এই কথায় আদম কিছুটা লজ্জিত হয়ে বলল, তার বহিরঙ্গটি সুন্দর এবং সে সৃষ্টির দিক থেকে অন্যান্য প্রাণীর থেকে পৃথক, শুধু এই জন্যই তার মধ্যে আমি আনন্দ পাই না। তার দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি কর্মের মধ্যে যে সুষমা ছন্দায়িত হয়ে ওঠে, তার প্রতিটি কথার মধ্যে যে প্রেম যে সৌন্দর্য তরঙ্গায়িত হয়ে ওঠে তাতেই আমি আনন্দ পাই। তার সুমধুর নমনীয়তা, শান্ত নিরুচ্চার এক আত্মসমর্পণের ভাব আমাদের দুটি মনকে মিলিত করে দেয়, এক ও অভিন্ন করে তোলে দুটি আত্মাকে। ঐক্য বা মিলন কথাটি শুনতে যত না ভাল, কোন বিবাহিত দম্পতির মধ্যে তা দেখতে আরও অনেক ভাল।
তুমি অন্য কিছু মনে করো না। অন্তরে আমি যা ভাবি বা অনুভব করি তাই অকপটে বললাম আমি। তুমি বলছ ভালবাসায় কোন দোষ নেই। ভালবাসাই মানুষকে স্বর্গের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। প্রেম একই সঙ্গে মানুষের পরম পথ এবং পথ প্রদর্শক। এখন যদি অন্যায় না হয় তাহলে আমার একটি কথার উত্তর দাও।
স্বর্গে যারা বাস করে অর্থাৎ ঈশ্বর ওদেবদূতেরা কি ভালবাসে? তাদের ভালবাসা কি শুধু দৃষ্টির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়, না কি স্পর্শের মধ্য দিয়েও প্রকাশিত হয়?
দেবদূত রাফায়েল তখন গোলাপের মত লাল স্বর্গীয় সুষমামণ্ডিত এক হাসি হেসে বলল, শুধু এইটুকু বললেই যথেষ্ট হবে যে জেনে রাখবে আমরা সুখী। কিন্তু ভালবাসা ছাড়া কারো সুখ হতে পারে না। তোমরা তোমাদের দেহের মধ্যে যে সুখ ও আনন্দ উপভোগ করো, আমরা বিদেহী হয়েও সেই সুখ ও আনন্দ উপভোগ করি। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বা অবয়বসংস্থান কোনভাবে কোন বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। বাতাসের থেকে হালকা বিদেহী দেবদূতেরা যখন পরস্পরকে আলিঙ্গন করে তখন দুজনে একেবারে মিশে যায়। সেই আলিঙ্গনের মধ্য দিয়ে একটি পবিত্র আত্মা আর একটি পবিত্র আত্মার মধ্যে লীন হয়ে যায় তারা। মানুষের মত দেহের সঙ্গে দেহ ও মনের সঙ্গে মনের মিশবার কোন প্রয়োজন হয় না। রক্তমাংসের দেহগত কোন বাধা বিঘ্ন ঘটাতে পারে না তাদের সে মিলনে।
কিন্তু আর আমি থাকতে পারছি না এখানে। সূর্য এখন সবুজ পৃথিবীর সীমা ত্যাগ করে অস্তাচলে গমন করছে। এটা আমার প্রস্থানের সংকেত। আমি যাচ্ছি, তুমি তোমার মনকে শক্ত করো। সুখে বসবাস করো। ভালবেসে যাও। তবে তোমার পরম স্রষ্টা ঈশ্বরকে ভুলে যেও না। তাঁর প্রতি তোমার প্রেম এবং আনুগত্য যেন অব্যাহত থাকে চিরকাল। তাঁর মহান আদেশ মেনে চলবে সব সময়। স্বাধিকারপ্রমত্তের মত স্বাধীন ইচ্ছার বশবর্তী হয়ে যেন কামনার স্রোতে তোমার বিচারবুদ্ধিকে ভেসে যেতে দিও না। মনে রাখবে তোমার ভবিষ্যৎ সন্তানসন্ততিদের সমস্ত সুখদুঃখ তোমার উপরেই নির্ভর করছে। তুমি ঠিক থাকলে আমি তাতে আনন্দিত হব। ন্যায়নীতিকে ভিত্তি করে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে, না তোমার পতন ঘটবে সেটা তোমার বিচারবৃদ্ধির উপর নির্ভর করে। আপনাতে আপনি পূর্ণ হও। কোন বাইরের সাহায্যের প্রয়োজন হবে না। সমস্ত প্রলোভনকে জয় করবে সংযত চিত্তে। কোন কিছুই যেন বিধির বিধান লঙ্ঘনে বাধ্য করতে না পারে।
এই বলে উঠে পড়ল রাফায়েল। আমও তার সঙ্গে কিছুটা এগিয়ে গেল। তার আশীর্বাদ লাভ করল। বলল, আমার পরম শ্রদ্ধেয় পরম মঙ্গলময় ঈশ্বরের দ্বারা প্রেরিত হে বিদেশী দেবদূত, হে স্বর্গীয় অতিথি, তুমি স্বস্থানে প্রস্থান করো। তোমার এই সদয় আচরণের কথা আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ রাখব। মানবজাতির প্রতি সদয় হয়ে যেন মাঝে মাঝে স্বর্গ থেকে নেমে এস এমনি করে।
এইভাবে তাদের ছাড়াছাড়ি হলো। রাফায়েল চলে গেল স্বর্গলোকে আর আদম ফিরে এল কুঞ্জবনে।
০৮ম সর্গ
অষ্টম সর্গ
যেখানে ঈশ্বর বা দেবদূত স্বর্গ থেকে নেমে এসে বন্ধুর মত মানুষের পাশে এসে কত কথাবার্তা বলেন, তার সরল সামান্য খাদ্য ভোজন করেন, সেখানে আমাদের মত মানুষের কোন কথা বলা নিষ্প্রয়োজন। আমি শুধু এই ঘটনার মর্মান্তিক পরিণাম দেখাব। মানুষ কিভাবে বিধির বিধান লঙ্ঘন করে অবিশ্বাসী, আনুগত্যহীন ও ঈশ্বরদ্রোহী হয়ে ওঠে, আমি বলব তারই কথা।
মানুষের এই অবিশ্বস্ততা ও নিষিদ্ধ আচরণের জন্য তাকে ত্যাগ করে তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান ঈশ্বর চিরতরে। ফলে স্বর্গ ও মর্ত্যের মধ্যে ব্যবধান বা দূরত্ব বেড়ে যায়। উভয়পক্ষে ক্রমাগত চলতে থাকে ক্রোধ আর ভর্ৎসনার বাণবর্ষণ। অবশেষে ঈশ্বর বিচারের রায়দানের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীতে দুঃখ নেমে আসে চিরকালের জন্য। নেমে আসে পাপ আর মৃত্যুর করাল ছায়া। সত্যিই দুঃখের বিষয়। কিন্তু এ নিয়ে প্রচুর তর্কবিতর্ক হয়। ট্রয় যুদ্ধে শত্রুদের পশ্চাতে ধাবিত কঠোর একিলিসের মধ্যে যে রোষ দেখা গিয়েছিল, ঈনিসের প্রতি জুনো এবং ওডিসিয়াসের প্রতি সমুদ্রদেবতা পসেডন যে রোষ দেখান, ইতালির অধিপতি টার্নাস তার স্ত্রী ল্যাভিনিয়াকে হারিয়ে যে রোষে ফেটে পড়ে, সেই রোষ এইসব তর্কবিতর্কে প্রকাশিত হয়।
আমি এইসব কাব্যে প্রকাশ করার জন্য আমার স্বর্গীয় সাহায্যকারিণীর সাহায্য নিতে পারি। তিনি অযাচিতভাবে মাঝে মাঝে আমার নিদ্রার মধ্যেই আবির্ভূত হন। আমার স্বতোৎসারিত সকল কাব্যই তিনি আমাকে নিদ্রিত অবস্থাতে বলে দেন।
বহুদিন আগে হতেই এক বীরত্বপূর্ণ আখ্যানকাব্য রচনা করার প্রয়াস পেয়েছিলাম। কিন্তু শুধু বীরত্বের কথা মনঃপূত হয়নি আমার।
