কিন্তু ঈশ্বর মানুষের ইচ্ছাকে স্বাধীন করে রেখেছেন। কারণ যা কিছু যুক্তিকে মেনে চলে তাই স্বাধীন। এই যুক্তি সব সময় সঠিক এবং ন্যায়ের পথ দেখায়। কিন্তু এই যুক্তি অন্তরে গোপন অবস্থায় থাকে। তবু ইচ্ছা কোন ভুল করলেই তাকে ঠিক পথে চালিত করার জন্য সব সময় খাড়া হয়ে থাকে। পাছে কোন আপাতসুন্দর বস্তু বা ব্যক্তি ভালর বেশ ধরে এসে তাকে ভুল পথে চালিত করে এবং ইচ্ছাকে ভুল তথ্য পরিবেশন করে তাকে ভুল বুঝিয়ে ঈশ্বরের দ্বারা নিষিদ্ধ কোন কাজ করতে বাধ্য করে তার জন্য সর্বদা সজাগ দৃষ্টি রেখে চলে সে।
সুতরাং আমি ভালবেসে যে তোমাকে প্রায়ই মনে করিয়ে দিই তা যেন অবিশ্বাস করো না। আমরা আমাদের আদর্শে যত দৃঢ় বা অবিচল থাকি না কেন, সে আদর্শ থেকে বিচ্যুত হতে পারি আমরা। কারণ যুক্তি অনেক সময় শত্রুর বিস্তৃত ছলনাজালে পড়ে তার প্রহরা শিথিল করে তার অজানিতেই প্রতারণার শিকার হয়ে পড়ে।
সুতরাং প্রলোভনকে ডেকে এনো না। তাই তাকে পরিহার করে চলা ও আমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়াই ভাল। কখন কিভাবে বিপদ আসবে অপ্রত্যাশিতভাবে বলা যায় না। তুমি যদি মনেপ্রাণে বিশ্বস্ত হও তাহলে প্রথমে তোমার আনুগত্যের পরিচয় দিতে হবে।
যদি তুমি মনে করো আমরা একসঙ্গে থাকলেও বিপদ অতর্কিতভাবে আমাদের উপরেও এসে পড়তে পারে, যদি মনে করো তুমি তোমার শক্তিতে খুব বেশি আস্থাশীল হয়ে উঠেছ তাহলে যেতে পার। কারণ তুমি যদি তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমার কাছে থাক তাহলে তোমার সে উপস্থিতি অনুপস্থিতির থেকেও দুর্বিসহ হয়ে উঠবে। তাহলে তোমার সহজাত নির্দোষিতা এবং নিজস্ব গুণাবলীর উপর ভিত্তি করে চলে যাও। ঈশ্বর যেমন করে তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, যে সব গুণাবলী দান করেছেন, তুমি সেই সব গুণানুসারেই চলবে।
আমাদের আদিপিতা এই কথা বললেও ঈভ জেদ করতে লাগল। সে বিরক্তির সঙ্গে বলল, তোমার অনুমতি নিয়ে এবং পূর্ব হতে সতর্কিত হয়ে আমি যাচ্ছি। তোমার দ্বারা উপস্থাপিত শেষ যুক্তিটি স্পর্শ করে আমার মনকে। আমরা একসঙ্গে থাকলেও আমাদের অপ্রস্তুত অবস্থাতেই অতর্কিতভাবে বিপদ এসে পড়তে পারে। সুতরাং আমি স্বেচ্ছায় যাচ্ছি। আমাদের দর্পিত শত্ৰু অতর্কিতে এসে আমাদের মধ্যে যে বেশি দুর্বল শুধু তারই খোঁজ করবে এটা আমি আশা করতে পারি না। ঈভকে এইভাবে অনমনীয় দেখে আদম ভাবল এরপর তাকে নিষেধ করতে হলে সেটা লজ্জার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।
ঈভ তার কথা বলা শেষ করেই আদমের হাত হতে তার নরম হাতটি ছাড়িয়ে নিল। হালকা বনপরীর মত সে বাতাসের বেগে তখনি চলে গেল।
বাগানের কাজ করার উপযুক্ত যন্ত্রপাতি নিয়ে ঈভ যখন আদমের কাছ থেকে অন্যত্র কাজ করতে যাচ্ছিল তখন তাকে দেখে রোমকদেবতা ভাতুমনাসকে ছেড়ে চলে যেতে থাকা তার প্রেমিকা পমোনার মত দেখাচ্ছিল।
তার পথপানে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে যতদূর দেখা যায় ততদূর দেখতে লাগল আদম। তার শুধু মনে হচ্ছিল ঈভ তার কাছে আরো কিছুক্ষণ থাকলে ভাল হত। যাবার সময় সে ঈভকে তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে বলে দেয় বারবার। ঈভও তাকে জানিয়ে দেয় সে দুপুর হলেই ফিরে আসবে তাদের কুঞ্জে। তারা একসঙ্গে মধ্যাহ্ন ভোজন করবে এবং একসঙ্গে বিশ্রাম গ্রহণ করবে।
হে অতিপ্রতারিত, অতিব্যর্থ, ভাগ্যহীনা ঈভ, প্রতিকূল ঘটনার দ্বারা তোমার প্রস্তাবিত প্রত্যাবর্তন হবে কত কলুষিত। সেই প্রত্যাবর্তনের পরমুহূর্ত হতেই তুমি আহার ও বিশ্রামে আর কোন মাধুর্য বা আনন্দ পাবে না। কারণ শয়তান সকাল থেকেই তোমার পথে অতর্কিত আক্রমণে তোমার সকল নির্দোষিতা, ঈশ্বরবিশ্বাস ও স্বর্গীয় সুখ হতে চিরতরে তোমাকে বঞ্চিত করার জন্য সাপের রূপ ধরে ছায়াচ্ছন্ন ফুলবনে ওৎ পেতে লুকিয়ে আছে। যে দুটিমাত্র আদি মানব-মানবীর মধ্যে ভাবী কালের সমগ্র মানবজাতি নিহিত আছে সেই দুটি মানব মানবীই তার উদ্দিষ্ট শিকারের বস্তু।
মাঠে, বাগানে, কুঞ্জবনে কত খুঁজেছে তাদের। সে তাদের দুজনকেই কোন ঝর্ণা বা ছায়াচ্ছন্ন নদীতটে নির্জনে দেখতে চেয়েছে। তবে ঈভকে একা পেলেই ভাল হয়। কিন্তু ঈভকে সে তার স্বামীর থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় একা পেতে ইচ্ছা করলেও সে ইচ্ছা পূরণ তার আশাতীত। কারণ তারা সব সময় দুজনে একসঙ্গে থাকে। একসঙ্গে কাজ করে অথবা বেড়ায়।
কিন্তু শয়তান তার গুপ্তস্থান থেকে ঈভকে সেদিন একাই দেখল। দেখল একটি ফুটন্ত গোলাপের ঝোঁপের পাশে একা একা দাঁড়িয়ে কাজ করছে ঈভ আপন মনে। গোলাপগাছের যে সব সরু সরু শাখাগুলি ফোঁটা ফুলের ভারে নুইয়ে পড়ছিল তাদের তুলে ধরে এক একটি অবলম্বন দান করছিল সে। গাছের আড়ালে থাকায় ঈভকে সম্পূর্ণ দেখা যাচ্ছিল না।
শয়তান এবার তার গুপ্তস্থান থেকে বেরিয়ে এসে গাছপালার মধ্যে দিয়ে ঈভের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল সন্তর্পণে। গোলাপের গন্ধে আমোদিত ও তার রূপ সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ দেখে তার গাটাকে সত্যিই খুব মনোরম দেখাচ্ছিল। মুক্তবায়ুহীন শহরে দীর্ঘকাল আবদ্ধ থাকার পর কোন লোক যদি গ্রীষ্মের কোন এক সকালে গ্রামের মুক্ত বাতাসে ভরা খোলা মাঠে এসে পড়ে তাহলে সে গ্রামের প্রতিটি বস্তু ও শব্দদৃশ্য দেখেই আনন্দ পায়। নরকবাসী শয়তানরাজও তেমনি সেই গোলাপকুঞ্জের কাছাকাছি এসে অনুরূপ আনন্দ লাভ করল। দেখল ঈভও প্রস্ফুটিত ফুলের মতই সুন্দর। সকল আনন্দ যেন মূর্ত হয়ে উঠেছে ঈভের চোখে।
