সেই নারী আমার কথা শুনল। ঈশ্বরের দ্বারা সৃষ্টি সেই নারী ছিল নির্দোষিতা, সরলতা ও লজ্জার মূর্ত প্রতীক। তার বিচিত্র গুণাবলী, বিবেক ও যোগ্যতা সকলেরই ভালবাসার যোগ্য। কিন্তু তার এই সব গুণ ও অন্তরবৃত্তি বাইরে তেমন প্রকাশ হচ্ছিল না। তার এই সব অন্তর্নিহিত ও আভাসে অস্পষ্টভাবে প্রকাশিত গুণগুলির জন্যই সে আরও বেশি কাম্য হয়ে উঠেছিল আমার কাছে। প্রকৃতি যেন তাকে এইভাবে সরল নিষ্পাপ করে গড়ে তুলেছিল।
সে আমাকে দেখে ও আমার কথা শুনে পিছন ফিরে চলে যেতে লাগল। কিন্তু তাকে অনুসরণ করতে লাগলাম আমি। তাকে থামিয়ে আমি তাকে বোঝাতে লাগলাম। এক সুগম্ভীর আত্মমর্যাদাবোধের সঙ্গে সে আমার যুক্তি মেনে নিল। পরে লজ্জারুণ ঊষার মত দেখাচ্ছিল তাকে। আমি তার হাত ধরে তাকে বিবাহের জন্য বাসরকুঞ্জে নিয়ে গেলাম। সেই মুহূর্তে আকাশ ও সমস্ত গ্রহনক্ষত্রগুলি উজ্জ্বল অনুকূল প্রভাব বিস্তার করতে লাগল। সমগ্র পৃথিবী যেন নানা সুলক্ষণ প্রকাশের দ্বারা আমাদের এই বিবাহ সমর্থন করল। প্রতিটি আনন্দোচ্ছল পাহাড়-পর্বত, প্রতিটি পাখি, চঞ্চল বাতাস যেন আমাদের বিবাহ সম্পর্কে সবুজ বনভূমির কানে কানে ফিস ফিস করে কি সব বলতে লাগল। পবর্তশীর্ষে উদিত সন্ধ্যাতারার আলো বাসরপ্রদীপের কাজ করতে লাগল আমাদের কুঞ্জে।
এইভাবে আমি আমার অতীত অবস্থার কথা আমার যতদূর মনে আছে তা তোমাকে বললাম। আমি বর্তমানে যে পার্থিব সুখ ভোগ করি সে কথা তো আমার অন্তর থেকে প্রকাশের আলোয় টেনে আনলাম। আমি স্বীকার করছি, সকল বস্তুতেই আমি আনন্দ পাই। কিন্তু সে আনন্দ পাই বা না পাই আমার মনের ক্রিয়ার কোন পরিবর্তন হয় না। অথবা কোন বস্তু দেখে আমার কামনার বেগ বেড়ে যায় না। কারণ ফুল ও ফলের রূপ, রস ও গন্ধ, পাখিদের গান, বর্ণ গন্ধ ও গানের সমন্বিত সৌন্দর্যসম্ভারে ভূষিত বনপ্রকৃতির মধ্যে আমাদের ইতস্তত বিচরণ–এই সব কিছুই অন্যরূপে দেখি আমি।
প্রকৃতি জগতের সকল সৌন্দর্যের আবেদনের মাঝে আমার মধ্যে এক অদ্ভুত অনুভূতির আলোড়ন জাগে। সে অনুভূতির মধ্যে এমনই এক অটল অবিচলিত মহত্ত্বের ভাব আছে যার কাছে প্রকৃতির রূপ, রস, শব্দ, গন্ধজনিত সকল সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যায়। তখন আমার মনে হয় প্রকৃতির যা কিছু সৌন্দর্য তা শুধু তার বহিরঙ্গেই সীমাবদ্ধ। তার অন্তরঙ্গে নেই কোন সে সৌন্দর্যের মহিমা।
পরিশেষে আমি বুঝতে পারি আমাদের মধ্যে যে সব অন্তরবৃত্তিগুলি আছে তা প্রকৃতির থেকে অনেক বড়; তাদের তুলনায় প্রকৃতি ছোট। আবার তার বহিরঙ্গে যে সৌন্দর্য প্রকটিত সে সৌন্দর্য তাকে যিনি সৃষ্টি করেছেন সেই পরম স্রষ্টার সৌন্দর্যের অনুরূপ নয় অথবা তার সৃষ্ট যে মানবের উপর এই প্রকৃতি জগতের ও অন্যান্য প্রাণীর উপর প্রভুত্ব করার ভার ন্যস্ত হয়েছে তার চরিত্রের মতও সমুন্নত মহিমায় সমৃদ্ধ নয়।
তবু যখন আমি এই প্রকৃতির সুন্দর রূপকে প্রত্যক্ষ করি, তাকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অখণ্ড সত্তা বলে মনে হয়। মনে হয় তার নিয়ম, তার ইচ্ছা সবচেয়ে বিজ্ঞ, সবচেয়ে গুণবান ও উত্তম। প্রকৃতির সামনে মানুষের সকল প্রজ্ঞা ব্যর্থ হয়, অপ্রতিভ বা হীনপ্রভ হয় মানুষের সকল জ্ঞানগর্ভ আলোচনা। প্রকৃতির কাছে মানুষের সকল প্রভুত্ব ও যুক্তিবোধ হয়ে যায় ব্যর্থতায় পর্যবসিত। মনে হয় যে প্রকৃতি পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবের আগেই সৃষ্ট হয়, সে প্রকৃতি মানবমনের সকল মহত্ত্ব ও সমুন্নতিকে আত্মসাৎ করে নিয়েছে তার রূপের মধ্যে। দেবদূত প্রহরীর মত কেমন যেন এক ভীতির ভাব জাগাল আমাদের মনে।
দেবদূত রাফায়েল তখন ভ্রুকুটি করে বলল, প্রকৃতিকে দোষী করো না। সে তার আপন কাজ করে চলেছে, তুমি তোমার কাজ করে যাবে। অজ্ঞতার পরিচয় দিও । তুমি যদি প্রকৃতিকে ভুল না বোঝ তাহলে সে তোমাকে কখনই ত্যাগ করবে । তাকে তোমার প্রয়োজন আছে। তার কাছে তোমাকে যেতেই হবে। কোন বস্তুর অপূর্ণতাকে প্রত্যক্ষ করলে তার উপর খুব একটা বেশি গুরুত্ব আরোপ করো না। প্রকৃতির যে বহিরঙ্গ তোমাকে আনন্দ দেয়, যার তুমি প্রশংসা করো, নিঃসন্দেহে তা সুন্দর, তা নিশ্চয়ই তোমার কামনা, সম্মান ও ভালবাসার যোগ্য। তা কখনই তোমার প্রভুত্বের অধীন নয়। তার সঙ্গে নিজেকে ঠিকমত ওজন করে বিচার করে তবে তা মূল্যায়ন করো। তা না হলে তোমার বিচারের কোন অর্থ হয় না। সে বিচারে শুধু এক ভ্রান্ত আত্মপ্রসাদ ছাড়া আর কিছু লাভ হয় না। তোমার জ্ঞানবুদ্ধি ও কলাকৌশলদ্বারা প্রকৃতিকে যতই জানবে সে ততই মাথা নত করবে তোমার কাছে। তোমার বাস্তব জীবনে সে তোমাকে অনেক ভোগ্যবস্তু দান করবে। তখন মনে হবে তোমারই আনন্দের জন্য সজ্জিত হয়ে আছে বিচিত্র সম্ভারে।
প্রকৃতিকে যতই ভীতিপ্রদ মনে হবে ততই তাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে ভালবাসবে। যে নারী তোমার জীবনের সাথী, তাকেও তুমি দান করবে শ্রদ্ধাবিমিশ্রিত ভালবাসা। মনে রাখবে শুধু স্পর্শেন্দ্রিয়ের পরিতৃপ্তি বা আনন্দ ভালবাসা নয়। সে ইন্দ্রিয়তৃপ্তি পশুদের জন্য, মানুষের জন্য নয়। তার মধ্যে যে সব গুণ আকর্ষণীয়, মানবিক ও যুক্তপূর্ণ তাই ভালবাসবে। কোন কামনার আবেদনকে প্রশ্রয় না দিয়ে শুধু ভালবেসে যাবে। কামনার আবেগের মধ্যে কখনো প্রকৃত ভালবাসা থাকে না। প্রকৃত প্রেমচিন্তাকে পরিমার্জিত করে হৃদয়কে করে প্রসারিত, যুক্তি ও নীতির মধ্যে তার উচ্চ আসনটি পাতা। ন্যায়পরায়ণ প্রেমের সোপান থেকেই মানুষ ঐশ্বরিক প্রেমের ঊর্ধ্বতন স্তরে উন্নীত হতে পারে। শুধু দেহগত আনন্দের মধ্যে নিমগ্ন হয়ে থেকো না, এইজন্যই পশুদের মধ্যে তোমার সাথী পাওয়া যায়নি।
