আমি কিন্তু তোমার দৃষ্টির প্রভাবে অনেক গুণ ও জ্ঞান লাভ করি। তোমাকে দেখে মনে অনেক জোর পাই। কারণ বুঝি দরকার হলে তোমার সাহায্য পাব। অথচ তুমি লজ্জা পাচ্ছ কেন এতে? সব লজ্জা জয় করে তুমি তোমার জ্ঞানবুদ্ধি দিয়ে এটা বুঝতে পারছ না কেন যে আমরা দুজনে একসঙ্গে থাকলে আমাদের শক্তি আরো বেড়ে যাবে। আমার উপস্থিতিতে তোমার গুণ ও মানসিক শক্তির পরীক্ষা হলে ভাল হবে।
তার স্ত্রীর প্রতি ভালবাসাবশত আদম এই কথা বললে ঈভ কিন্তু তার বিশ্বস্ততার নিষ্ঠা সম্বন্ধে কোন সংশয় না থাকায় সে আর কোন গুরুত্ব দিতে চাইল না সে কথায়।
ঈভ বলল, এই যদি আমাদের অবস্থা হয়, ছোট-বড় কোন শত্রুর ভয়ে এক সংকীর্ণ গণ্ডীর মধ্যে যদি আমাদের বাস করতে হয় এবং একা সে শত্রুর সম্মুখীন হওয়া যদি সম্ভব না হয় তাহলে কিসের আমরা সুখী? যদি বিপদের আশঙ্কায় আজও শঙ্কিত হতে হয় আমাদের তাহলে আমাদের সুখ কোথায়? কিন্তু কোন পাপ না করলে তো কোন ক্ষতি হতে পারে না? সে আমাদের দাম্পত্য প্রেমের নিবিড়তা বা অখণ্ডতাকে হীনজ্ঞান করতে পারে। কিন্তু তাকে হীনজ্ঞান মনে করলেই তো তা হীন বা অসম্মানিত হয়ে পড়বে না। সুতরাং আমরা পরস্পরের কাছ থেকে ছাড়াছাড়ি হলেও তাতে ভয়ের কি আছে?, বরং তার অনুমান মিথ্যা প্রমাণিত হলে এই ঘটনা থেকে দ্বিগুণ সম্মান লাভ করবে আমাদের প্রেম। কারণ আমরা ঈশ্বরের দ্বারা অনুগৃহীত। তাছাড়া বিশ্বাস, প্রেম প্রভৃতি গুণগুলি যদি কখনো প্রতিকূল ঘটনার আঘাতে সুরক্ষিত না হয়, যদি তারা একাকী আপন আপন প্রাণশক্তির দ্বারা আত্মরক্ষা করতে না পারে তাহলে সে সব ক্ষণভঙ্গুর গুণগুলির প্রয়োজন কি? সুতরাং আমাদের এই সুখী অবস্থার প্রতি কোন সংশয় পোষণ করা উচিত নয়। যদি তোমার ধারণা ঠিক হয় তবে বুঝতে হবে স্রষ্টা আমার সুখকে ক্ষণভঙ্গুর করেছেন যাতে আমরা একাকী সে সুখকে রক্ষা করতে পারি। তাহলে ঈশ্বরনির্মিত এই ইডেনই নয়, সামান্য সাধারণ এক উদ্যানমাত্র।
আদম তখন আবেগের সঙ্গে বলল, হে নারী, ঐশ্বরিক ইচ্ছায় সৃষ্ট সকল বস্তুই উত্তম। ঈশ্বর নিপুণহস্তে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার কোন কিছুই অপূর্ণ নয়। মানুষকেও তিনি অপূর্ণ করে সৃষ্টি করেননি। বাইরের যেকোন প্রতিকূল শক্তিকে প্রতিহত করে সে তার নিজের সুখের অবস্থাকে নিরাপদ বা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে। তার যা কিছু বিপদ বা শত্রু তা আছে তার ভিতরে এবং সে বিপদ অতিক্রম করার ক্ষমতা তার নিজের মধ্যেই আছে। তার নিজের ইচ্ছা না থাকলে কোন ক্ষতিই হতে পারে না।
কিন্তু ঈশ্বর মানুষের ইচ্ছাকে স্বাধীন করে রেখেছেন। কারণ যা কিছু যুক্তিকে মেনে চলে তাই স্বাধীন। এই যুক্তি সব সময় সঠিক এবং ন্যায়ের পথ দেখায়। কিন্তু এই যুক্তি অন্তরে গোপন অবস্থায় থাকে। তবু ইচ্ছা কোন ভুল করলেই তাকে ঠিক পথে চালিত করার জন্য সব সময় খাড়া হয়ে থাকে। পাছে কোন আপাতসুন্দর বস্তু বা ব্যক্তি ভালর বেশ ধরে এসে তাকে ভুল পথে চালিত করে এবং ইচ্ছাকে ভুল তথ্য পরিবেশন করে তাকে ভুল বুঝিয়ে ঈশ্বরের দ্বারা নিষিদ্ধ কোন কাজ করতে বাধ্য করে তার জন্য সর্বদা সজাগ দৃষ্টি রেখে চলে সে।
সুতরাং আমি ভালবেসে যে তোমাকে প্রায়ই মনে করিয়ে দিই তা যেন অবিশ্বাস করো না। আমরা আমাদের আদর্শে যত দৃঢ় বা অবিচল থাকি না কেন, সে আদর্শ থেকে বিচ্যুত হতে পারি আমরা। কারণ যুক্তি অনেক সময় শত্রুর বিস্তৃত ছলনাজালে পড়ে তার প্রহরা শিথিল করে তার অজানিতেই প্রতারণার শিকার হয়ে পড়ে।
সুতরাং প্রলোভনকে ডেকে এনো না। তাই তাকে পরিহার করে চলা ও আমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়াই ভাল। কখন কিভাবে বিপদ আসবে অপ্রত্যাশিতভাবে বলা যায় না। তুমি যদি মনেপ্রাণে বিশ্বস্ত হও তাহলে প্রথমে তোমার আনুগত্যের পরিচয় দিতে হবে।
যদি তুমি মনে করো আমরা একসঙ্গে থাকলেও বিপদ অতর্কিতভাবে আমাদের উপরেও এসে পড়তে পারে, যদি মনে করো তুমি তোমার শক্তিতে খুব বেশি আস্থাশীল হয়ে উঠেছ তাহলে যেতে পার। কারণ তুমি যদি তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমার কাছে থাক তাহলে তোমার সে উপস্থিতি অনুপস্থিতির থেকেও দুর্বিসহ হয়ে উঠবে। তাহলে তোমার সহজাত নির্দোষিতা এবং নিজস্ব গুণাবলীর উপর ভিত্তি করে চলে যাও। ঈশ্বর যেমন করে তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, যে সব গুণাবলী দান করেছেন, তুমি সেই সব গুণানুসারেই চলবে।
আমাদের আদিপিতা এই কথা বললেও ঈভ জেদ করতে লাগল। সে বিরক্তির সঙ্গে বলল, তোমার অনুমতি নিয়ে এবং পূর্ব হতে সতর্কিত হয়ে আমি যাচ্ছি। তোমার দ্বারা উপস্থাপিত শেষ যুক্তিটি স্পর্শ করে আমার মনকে। আমরা একসঙ্গে থাকলেও আমাদের অপ্রস্তুত অবস্থাতেই অতর্কিতভাবে বিপদ এসে পড়তে পারে। সুতরাং আমি স্বেচ্ছায় যাচ্ছি। আমাদের দর্পিত শত্ৰু অতর্কিতে এসে আমাদের মধ্যে যে বেশি দুর্বল শুধু তারই খোঁজ করবে এটা আমি আশা করতে পারি না। ঈভকে এইভাবে অনমনীয় দেখে আদম ভাবল এরপর তাকে নিষেধ করতে হলে সেটা লজ্জার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।
ঈভ তার কথা বলা শেষ করেই আদমের হাত হতে তার নরম হাতটি ছাড়িয়ে নিল। হালকা বনপরীর মত সে বাতাসের বেগে তখনি চলে গেল।
বাগানের কাজ করার উপযুক্ত যন্ত্রপাতি নিয়ে ঈভ যখন আদমের কাছ থেকে অন্যত্র কাজ করতে যাচ্ছিল তখন তাকে দেখে রোমকদেবতা ভাতুমনাসকে ছেড়ে চলে যেতে থাকা তার প্রেমিকা পমোনার মত দেখাচ্ছিল।
