যে আমি একদিন সর্বোচ্চ পদে অভিষিক্ত হয়ে দেবতাদের সঙ্গে ওঠাবসা করতাম, সেই আমি আজ বাধ্য হয়ে পশু হতে চলেছি। পশুর গুণাবলী ধারণ করতে চলেছি। কিন্তু উচ্চাভিলাষ পূরণ ও প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য কে নীচে নামবেনা? যে উচ্চাভিলাষের আকাশে পাখা মেলে উড়তে চায় তাকে নীচে নামতেই হবে। যে প্রতিশোধ চায় তাকে আপাতমধুর সেই প্রতিশোধের তিক্ত ফল ভোগ করতেই হবে!
তাই হোক। যেহেতু সুউচ্চ স্বর্গলোকে গিয়ে আমি ঈশ্বরকে ধরতে পারলাম না, সেইহেতু সেই ঈশ্বরের পরেই যে আমার মনে ঈর্ষা জাগায়, যে ঈশ্বরের নূতন প্রিয় বস্তুরূপে আমাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছে। আমাদের প্রতি ঘৃণাবশত যাকে ঈশ্বর সামান্য মাটি থেকে সৃষ্টি করে এমন উন্নত অবস্থায় উন্নীত করেছেন, সেই মাটির মানুষকে ঈশ্বরের নবজাত সন্তানকে ঘৃণা করতে চাই আমি। ঘৃণার শোধ ঘৃণার দ্বারাই নিতে হয়।
এই কথা বলার পর একরাশ কালো কুয়াশার মত গুঁড়ি মেরে প্রতিটি সিক্ত অথবা শুষ্ক ঝোঁপের মধ্যে সে একটি ঘুমন্ত সর্পের সন্ধান করে যেতে লাগল। অবশেষে সে এক জায়গায় দেখতে পেল ঘাসের মধ্যে কুণ্ডলী পাকিয়ে মাথা রেখে একটি সাপ নির্ভয়ে ঘুমোচ্ছে। শয়তান তার মুখের মধ্যে প্রবেশ করে তার পাশবিক কুটিল স্বভাবটি লাভ করল। তারপর তার বুদ্ধিকে সক্রিয় করে তুলল। কিন্তু তাতে সর্পটির ঘুমের কোন ব্যাঘাত হলো না। এইভাবে রাত্রি প্রভাত হবার অপেক্ষায় রইল।
তারপর যখন প্রভাতের শুচিস্নিগ্ধ আলো ইডেন উদ্যানের প্রস্ফুটিত ফুলগুলির উপর ঝরে পড়তে লাগল, তখন সেই সব ফুলগুলি হতে বিচিত্র সৌরভে আমোদিত হয়ে উঠল উদ্যান। পৃথিবীর সমস্ত সুগন্ধি বস্তুগুলি পরম স্রষ্টার উদ্দেশ্যে নীরবে গৌরবগান করতে লাগল। তখন সর্পরূপী শয়তান দেখল সেই মানবদম্পতি ঈশ্বরের স্তোত্ৰগানে মুখর হয়ে উঠল। সমস্ত প্রকৃতি ও প্রাণীজগতের মধ্যে একমাত্র তারাই এই কণ্ঠস্বরের অধিকারী। ঈশ্বরের স্তবগানে সমর্থ। গান শেষে তারা প্রথমে প্রকৃতির রূপ, বর্ণ ও গন্ধ কিছুক্ষণ উপভোগ করল। পরে তারা তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম সম্বন্ধে আলোচনা করতে লাগল।
ঈভ তখন বলল, আদম, যতই আমরা এই উদ্যানের গাছপালা ও ফুলগুলির পরিচর্যা করছি ততই আমাদের কাজ বেড়ে যাচ্ছে। এতদিন আমরা দুজনে একসঙ্গে কাজ করে আসছি। একাজে আরও লোকের দরকার। যে সব গাছপালার অতিরিক্ত অংশ হেঁটে দিচ্ছি, একরাত্রির মধ্যেই তারা আবার বেড়ে উঠছে। তাই উপায়স্বরূপ একটি চিন্তা আমার মনে হয়েছে। এ বিষয়ে তোমার পরামর্শ চাই। আমি আমাদের শ্রমকে ভাগ করে নিতে চাই। আমরা দুজনে দু জায়গায় কাজ করব। তুমি পছন্দমত এক জায়গায় যেতে পার অথবা যেখান বেশি প্রয়োজন বুঝবে সেখানে যাবে। অথবা যেখানে আইভিলতাগুলি কোন গাছকে জড়িয়ে উঠতে পারছে না সেখানে গিয়ে তাদের উঠিয়ে দেবে। আর আমি ঐ গোলাপবনে গিয়ে তাদের পরিচর্যা করব বেলা দুপুর পর্যন্ত।
কিন্তু আমরা দুজনে যদি একই জায়গায় কাছাকাছি কাজ করি তাহলে পরস্পরের দৃষ্টি বিনিময়, হাসাহাসি ও কথাবার্তায় সময় কেটে যায়, কাজের কাজ কিছুই হয় না। সারাদিন বৃথাই কেটে যায়।
আদম তখন শান্তকণ্ঠে উত্তর করল, হে আমার একমাত্র সহচরী, সমস্ত প্রাণীর মধ্যে তুমিই আমার প্রিয়তমা, ঈশ্বরনির্দিষ্ট আমাদের দৈনন্দিন কাজগুলি কিভাবে সুচারুরূপে সম্পন্ন হতে পারে সে বিষয়ে তুমি ঠিকই বলেছ। কাজ ঠিকমত না হওয়ার জন্য যাতে আমার কোন নিন্দা বা বিরূপ সমালোচনা না হয় সেদিকে তোমার লক্ষ্য আছে। পারিবারিক মঙ্গলসাধনই নারীর সৌন্দর্যকে পূর্ণতা দান করে। পারিবারিক উন্নতির জন্য যথাসাধ্য কাজ করে যাওয়াই নারীর ধর্ম।
কিন্তু ঈশ্বর আমাদের উপর এমন কিছু কঠোর শ্রমের ভার চাপিয়ে দেননি যে আমরা কাজের ফাঁকে ফাঁকে দুজনে একসঙ্গে বসে বিশ্রাম করে অথবা মধুর আলাপ-আলোচনার দ্বারা চিত্তবিনোদন করতে পারব না। যে হাসি মানুষের যুক্তিবোধ থেকে উৎসারিত হয়, সে হাসি পশুদের মুখে পাওয়া যায় না। নরনারীর মুখের সেই মিষ্টি হাসি ও মধুর বিশ্রম্ভালাপ মানবমনের খাদ্য। প্রেম হচ্ছে মানবজীবনের এক মহান লক্ষ্য, কোন হীনতম লক্ষ্য নয়।
কোন কষ্টকর বিরক্তিকর শ্রমের জন্য আমাদের সৃষ্টি হয়নি, আমাদের সৃষ্টি হয়েছে আনন্দের জন্য এবং এই আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তি। এইসব বনপথ ও কুঞ্জগুলি আমরা দুজনেই হাত দিয়ে পরিষ্কার রাখতে পারব। আমাদের বেড়াবার প্রশস্ত পথ থাকবে। পরে আমাদের সন্তানরা তাদের ছোট ছোট হাত দিয়ে সাহায্য করবে আমাদের কাজে।
তবে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার দ্বারা তোমার মন যখন তৃপ্ত হবে তখন তুমি অল্প : কিছুক্ষণের জন্য অনুপস্থিত থাকতে পার। আমি তা সহ্য করতে পারব। কারণ নির্জনতা অনেক সময় উত্তম সাহচর্য বা সঙ্গদানের কাজ করে। স্বল্পকালীন বিরাম বা বিশ্রাম ভাল ফল দান করে।
তবে এ বিষয়ে আর একটি সংশয় আচ্ছন্ন করছে আমার মনকে। পাছে আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অন্যত্র কোথাও গেলে তোমার কোন বিপদ ঘটে বা তোমার কোন ক্ষতি হয় তা ভেবে শঙ্কিত হয়ে উঠেছে আমার মন। আমাদের কিভাবে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে তা তুমি জান। আমাদের কোন প্রতিহিংসাপরায়ণ শত্রু আমাদের সুখে ঈর্ষান্বিত ও তার হতাশায় বিক্ষুব্ধ হয়ে এক হীন চক্রান্ত ও অপকৌশলের দ্বারা আমাদের পতন ঘটিয়ে অন্তহীন দুঃখ, লজ্জা ও অপমানের গহুরে নিক্ষেপ করতে চাইছে। সে শত্ৰু নিশ্চয় আমাদের নিকটবর্তী কোন জায়গায় থেকে লক্ষ্য করছে, তার কু-অভিসন্ধি পূরণের সুযোগ খুঁজছে। দেখছে আমরা এক জায়গায় পাশাপাশি থাকলে সুবিধা হবে না। কারণ তাহলে একজনের প্রয়োজনে অন্যজন সাহায্য করতে পারব সঙ্গে সঙ্গে। সেই জন্য আমরা দুজনে ছাড়াছাড়ি হয়ে দূরে দূরে থাকলে তার সুবিধা হবে।
