ঈশ্বর স্বর্গলোক থেকে যে সব কার্য পরিচালনা করে থাকেন তা মানবজগতের জ্ঞানের গোচরীভূত না করার জন্য স্বর্গকে পৃথিবী থেকে এত দূরে রেখেছেন। মানুষ যদি পৃথিবী থেকে স্বর্গের সব কিছু দেখতে পেত তাহলে ঐশ্বরিক কার্যাবলী সম্বন্ধে তারা অনেক কিছু ভুল অনুমান করত, অথচ তার থেকে কোন লাভই হত না তাদের।
সূর্যকে কেন্দ্র করে সৌরজগতের গ্রহনক্ষত্রেরা যেন মহাশূন্যে ঘুরছে অবিরাম। মনে হয় যেন তারা ঈশ্বরের চারদিকে কখনো উপরে উঠে, কখনো নীচে নেমে, কখনো একটু এগিয়ে, কখনো কিছুটা পিছিয়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে নাচতে থাকে। তাদের গতি সব সময় একভাবে থাকে না।
পৃথিবীরূপ এই গ্রহটিকে তোমার স্থিতিশীল মনে হয় বটে, কিন্তু তারও মধ্যে তিনটি গতি আছে। আরও কয়েকটি গ্রহের এই গতি আছে। কিরণদানের ব্যাপারে সূর্যের শ্রমকে বাঁচাবার জন্য পৃথিবী পূর্বদিকে প্রতিদিন এগিয়ে যায় ঘুরতে ঘুরতে। পৃথিবীর যে দিকটি সূর্যের দিক থেকে সূর্যালোক গ্রহণ করে সেই দিকেই দিন হয় এবং তার অনালোকিত অপর দিকটিতে রাত্রি হয়। পৃথিবী আবার সূর্যের কাছ থেকে আলো নিয়ে চাঁদে স্বচ্ছ বাতাসের মধ্য দিয়ে সেই আলো পাঠিয়ে চন্দ্রলোকের দিনকে আলোকিত করে। চন্দ্র আবার তার প্রতিদানস্বরূপ রাত্রিবেলায় সূর্যের কাছ থেকে আলো নিয়ে পৃথিবীর রাত্রিকে পর্যায়ক্রমে আলোকিত করে। চন্দ্রলোকেও নিশ্চয় ফুল, ফল, মাঠ, ঘাট ও মানুষ আছে। চাঁদের মধ্যে যে সব কালো কালো দাগ দেখা যায় সেগুলি হয়ত মেঘ। সেই মেঘ থেকে বৃষ্টি হয়ে চাঁদের ভূখণ্ডকে উর্বর করে তুলে গাছে গাছে ফল ফলায়। সেই ফল নিশ্চয় তার অধিবাসী জীবরা খায়। প্রতিটি গ্রহ-উপগ্রহেই নিশ্চয় জীবন্ত প্রাণী ও নরনারী আছে। আলোর মধ্যেও নারী-পুরুষ আছে। সূর্যের আলোকে আমরা বলি পুরুষ-আলো, চাঁদের আলোকে আমরা বলি মেয়ে-আলো। প্রকৃতি পুরুষ সব জগৎ শাসন করে। প্রকৃতির রাজ্যে কোন স্থানই শূন্য বা পরিত্যক্ত থাকতে পারে না।
কিন্তু কেন এ জিনিস হলো, কেন হলো না, তা জানতে চেও না। আকাশের জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর মধ্যে সূর্য কেন এত প্রভাবশালী, সেই সূর্য পৃথিবীতে উদিত হয় কি না, সূর্য পূর্বদিক হতে তার উজ্জ্বল পথে পৃথিবীকে আলোকদান করার জন্য এগিয়ে আসে না কি, পৃথিবী পশ্চিম দিক হতে সূর্যের আলো গ্রহণ করার জন্য এগিয়ে যায়–এই সব গোপন বিষয় জানার জন্য কোন অনুরোধ করো না। এসব ব্যাপার ঈশ্বরের উপরেই ছেড়ে দাও। তাঁকে ভয় করো, তাঁর সেবা করে যাও। অন্যান্য প্রাণীরা এসব বিষয় কিছুই জানতে চায় না। তাই তারা নীরব আত্মসমর্পণের মধ্যে দিয়ে তাঁকে প্রীত করে সবচেয়ে বেশি। ঈশ্বর নিজে থেকে তোমাকে যা কিছু দিয়েছেন তাতেই সন্তুষ্ট থাক। তাতেই আনন্দলাভ করে। এই মনোরম স্বর্গোদ্যান, তোমার জীবনসঙ্গিনী ঈত–এ সবই ঈশ্বরের দান। স্বর্গে কি হচ্ছে, ঈশ্বর কি করছেন না করছেন–এসব ঊর্ধ্বলোকের ব্যাপার তোমার জ্ঞানগম্য নয়। তোমার জ্ঞানকে সীমিত করে রাখ। যে সব বিষয় তোমার জীবন ও অস্তিত্বের সঙ্গে সংজড়িত তুমি শুধু সেই সব কথাই ভাব। অন্যান্য জগতের কথা স্বপ্নেও ভাবতে যেও না। অন্যান্য গ্রহগুলিতে কারা কিভাবে এবং কি অবস্থায় বাস করে তা মর্ত্যমানবের জানার বিষয় নয়, তা একান্তভাবে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের ব্যাপার।
আদম তখন সংশয়মুক্ত হয়ে উত্তর করল, হে প্রশান্ত দেবদূত, বিশুদ্ধ স্বর্গীয় জ্ঞানের প্রতীক, তুমি আমার জ্ঞানগত কৌতূহলটিকে সম্পূর্ণরূপে পরিতৃপ্ত করেছ। আমার চিন্তাকে সমস্ত জটিলতা থেকে মুক্ত করেছ তুমি। যে সব জটিল চিন্তা ও জ্ঞানান্বেষণ বাঁচার আনন্দকে বিঘ্নিত করে সেই সব অহেতুক চিন্তা হতে মুক্ত হয়ে কিভাবে সহজ সরল জীবনযাপন করা যায় তুমি তা শিখিয়েছ আমাকে। এই সব উদ্বেগাকীর্ণ চিন্তাভাবনা থেকে ঈশ্বর দুরে থাকতে বলেছেন আমাদের। আমরা যেন অস্থির উদ্ধত চিন্তাকল্পনা ও ব্যর্থ অনুমানের দ্বারা নিজেদের অকারণে বিব্রত করে
তুলি। কিন্তু মনের ধর্মই হচ্ছে অবাধ উদ্ধত কল্পনার রাজ্যে বিচরণ করা এবং তার এই। বিচরণ বা অশান্ত গতিচঞ্চলতার বিরাম নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত না সে মন কারো দ্বারা সতর্কিত হচ্ছে, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার অভিজ্ঞতার দ্বারা জানতে পারছে দূরাম্বিত, দূরধিগম্য রহস্যজটিল ও সূক্ষ্ম বিষয়গুলিকে জানতে চাওয়া এক অর্থহীন নির্বুদ্ধিতা, তার বাস্তব ব্যবহারিক দৈনন্দিন জীবনের সীমার মধ্যে যা কিছু আছে শুধু সেই সব কিছুই তার একমাত্র জ্ঞাতব্য বিষয় এবং তার বাইরে সব কিছুই ধোঁয়া, এক শূন্যতামাত্র ততক্ষণ মন আমাদের শান্ত হয় না।
সূতরাং জ্ঞানের দিক থেকে বেশি উপরে উড়তে না গিয়ে নীচের দিকে নামাই ভাল। আমাদের ব্যবহারিক জীবনে যে সব বিষয়গুলি অপরিহার্য যা আমাদের হাতের কাছে থেকে ঘটনাক্রমে প্রশ্ন জাগায় আমাদের মনে, সেই সব বিষয় নিয়ে চিন্তা করা বা কথা বলাই উচিত আমাদের পক্ষে।
কিছুক্ষণ আগে আমার স্মৃতি ক্রিয়াশীল হবার আগে যা যা ঘটেছে তা বর্ণনা করেছ তুমি এবং আমি তা শুনেছি। এবার আমার কাহিনী শোন। এখনো দিন শেষ হয়নি। সে কাহিনী তুমি শোননি। দিন গত হলে দেখবে কেমন কৌশলে আমি তোমায় আটকে রেখে আমার কাহিনী শোনাচ্ছি। এই উদ্যানের সুমিষ্ট ফলের থেকে তোমার মুখের উত্তর-প্রত্যুত্তরগুলি অনেক বেশি মধুর বলেই তোমার কথা শুনতে চাই। শ্রমজনিত ক্লান্তির পর এখানকার তালগাছের সুস্বাদু ফলগুলি ভক্ষণ করলে শীঘ্রই আমাদের ক্ষুধাতৃষ্ণা একই সঙ্গে পরিতৃপ্তি হয়। কিন্তু তোমার মুখের মিষ্টি কথা শত শুনেও আশ মেটে না। যত শুনি ততই শুনতে মন হয়।
