তার আসল উদ্দেশ্য হলো তার ঈর্ষার প্রধান বস্তু আমাদের এই সুখী জীবনের অবসান ঘটানো। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সে ঈশ্বরের প্রতি আমাদের আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা অথবা আমাদের দাম্পত্যপ্রেমে ব্যাঘাত ঘটাতে চায় সে। তবে সে যাই করুক, যে ঈশ্বর তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, তোমাকে আজীবন রক্ষা করে চলেছেন তার পক্ষ যেন ত্যাগ করো না। যেখানে স্ত্রীর বিপদ বা অপমানের আশঙ্কা থাকে, সেখানে সে স্বামীর কাছে নিরাপদে থাকে, সেখানে স্বামীই তাকে রক্ষা করে।
ঈভ তখন গম্ভীরভাবে বলল, হে ঈশ্বরের সন্তান এবং পৃথিবীর অধীশ্বর, আমাদের এমন একজন শত্রু আছে যে আমাদের সর্বনাশ ঘটাতে চায় তা তোমার কাছ থেকেই জানতে পেরেছি আমি। আমাদের সেই দেবদূত অতিথি বিদায় নেবার সময় এ বিষয়ে যা বলে যান তাও আমি আমাদের বনকুঞ্জের পিছনে দাঁড়িয়ে সব শুনেছি।
কিন্তু আমাদের একজন শত্রু আমাদের প্রলোভিত করার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে বলে তুমি যে ঈশ্বরের প্রতি ও তোমার প্রতি আমার বিশ্বস্ততা ও দৃঢ়তায় সংশয় প্রকাশ করবে এটা আমি আশা করতে পারিনি। তার শক্তিকে তুমি ভয় করো না। কারণ আমরা মৃত্যুযন্ত্রণার বশীভূত নই। মৃত্যু আমাদের আক্রমণ করতে পারবে না, তার সে আক্রমণকে আমরা প্রতিরোধ করতেও পারব না। তার প্রতারণাকে একমাত্র তুমিই ভয় করো। আর সেই ভয় থেকেই তুমি বিশ্বাস করো ঈশ্বরের প্রতি আমার বিশ্বস্ততা তোমার প্রতি আমার ভালবাসা তার প্রতারণার দ্বারা বিকম্পিত ও ব্যাহত হবে। যে তোমার জীবনে সবচেয়ে প্রিয় তার প্রতি এই চিন্তা কেমন করে পোষণ করো তুমি তোমার অন্তরে? কি করে সে চিন্তা প্রবেশ করল তোমার মনে?
আদম তখন উত্তর করল, হে ঈশ্বরসৃষ্ট মানবকন্যা, অমর ঈভ, জানি তুমি মৃত্যু, পিপ বা কোন দোষ থেকে মুক্ত। তুমি নিষ্পাপ, নির্দোষ ও কলুষমুক্ত তা জানি। তোমার কোন অপূর্ণতা বা ত্রুটিবিচ্যুতির জন্য আমি তোমাকে আমার কাছ থেকে সরে যেতে দিচ্ছি না, আমাদের শত্রুর সম্ভাব্য প্রলোভনটাকে এড়াবার জন্যই তোমাকে নিষেধ করছি আমি। তার প্রলোভন বৃথা হলেও তোমার ধর্মবিশ্বাস প্রলোভনের অতীত নয় জেনে সে তোমার সম্মানকে কলুষিত করার চেষ্টা করবেই। তার সেই অন্যায় প্রচেষ্টা যত নিষ্ফলই মনে হোক না কেন, তুমি তা ঘৃণা ও ক্রোধের দ্বারা প্রতিহত করার চেষ্টা করবে। তাই আমি বলি তুমি একা এই প্রলোভনের সম্মুখীন হও এটা যদি আমি না চাই তাহলে কিছু মনে করো না। আমরা একসঙ্গে এক জায়গায় দুজনে থাকলে শত্রু তা করতে সাহস করত না। আর সাহস করলেও আমাদের উপরেই প্রথমে নেমে আসত তার সে আক্রমণ। যে শয়তান তার ছলনার দ্বারা দেবদূতদেরও প্রতারিত করে সে এমন সূক্ষ্মভাবে তার ছলনাজাল বিস্তার করবে যে তুমি তার সে ছলনা ও প্রতারণা ধরতে পারবে না। সুতরাং এ বিষয়ে অপরের সাহায্য অপ্রয়োজনীয় ভাবা ঠিক নয়।
আমি কিন্তু তোমার দৃষ্টির প্রভাবে অনেক গুণ ও জ্ঞান লাভ করি। তোমাকে দেখে মনে অনেক জোর পাই। কারণ বুঝি দরকার হলে তোমার সাহায্য পাব। অথচ তুমি লজ্জা পাচ্ছ কেন এতে? সব লজ্জা জয় করে তুমি তোমার জ্ঞানবুদ্ধি দিয়ে এটা বুঝতে পারছ না কেন যে আমরা দুজনে একসঙ্গে থাকলে আমাদের শক্তি আরো বেড়ে যাবে। আমার উপস্থিতিতে তোমার গুণ ও মানসিক শক্তির পরীক্ষা হলে ভাল হবে।
তার স্ত্রীর প্রতি ভালবাসাবশত আদম এই কথা বললে ঈভ কিন্তু তার বিশ্বস্ততার নিষ্ঠা সম্বন্ধে কোন সংশয় না থাকায় সে আর কোন গুরুত্ব দিতে চাইল না সে কথায়।
ঈভ বলল, এই যদি আমাদের অবস্থা হয়, ছোট-বড় কোন শত্রুর ভয়ে এক সংকীর্ণ গণ্ডীর মধ্যে যদি আমাদের বাস করতে হয় এবং একা সে শত্রুর সম্মুখীন হওয়া যদি সম্ভব না হয় তাহলে কিসের আমরা সুখী? যদি বিপদের আশঙ্কায় আজও শঙ্কিত হতে হয় আমাদের তাহলে আমাদের সুখ কোথায়? কিন্তু কোন পাপ না করলে তো কোন ক্ষতি হতে পারে না? সে আমাদের দাম্পত্য প্রেমের নিবিড়তা বা অখণ্ডতাকে হীনজ্ঞান করতে পারে। কিন্তু তাকে হীনজ্ঞান মনে করলেই তো তা হীন বা অসম্মানিত হয়ে পড়বে না। সুতরাং আমরা পরস্পরের কাছ থেকে ছাড়াছাড়ি হলেও তাতে ভয়ের কি আছে?, বরং তার অনুমান মিথ্যা প্রমাণিত হলে এই ঘটনা থেকে দ্বিগুণ সম্মান লাভ করবে আমাদের প্রেম। কারণ আমরা ঈশ্বরের দ্বারা অনুগৃহীত। তাছাড়া বিশ্বাস, প্রেম প্রভৃতি গুণগুলি যদি কখনো প্রতিকূল ঘটনার আঘাতে সুরক্ষিত না হয়, যদি তারা একাকী আপন আপন প্রাণশক্তির দ্বারা আত্মরক্ষা করতে না পারে তাহলে সে সব ক্ষণভঙ্গুর গুণগুলির প্রয়োজন কি? সুতরাং আমাদের এই সুখী অবস্থার প্রতি কোন সংশয় পোষণ করা উচিত নয়। যদি তোমার ধারণা ঠিক হয় তবে বুঝতে হবে স্রষ্টা আমার সুখকে ক্ষণভঙ্গুর করেছেন যাতে আমরা একাকী সে সুখকে রক্ষা করতে পারি। তাহলে ঈশ্বরনির্মিত এই ইডেনই নয়, সামান্য সাধারণ এক উদ্যানমাত্র।
আদম তখন আবেগের সঙ্গে বলল, হে নারী, ঐশ্বরিক ইচ্ছায় সৃষ্ট সকল বস্তুই উত্তম। ঈশ্বর নিপুণহস্তে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার কোন কিছুই অপূর্ণ নয়। মানুষকেও তিনি অপূর্ণ করে সৃষ্টি করেননি। বাইরের যেকোন প্রতিকূল শক্তিকে প্রতিহত করে সে তার নিজের সুখের অবস্থাকে নিরাপদ বা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে। তার যা কিছু বিপদ বা শত্রু তা আছে তার ভিতরে এবং সে বিপদ অতিক্রম করার ক্ষমতা তার নিজের মধ্যেই আছে। তার নিজের ইচ্ছা না থাকলে কোন ক্ষতিই হতে পারে না।
