রাফায়েল তখন তার উত্তরে বলল, হে মানবজাতির আদিপিতা, তোমার ওষ্ঠাধরনিঃসৃত বচনগুলিও কম সুধাময় নয়। তোমার জিহ্বাও জড়তামুক্ত। কারণ তুমি ঈশ্বরেরই এক সুন্দর প্রতিমূর্তি বলে ঈশ্বর তোমার অন্তরঙ্গ ও বহিরঙ্গটিকে তার দ্বারা প্রদত্ত অনেক গুণেই ভূষিত করেছেন। সবাক বা নির্বাক যে অবস্থাতেই তুমি থাক না কেন তোমাকে সব অবস্থাতেই সুন্দর দেখায়। তোমার প্রতিটি বচন ও গতিভঙ্গি সুন্দর।
স্বর্গে আমরা আমাদের অনুগত সেবকদের কথা যেমন বলি, তেমনি তোমার কথাও কম আলোচনা করি না, মানবজাতির সঙ্গে ঈশ্বরের সম্পর্ক সম্বন্ধে অনেক কিছু প্রশ্নও করি। কারণ ঈশ্বর তোমাদের কম সম্মানে ভূষিত করেননি। আমাদের মতো তোমাদেরও সমানভাবে ভালবাসেন। সুতরাং কি বলবে বল।
সেদিন আমি উপস্থিত ছিলাম না। ঈশ্বরের আদেশে আমি একদল দেবসেনা নিয়ে নরকদ্বারে এক অভিযানে গিয়েছিলাম। ঈশ্বর যেদিন এই পৃথিবী সৃষ্টি করেন সেদিন। তিনি হয়ত আভাস পেয়েছিলেন নরক থেকে শয়তানপ্রেরিত কোন শত্রু বা গুপ্তচর এসে ভঁর নবনির্মিত সৃষ্টিকার্যের মধ্যে কোন ধ্বংসের বীজ বপন করতে পারে। তাই তিনি আমাকে পাঠান।
তারা অবশ্য সে চেষ্টা করেনি। আমরা গিয়ে দেখলাম নরকের ভয়ঙ্কর দ্বারগুলি দৃঢ়ভাবে রুদ্ধ আছে। আমরা নরকদ্বারের এপার হতে শুনতে পেলাম নরকের অভ্যন্তরে যন্ত্রণায় কাতর আর্তনাদ করছে অসংখ্য ব্যক্তি। কোন নৃত্যগীতের শব্দ নয়, শুধু সেই আর্তনাদের ধ্বনিইশুনতে পেলাম আমরা। আমরা সানন্দে ফিরে এলাম স্বর্গলোকে।
যাই হোক, এবার তোমার কাহিনী বর্ণনা করো। আমার কথা শুনে তুমি যেমন আনন্দ পাও, তেমনি তোমার কথা শুনেও আনন্দ পাই আমি।
রাফায়েলের এই কথা শুনে আমাদের আদিপিতা বলল, মানবজীবনের উৎপত্তির কথা বলা মানুষের পক্ষে সত্যিই এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। কেউ কখনো তার নিজের জীবনের উৎপত্তির কথা জানতে পারে না। তোমার সাহচর্যকে দীর্ঘায়িত করার জন্যই আমি এ কাহিনী বলতে যাচ্ছি।
একদিন গভীর ঘুম থেকে সূর্যালোকের তপ্ত স্পর্শ পেয়ে জেগে উঠে দেখলাম পত্রপুষ্পের এক পেলব শয্যায় শুয়ে আছি, রৌদ্রতাপে ঘর্মাক্ত হয়ে উঠেছে আমার কলেবর। সহসা আমার চোখের দৃষ্টি আকাশের পানে নিবদ্ধ হতে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লাম আমি।
তারপর আকাশ থেকে আমার দৃষ্টি নামিয়ে আমার চারদিকে তাকিয়ে পাহাড়, উপত্যকা, ছায়াচ্ছন্ন বনভূমি সূর্যালোকিত প্রান্তর ও কলমন্দ্রমুখরা ঝর্ণার তরলিত প্রবাহ দেখতে পেলাম। তার সঙ্গে অনেক জীবজন্তুকেও ঘুরে বেড়াতে দেখলাম। দেখলাম অনেক পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে অথবা গাছের শাখায় বসে গান করছে। দেখলাম সমগ্র প্রকৃতি হাস্যোজ্জ্বলা, শব্দগন্ধবর্ণময় এক আনন্দের উচ্ছ্বাসে মত্তপ্রাণা।
তা দেখে এক সুবাসিত আনন্দের প্লাবনে প্লাবিত হয়ে উঠল আমার অন্তর। তখন এক অদম্য উজ্জ্বল প্রাণশক্তিতে সজীব আমার অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলিকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম আমি। কিন্তু আমি কে, কোথা হতে কি কারণে এসেছি এখানে তার কিছুই বুঝতে পারলাম না। আমি কিছুক্ষণ হেঁটে ও ছুটে বেড়ালাম। তারপর কথা বলার চেষ্টা করলাম এবং কথা বলতে পারলাম।
আমি তখন বলতে লাগলাম, হে সূর্য, হে আলোকোজ্জ্বল ও আনন্দময় পৃথিবী, হে পর্বত ও উপত্যকারাজি, নদী বন ও প্রান্তরসমূহ, হে সকল প্রাণিগণ, তোমরা বল, এখানে আমি কেমন করে এলাম তা তোমরা দেখেছ কি? কিভাবে আমার উৎপত্তি হলো বল। আমি নিজের দ্বারা নিজে সৃষ্ট হইনি। নিশ্চয় সততা, উদারতা ও সৃষ্টিশক্তিতে মহান কোন স্রষ্টা সৃষ্টি করেছেন আমাকে। যাঁর অনুগ্রহে আমি আমার এই জীবন ও গতিশক্তি লাভ করেছি, যাঁর কৃপায় আমি এত সুখী, তাঁকে কেমন করে জানব? কেমন করে ভক্তিশ্রদ্ধা করব?
এই কথা বলতে বলতে আমি ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। কিন্তু কোথায় যাচ্ছি তা আমি বুঝতে পারলাম না। পথে যেতে যেতে আমি প্রাণভরে বাতাস থেকে নিঃশ্বাস নিলাম। তখন আমি এই আলোর সুষমা দেখলাম। কিন্তু কেউ আমার কথার উত্তর দিল না।
ছায়াচ্ছন্ন এক কুসুমিত নদীতটে আমি বসলাম। ক্রমে শান্ত মধুর এক নিদ্রা এক মেদুর চাপ সৃষ্টি করে আচ্ছন্ন করে ফেলল আমার তন্দ্রাভিভূত চেতনাকে। তখন আমার মনে হলো আমি যেন আমার জন্মের পূর্বাবস্থায় ফিরে গিয়েছি। অবলুপ্ত হয়ে গেছে আমার সচেতন সত্তাটি।
সহসা স্বপ্নের মধ্যে আমার নিজেরই এক ছায়ামূর্তি দেখে মনে হলো আমি তখনো বেঁচে আছি, চেতনা আছে আমার দেহের মধ্যে।
এমন সময় এক দৈবাকৃতি পুরুষ এসে আমায় বলল, হে আদি মানবপিতা আদম, ওঠ, তুমি হবে অসংখ্য মানবসন্তানের পিতা। তোমার ডাকে সাড়া দিয়ে এই স্বর্গোদ্যানের মধ্যে তোমার পথপ্রদর্শকরূপে আমি তোমার বাসস্থান নির্দিষ্ট করে দিতে এসেছি।
এই বলে সেই পুরুষ তার হাত দিয়ে আগাভাবে ধরে তুলে নিয়ে মাটিতে পা না দিয়ে শুধু বাতাসে ভর করে কত পাহাড়, উপত্যকা, নদীপ্রান্তরের উপর দিয়ে আমাকে পর্বতশিখরস্থ এক সমতল ভূমির উপর নিয়ে গেল। সেই মালভূমিটি ছিল সুন্দর সুন্দর গাছে ঘেরা। সেই উদ্যানের মধ্যে মাঝে মাঝে পথ আর কুঞ্জবন ছিল। আগে যে জায়গায় প্রথম পৃথিবীকে দেখি তখন তাকে এত সুন্দর ও মনোরম মনে হয়নি।
সেই মনোরম উদ্যানের মধ্যে আমার ঘুম ভাঙতেই দেখি আমার চারদিকে প্রতিটি গাছে ফল ঝুলছে। তা দেখে সেই সব ফল খাবার লোভ হলো আমার। আমার ক্ষুধা জাগল। দেখলাম স্বপ্নে যা দেখেছিলাম তা সব সত্য।
