সর্পরূপী শয়তান দেখল ঈভের চেহারাটা অনেকটা দেবদূতের মত, কিন্তু এক অপরূপ সৌন্দর্যসুষমায় মণ্ডিত নারীমূর্তি। তার চেহারার মধ্যে এমনই একটি স্বর্গীয় ছবি ছিল যা দেখে শয়তানের ভয়ঙ্কর অভিলাষ ও প্রতিহিংসার সকল ভীষণতাও যেন ভয় পেয়ে গেল।
ঈভকে দেখতে দেখতে ক্ষণকালের জন্য সেখানে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল শয়তান। ক্ষণকালের জন্য সে সমস্ত শত্রুতা, হিংসা, দ্বেষ, ঘৃণা ও প্রতিশোধ-বাসনার কথা সব ভুলে গিয়ে খুব ভাল হয়ে উঠল মনে মনে। হয়ে উঠল পবিত্রচিত্ত। ঈভকে দেখে এক সত্যিই বিশুদ্ধ আনন্দ লাভ করল।
কিন্তু সে শুধু ক্ষণকালের জন্য। তার বুকের মধ্যে যে ভয়ঙ্কর নরকাগ্নি অনির্বাণভাবে জ্বলে চলছিল, সে অগ্নি প্রবল হয়ে উঠল আবার। সে আগুন মুহূর্তে পুড়িয়ে ছারখার করে দিল তার আগুনের সকল শুচিতা ও আনন্দকে। এই ইডেন উদ্যানে যে সব মনোরম বস্তু তাদের ভোগের জন্য সৃষ্ট হয়নি, হয়েছে মানবজাতির জন্য, সেই সব জিনিস দেখার সঙ্গে সঙ্গে মনের উপর দুঃখের পীড়ন বেড়ে যায়। প্রবলতর হয়ে ওঠে ঘৃণা, প্রতিহিংসা আর বিদ্বেষ। কলুষিত ও বিষাক্ত হয়ে ওঠে তার সকল চিন্তা।
নিজের চিন্তাভাবনাকে সম্বোধন করে উন্মাদের মত বলতে লাগল শয়তান, হে আমার চিন্তারাজি, তোমরা আমায় কোথায় নিয়ে এসেছ? কোন্ মায়াবলে আমাকে এমন এক মধুর বিস্মরণের মধ্যে ডুবিয়ে দিলে যাতে আমি আমার আসল উদ্দেশ্যটাকে ভুলে গেলাম! কোন ভালবাসা, স্বর্গলাভের আশা বা এখানকার উদ্যানসুলভ আনন্দ আস্বাদনের জন্য এখানে আসিনি আমি, আমি এসেছি এখানকার সব আনন্দ ধ্বংস করে দিতে।
আমি এখন কেবল ধ্বংস করেই আনন্দ পেতে চাই। অন্য যে কোন আনন্দ মিথ্যা আমার কাছে। যে সুযোগ সৌভাগ্যের রূপ ধরে সুপ্রসন্ন হয়ে উঠেছে আমার, প্রতি তাকে যেন ব্যর্থ হয়ে চলে যেতে দিও না। ঐ দেখ, সেই আদি মানবী এখন সম্পূর্ণ একাকী অবস্থায় কাজ করছে। আমার প্রচেষ্টাকে সার্থক করে তোলার এই হলো সুবর্ণ সুযোগ। আমি বেশ দেখতে পাচ্ছি ওর স্বামী এখন অনেক দূরে আছে, তার কাছে নেই। তার উচ্চমনের বুদ্ধি, বীরত্বপূর্ণ চেহারা, তার শক্তি, সাহস সবই ভয়ের বস্তু আমার কাছে। ও এখন ঈশ্বরের অনুগ্রহে ধন্য বলে ওর দেহে কোন ক্ষত হবে না, কোন আঘাত মারাত্মক হয়ে উঠবে না তার পক্ষে। অথচ আমি আমার সেই দৈবী শক্তি হারিয়েছি। বর্তমানে আমি দীর্ঘদিন নরকযন্ত্রণা ভোগ করে করে ক্ষীণ হয়ে উঠেছি।
ঐ আদি মানবী সত্যিই সুন্দরী, এক স্বর্গীয় সুষমায় মণ্ডিত তার সৌন্দর্য। সে সৌন্দর্য দেবতাদের ভালবাসার যোগ্য। কপট ভালবাসার এক ছলনাময় ক্ষীণ আবরণের মধ্যে প্রবলতম এক ঘৃণাকে ঢেকে রেখে আমি যাচ্ছি তার কাছে।
নিজের মনে এই কথা বলার পর মানবজাতির শত্রু শয়তানরূপী সর্প ঈভের দিকে এগিয়ে এল। মাটির উপর শুয়ে হেঁটে চলতে লাগল সে। তারপর নীচের দিকটা কুণ্ডলী পাকিয়ে মাথাটা উঁচু করে তুলে রাখল ঘাসের উপর তরঙ্গায়িত ভঙ্গিতে এঁকেবেঁকে এল সে। তার আকারটা সত্যিই খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল। ইতিলরিয়াতে থীবস-এর রাজা ক্যাডমাস ও তার রানী হার্মিওন যে সর্পদেহ ধারণ করে অথবা এপিডরাসে ওষুধের দেবতা এপিকনিপাম যে সর্পরূপ ধারণ করে রোমে প্লেগরূপ মহামারীর অবসান ঘটাতে যান, সেই সব সর্পরূপের থেকে সর্পরূপী শয়তানকে আরও সুন্দর দেখাচ্ছিল।
নিয়ত পরিবর্তনশীল কোন বায়ুপ্রবাহের মত সর্পরূপী শয়তান তার দেহটাকে আঁকিয়ে-বাঁকিয়ে ঈভের মন ভোলাবার চেষ্টা করছিল। তার মুগ্ধ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছিল।
ঈভ কিন্তু তার উপস্থিতির কথা কিছুই বুঝতে পারেনি। সে শুধু গাছপালার পাতার পতপত শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ শুনতে পায়নি। বনের মধ্যে জীবজন্তু চলাফেরার সময় তাদের পায়ের এরকম শব্দ প্রায়ই হয়। তাই সে কিছু মনে করেনি।
এদিকে সর্পরূপী শয়তান সেখানেই থেমে রইল। সে তার সোনালী ঘাড়টা প্রায়ই উঁচু করছিল।
অবশেষে তার এই নীরব ক্রীড়াভঙ্গির প্রকাশ ঈভের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ঈভের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরে শয়তান খুশি হয়ে তার কুটিল প্রলোভনজাল বিস্তার করার জন্য মানুষের মত বলতে লাগল, হে মর্ত্যলোকের অধীশ্বরী, আশ্চর্যান্বিত হয়ো না। ঘৃণামিশ্রিত ও কঠোর করে তুলো না তোমার দৃষ্টিকে। তুমি হচ্ছ বিধাতার অপূর্ব সৃষ্টি। সৌন্দর্য ও স্নিগ্ধতার রানী। আমি এখানে এসে মুগ্ধ ও অতৃপ্ত নয়নে তোমাকে অবলোকন করছি। এই দেখ, আমি একা হলেও তোমার কুটিকে ভয় পাচ্ছি না।– তোমার স্রষ্টার অনুরূপ সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ তোমার দেহ। এ জগতের সব বস্তুই তুমি পেয়েছ উপহার হিসাবে। এখানকার সব জীবন্ত প্রাণীই মুগ্ধ দৃষ্টিতে তোমাকে দেখে। কিন্তু শুধু মুগ্ধ দৃষ্টির সার্থকতা কোথায় যদি না সে দৃষ্টির মুগ্ধতা প্রশংসা বা বন্দনার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত না হয়?
এখানকার বন্য পশুরা তোমার স্বর্গীয় সৌন্দর্য শুধু মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখে কিন্তু শুধুমাত্র একজন মানুষ ছাড়া আর কোন পশু বা প্রাণী তোমার এই স্বর্গীয় সৌন্দর্যের মহিমার মর্ম বুঝতে পারে না। যিনি দেবতাদের মধ্যে মানবীর মত, যিনি অসংখ্য দেবদূতদের সেবালাভের যোগ্য তাঁকে সামান্য এক মানুষ প্রশংসা করে কি করবে?
