এই বলে তিনি থামলেন। আমি তখন বিনয়াবনত হয়ে তাঁকে বললাম, তোমার ঐশ্বরিক বিধান ও কর্মপদ্ধতির গুরুত্ব, মহিমা বা গভীরতা অনুধাবন করা কোন মানবমনের চিন্তার পক্ষে সম্ভব নয়।
হে পরম স্রষ্টা, তুমি স্বয়ংসিদ্ধ, আপনাতে আপনি সম্পূর্ণ। তোমার মধ্যে কোন অপূর্ণতা নেই। কিন্তু এ পূর্ণতা মানুষের নেই। মানবজীবনের মধ্যে আছে অনেক অপূর্ণতা আর তাই তারা পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার দ্বারা আপন আপন অপূর্ণতার দুঃখে সান্ত্বনা পেতে চায়। কিন্তু যেহেতু তুমি এক অদ্বিতীয়, সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, স্বয়ংসম্পূর্ণ, কারো সঙ্গে আলোচনা করার কোন প্রয়োজন নেই তোমার। তুমি অনন্ত, পূর্ণ, পরম স্রষ্টা।
কিন্তু মানুষ সংখ্যায় যত বেশিই হোক, সকলের মধ্যেই আছে কিছু না কিছু অপূর্ণতা। অপূর্ণ মানুষ তারই অনুরূপ অপূর্ণ মানুষের জন্ম দেবে। তাই তাদের পারস্পরিক ভালবাসা, বন্ধুত্ব ও ঐক্যের প্রয়োজন হয়। কিন্তু যেহেতু তুমি আপনাতে আপনি সম্পূর্ণ সেইহেতু তুমি নির্জনে নিঃসঙ্গ অবস্থায় থাকলেও আপন আত্মিক পূর্ণতায় সমৃদ্ধ হয়ে পরমানন্দে বিভোর হয়ে থাক। সামাজিক মেলামেশার কোন প্রয়োজন হয় না। কারো কোন সাহচর্য বা সঙ্গ ছাড়াই তুমি আনন্দ পেতে পার।
তুমি যেমন তোমার সৃষ্ট হীন প্রাণীদের তোমার স্তরে উন্নীত করে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে পার না তেমনি আমিও এই সব পশুদের সঙ্গে কথা বলে তাদের হীন স্তর ০ আনতে পারি না। তাদের জীবনযাত্রার মধ্যেও কোন আনন্দ পেতে পারি না।
তার অনুমতি নিয়ে আমি সাহস করে এই কথা বললে তিনি বললেন, আমি তোমাকে পরীক্ষা করে সন্তুষ্ট হয়েছি আদম। আমি দেখছি তুমি শুধু পশুদের প্রকৃতিই বোঝ না। নিজের প্রকৃতির বা স্বরূপের কথাও অনেক জান। তুমি ঠিকই বলেছ, তোমার মধ্যে যে আত্মা আছে তা আমার মতই স্বাধীন। পশুদের মধ্যে সে আত্মা নেই। তাই তাদের সাহচর্য তুমি যুক্তিসঙ্গতভাবেই প্রত্যাখ্যান করতে চেয়েছ। সে সাহচর্য কখনো তোমার মনোমত বা পছন্দমত হতে পারে না।
আমি তা জানতাম। আমি জানতাম মানুষ একা থাকতে চাইবে না। সেটা শুভ হবে না মানুষের পক্ষে। তা জেনেও আমি পরীক্ষা করে দেখলাম তুমি কি ধরনের সাথী চাও। দেখলাম তোমার বিচারবুদ্ধি কেমন।
এরপর দেখবে আমি যাকে এখানে আনব সে হবে তোমারই অনুরূপ, তোমার পছন্দমত। সে হবে তোমারই আর এক আত্মা, তোমার অন্তরের কামনার যথাযথ প্রতিমূর্তি।
এই কথা বলেই অদৃশ্য হয়ে গেলেন সেই সর্বশক্তিমান ঈশ্বর! আমি আর তাঁর কথা শুনতে পেলাম না। তাঁর দিব্য দ্যুতির দ্বারা আমার সকল ইন্দ্রিয়চেতনাকে অভিভূত করে দিয়ে তিনি তার স্বর্গলোকের আপন ভূমিতে প্রস্থান করলেন।
আমার সেই অভিভূত অবসন্ন ইন্দ্রিয়চেতনার উপর নিদ্রার আবেশ নেমে এল। মুদ্রিত হয়ে গেল আমার চক্ষুদুটি। প্রকৃতি যেন আমার সাহায্যে সে নিদ্রাকে পাঠিয়ে দিল। কিন্তু আমার চর্মচক্ষু দুটি মুদ্রিত হলেও আমার অন্তঃক্ষুটি খোলা রয়ে গেল। আমি সেখানেই শুয়ে পড়লাম।
আমি সেই নিদ্রিত অবস্থাতেই স্বপ্নের মধ্যে আগের ঐশ্বরিক মূর্তিটির থেকে আরও উজ্জ্বল এক মূর্তি দেখতে পেলাম। সে মৃর্তি আমার পাশে বসে আমার দেহের বাম দিকটিকে একেবারে খুলে ফেলল। আমার বাঁ দিক থেকে একটি পাঁজর তুলে নিল। তার মধ্যে তখনো ছিল ক্রিয়াশীল হৃৎপিণ্ডের তাপ। উষ্ণ রক্তস্রোত বেরিয়ে আসছিল সেই ক্ষতস্থান থেকে। কিন্তু নূতন মাংসপিণ্ড দ্বারা তখনি পূর্ণ হয়ে গেল সেই ক্ষতস্থান।
সেই মূর্তিটি এবার আমার পাঁজরটি খুলে নিয়ে তা দিয়ে কি গড়তে লাগল দুহাত দিয়ে। এইভাবে তার হাতে মানুষের মতই এক প্রাণী গড়ে উঠল। কিন্তু পুরুষ নয় আমার মত, নারী। সে নারীমূর্তি দেখতে এত সুন্দর যে পৃথিবীতে প্রকৃতি জগতের মধ্যে যত সুন্দর বস্তু দেখেছি সেই সৌন্দর্যের থেকেও সুন্দর। অথবা সেই সব সৌন্দর্যের সমন্বিত রূপই মূর্ত হয়ে উঠেছে তার মধ্যে। তার দৃষ্টি ও ভাবভঙ্গি আমার মধ্যে প্রেম ও আনন্দ সঞ্চারিত করল। এ আনন্দ আগে আমি অনুভব করিনি কখনো।
সহসা আমার কাছ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল সে। আমি তাকে আর দেখতে পেলাম না। আমি তাকে দেখতে পেয়ে চোখে অন্ধকার দেখতে লাগলাম সব কিছু।
আমার ঘুম ভেঙে গেল। তাকে দেখার জন্য জেগে উঠলাম আমি। শুনলাম, বাইরের জগতে তার দেখা পাই তো ভাল, তা নাহলে সারাজীবন ধরে তার অভাব আমাকে দুঃখ দেবে। তার অভাব আর কিছুতে পূরণ হবে না আমার জীবনে। উল্টে আমার জীবনের সকল আনন্দই ব্যর্থ হয়ে যাবে।
সহসা তাকে কিছুদুরে দেখতে পেলাম আমি। স্বপ্নে তাকে যেমন দেখেছিলাম তার অদৃশ্য স্রষ্টার সঙ্গে আমার দিকে আসতে লাগল সে। তার সেই স্রষ্টাকে চোখে দেখা যাচ্ছিল না। শুধু তার কণ্ঠস্বর শুনে পথ চলছিল সে। তার প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল এক গম্ভীর আত্মমর্যাদার ভাব, দৃষ্টিতে ছিল এক স্বর্গীয় প্রেমের দ্যুতি। বিবাহের আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্ম সবই মেনে চলল সে।
আমি তা দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে বললাম, হে আমার পরম স্রষ্টা, উদার করুণাময়। তুমি তোমার কথা রেখেছ। আমার সব অভাব পূরণ করে দিয়েছ। তুমি আমাকে অনেক কিছুই দিয়েছ। কিন্তু তোমার এই দান অন্য সব দানের থেকে সুন্দর ও শ্রেষ্ঠ। এখন আমি আমারই অস্থিমজ্জামাংস ও আত্মারই একটি অংশকে দেখেছি আমারই সামনে। তার নাম হলো নারী, পুরুষেরই অর্ধাঙ্গিনীরূপে সৃষ্ট। একই রক্তমাংস থাকবে তাদের দেহে–একই প্রাণ, একই আত্মা।
