সেখানে আবার ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। এমন সময় আমার পথপ্রদর্শক দৈবমূর্তিতে আমার সামনে উপস্থিত হলো। তাকে দেখে আমি আনন্দিত হলেও ভয়ে ভয়ে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে তার চরণতলে পতিত হলাম।
সেই মূর্তিটি বলল, তুমি যাঁকে খুঁজছ আমি হচ্ছি সেই। এই উদ্যানের যিনি স্রষ্টা তিনি ঊর্ধ্বে, নিমে বা তোমার চারপাশে সর্বত্রই বিরাজমান। এই স্বর্গোদ্যান ঈশ্বরনির্মিত। এই উদ্যান আমি তোমাকে দান করলাম। এখানে তুমি ভূমি কর্ষণ করে গাছপালা উৎপন্ন করে ও সব রক্ষণাবেক্ষণ করে ফল ভক্ষণ করবে। এই উদ্যানে যত গাছ আছে, সেই সব গাছের ফল তুমি ইচ্ছামত ভক্ষণ করবে। ফলের কোন অভাব তোমার কোনদিন হবে না।
কিন্তু এই উদ্যানের মধ্যে জীবনবৃক্ষের পাশে যে জ্ঞানবৃক্ষ আছে তার ফলের। মধ্যে আছে ভাল-মন্দ ও ন্যায় জ্ঞান। সেই ফল তুমি ভক্ষণ করবে না। এই ফল তোমার ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্য ও বিশ্বাসের প্রতীক। আমার এই সতর্কবাণী স্মরণ রাখবে। এ ফল কোনদিন আস্বাদন করবে না, খাবে না, কারণ তার আস্বাদ যাই হোক, সেই ফলভক্ষণের পরিণাম বড় ভীষণ হবে। সুতরাং এই পরিণামের কথা স্মরণ করে সে ফলভক্ষণের কৌতূহল ত্যাগ করবে।
জেনে রাখবে, যেদিন এই জ্ঞানবৃক্ষের ফল ভক্ষণ করবে সেই দিনই আমার ও ঈশ্বরের আদেশ লঙ্ঘিত হবে। সেই দিন তোমার অনিবার্যভাবে মৃত্যু ঘটবে। তুমি হয়ে উঠবে মরণশীল। সেইদিন তুমি এই স্বর্গোদ্যান হতে বিতাড়িত হয়ে এক চিরমূখের জগতে নির্বাসিত হবে।
তার এই কঠিন নিষেধাজ্ঞাটি এখনো আমার কানে অনুরণিত হচ্ছে, যদিও এর কারণ আমি বুঝতে পারছি না।
এরপর সেই মূর্তি আবার বলতে লাগল, শুধু এই উদ্যান নয়, এই উদ্যানসীমানার বাইরে যে জগৎ আছে সে জগৎ তোমাকে ও তোমার থেকে যে মানবজাতির উদ্ভব হবে তাদের দান করে গেলাম আমি। সে জগতের নদ-নদী, সমুদ্র, আকাশ, পাহাড়, পর্বত, পশুপাখি–সব কিছুর উপর প্রভুত্ব করবে তোমরা। সব কিছু ভোগ করে যাবে। সেই জগতের যেখানে খুশি তোমরা বাস করবে। সেখানকার পশুপাখিরা তোমাদের প্রভুত্ব মেনে নেবে। তোমরা তাদের নামকরণ করবে। জলাশয়ের মাছদের ক্ষেত্রেও এই বিধান প্রযোজ্য হবে। জলের মাছ মাটিতে আসতে পারবে না। তারা জলেই বিচরণ করবে।
তার কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই অনেক জোড়া জোড়া পশুপাখি আমি দেখতে পেলাম। আমি তাদের নাম দিলাম। তাদের প্রকৃতি আমি বুঝে নিলাম।
আমি তখন সেই দৈবমূর্তিকে বললাম, তোমরা যারা মানবজাতির ঊর্ধ্বে, এই পৃথিবীর ঊর্ধ্বলোকে যাদের বাস, যারা মানবজাতির উন্নতি ও কল্যাণের জন্য এই জগৎ সৃষ্টি করে আমাদের সুখের জন্য দান করেছ তাদের কি নামে অভিহিত করব? কিন্তু আমার তো কোন অংশীদার দেখছি না। নিঃসঙ্গ জনের সুখ কোথায়? একা কেউ কি সুখভোগ করে যেতে পারে? সঙ্গী ছাড়া সুখভোগে তৃপ্তি কোথায়?
তখন আমার কথায় সেই মূর্তি বলল, নির্জনতা তুমি কাকে বলছ? কত প্রাণী ও জীবজন্তুদ্বারা এই পৃথিবী পরিপূর্ণ। জগতের সর্বত্র বায়ু প্রবাহিত হয়ে চলেছে। এখানকার সব প্রাণীই তোমার বশীভূত। তোমার ডাকে তারা যে কোন সময়ে এসে খেলা করবে তোমার সামনে। তাদের ভাষা তুমি বুঝতে পার না। তোমার এই বিশাল রাজ্যে তুমি তাদের নিয়েই আনন্দ করবে। তাদের নিয়েই থাকবে।
কথাগুলি আদেশের সুরে বলল সে। আমি তখন তার অনুমতি নিয়ে বলতে লাগলাম, হে ঐশ্বরিক শক্তি, আমার কথায় রাগ করো না। তোমরা আমাকে তোমাদের প্রতিরূপ করে সৃষ্টি করেছ, কিন্তু এই পশুরা অন্য আকৃতির এবং আমার থেকে নিম্নমানের। সমজাতীয় প্রাণীতে প্রাণীতেই বন্ধুত্ব হয়। কিন্তু আমি ও এই পশুরা সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতীয় প্রাণী। তাদের সঙ্গ বা সাহচর্য আমাকে কি কোন আনন্দ দিতে পারে? বন্ধুত্ব মানেই পারস্পরিক দান-প্রতিদান। এই দান-প্রতিদান সমানুপাতিক হওয়া চাই। কিন্তু সেখানে ছোট-বড় ভিন্ন দুই জাতীয় প্রাণীর মধ্যে বন্ধুত্ব হলেও দুজনের দান-প্রতিদানের ব্যাপারটা সমান হয় না। একজনের ভালবাসার পরিমাণ বেশি হলে অন্যজন তার প্রতিদান দিতে পারে না। সে ভালবাসার গুরুত্ব বুঝতে পারে না। ফলে সে বন্ধুত্ব অসহনীয় হয়ে ওঠে উভয়ের পক্ষে।
আমি চাই এমন বন্ধু যে বুদ্ধি ও যুক্তি দিয়ে আমার আনন্দের অংশগ্রহণ করতে পারবে। কিন্তু যারা অসভ্য পশু তারা কখনো মানুষের সহচর বা বন্ধু হতে পারে না, যেমন সিংহ সিংহীর সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। এই জন্য তাদের জোড়া জোড়া করে সৃষ্টি করেছ। একই জাতীয় প্রাণীর মধ্যে স্ত্রী-পুরুষ হলে বন্ধুত্ব ভাল হয়। তাই সেখানে পাখি পশুর সঙ্গে, মাছ পাখির সঙ্গে, বনজ বানরের সঙ্গে মিশতে বা বন্ধুত্ব করতে পারে না। মানুষও পশুর সঙ্গে কোনক্রমেই মিশতে পারে না।
তখন সেই ঐশ্বরিক মূর্তি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট না হয়েই উত্তর করলেন, আদম? আমি দেখছি তুমি তোমার সঙ্গী নির্বাচন করে এক সুন্দর ও সূক্ষ্ম আনন্দ লাভ করতে চাও। অর্থাৎ নির্জনে একা থেকে কোন আনন্দই আস্বাদন করতে পারবে না, এটাই হলো তোমার অভিমত।
কিন্তু আমার দিকে একবার তাকিয়ে দেখ তো। আমার অবস্থা দেখে আমাকে সুখী বলে মনে হয় কি না। আমাকে কি প্রভূত সুখে সুখী বলে মনে হয় না তোমার? অনন্তকাল ধরে আমি নিঃসঙ্গ অবস্থায় একা একা বাস করে আসছি। কারণ আমার সমান বা উপযুক্ত যোগ্য সাথী কেউ নেই। সুতরাং আমার সমান বা অনুরূপ কোন সাথী যদি না পাই তাহলে আমারই সৃষ্ট হীনতর প্রাণীদের সঙ্গে ছাড়া আর কার সঙ্গে কথাবার্তা বলব? যারা আমার থেকে ছোট, আমার আসন থেকে নেমে তাদের কাছে গিয়েই আলাপ-আলোচনা করতে হয় আমাকে। অন্যান্য প্রাণী ও পশুরা যেমন তোমার থেকে হীন তেমনি তারাও আমার থেকে হীন।
