল তার আগুনের সকল শুচিতা ও আনন্দকে। এই ইডেন উদ্যানে যে সব মনোরম বস্তু তাদের ভোগের জন্য সৃষ্ট হয়নি, হয়েছে মানবজাতির জন্য, সেই সব জিনিস দেখার সঙ্গে সঙ্গে মনের উপর দুঃখের পীড়ন বেড়ে যায়। প্রবলতর হয়ে ওঠে ঘৃণা, প্রতিহিংসা আর বিদ্বেষ। কলুষিত ও বিষাক্ত হয়ে ওঠে তার সকল চিন্তা।
নিজের চিন্তাভাবনাকে সম্বোধন করে উন্মাদের মত বলতে লাগল শয়তান, হে আমার চিন্তারাজি, তোমরা আমায় কোথায় নিয়ে এসেছ? কোন্ মায়াবলে আমাকে এমন এক মধুর বিস্মরণের মধ্যে ডুবিয়ে দিলে যাতে আমি আমার আসল উদ্দেশ্যটাকে ভুলে গেলাম! কোন ভালবাসা, স্বর্গলাভের আশা বা এখানকার উদ্যানসুলভ আনন্দ আস্বাদনের জন্য এখানে আসিনি আমি, আমি এসেছি এখানকার সব আনন্দ ধ্বংস করে দিতে।
আমি এখন কেবল ধ্বংস করেই আনন্দ পেতে চাই। অন্য যে কোন আনন্দ মিথ্যা আমার কাছে। যে সুযোগ সৌভাগ্যের রূপ ধরে সুপ্রসন্ন হয়ে উঠেছে আমার, প্রতি তাকে যেন ব্যর্থ হয়ে চলে যেতে দিও না। ঐ দেখ, সেই আদি মানবী এখন সম্পূর্ণ একাকী অবস্থায় কাজ করছে। আমার প্রচেষ্টাকে সার্থক করে তোলার এই হলো সুবর্ণ সুযোগ। আমি বেশ দেখতে পাচ্ছি ওর স্বামী এখন অনেক দূরে আছে, তার কাছে নেই। তার উচ্চমনের বুদ্ধি, বীরত্বপূর্ণ চেহারা, তার শক্তি, সাহস সবই ভয়ের বস্তু আমার কাছে। ও এখন ঈশ্বরের অনুগ্রহে ধন্য বলে ওর দেহে কোন ক্ষত হবে না, কোন আঘাত মারাত্মক হয়ে উঠবে না তার পক্ষে। অথচ আমি আমার সেই দৈবী শক্তি হারিয়েছি। বর্তমানে আমি দীর্ঘদিন নরকযন্ত্রণা ভোগ করে করে ক্ষীণ হয়ে উঠেছি।
ঐ আদি মানবী সত্যিই সুন্দরী, এক স্বর্গীয় সুষমায় মণ্ডিত তার সৌন্দর্য। সে সৌন্দর্য দেবতাদের ভালবাসার যোগ্য। কপট ভালবাসার এক ছলনাময় ক্ষীণ আবরণের মধ্যে প্রবলতম এক ঘৃণাকে ঢেকে রেখে আমি যাচ্ছি তার কাছে।
