আমি শুধু একটা জিনিস যুক্তি দিয়ে বোঝবার চেষ্টা করেও বুঝতে পারি না। সেটা হলো এই যে, প্রকৃতি বিজ্ঞ এবং উদার হলেও তার সৃষ্টির মধ্যে এমন সমানুপাতবিহীন তারতম্য কেন? যে প্রকৃতি উদার হাতে এত সব বিরাটাকায় গ্রহ-নক্ষত্র সৃষ্টি করেছে সেই প্রকৃতি তাদের তুলনায় এই পৃথিবীকে এত ছোট করে কেন সৃষ্টি করল?
আমাদের আদিপিতা এইসব কথা দেবদূত রাফায়েলকে বলল। তার মুখমণ্ডলের উপর এক অতৃপ্ত জ্ঞানানুসন্ধিৎসা ফুটে উঠল। ঈভ তা দেখে তার আসন থেকে উঠে এসে তাদের সামনে বসল। সে একবার ফল-ফুল কোথায় কি আছে তা দেখার ও গাছপালার সেবা করার জন্য তার কব্যকর্ম পালনের উদ্দেশ্যে উঠে দাঁড়াল। কিন্তু তার স্বামী ও দেবদূত অতিথির মধ্যে যে সব আলোচনা হচ্ছিল তা শোনার জন্য সে উঠে দাঁড়িয়েও গেল না।
সুন্দরী ঈভকে তাদের কাছে বসতে দেখে তারা প্রীত হলো। উচ্চ বিষয়ে এইসব আলোচনা সে যে বুঝতে পারছিল না তা নয়। এসব শোনার সে অযোগ্য ছিল কোনক্রমে। বরং এসব শুনে সে আনন্দই পাচ্ছিল।
তার স্বামীর সঙ্গেও নানা বিষয়ে কথাবার্তা হয় তারা যখন একা থাকে। আদম কথা বলে, সে শুনে যায়। শুনতে ভালবাসে। কত জটিল বিষয়ের সমাধান করে দেয় সে। এখন তাদের অতিথি দেবদূতের সঙ্গে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে তার স্বামীর যে সব কথাবার্তা হচ্ছিল তার মধ্যে তার স্বামীর কথাই দেবদূত্রে কথার থেকে বেশি ভাল লাগছিল তার। তার স্বামীর শুধু কথা নয়, তার জ্ঞান, তার জানার আকাঙ্ক্ষা ও বৃদ্ধির প্রশংসা না করে পারে না সে। স্বামীর প্রতি তার ভালবাসার মধ্যে মিশ্রিত ছিল শ্রদ্ধা। এমন দাম্পত্য প্রেম সত্যিই বিরল। স্বামীর প্রতি তার প্রেম যেমন ছিল অতুলনীয় তেমনি তার দেহসৌন্দর্য ও রূপলাবণ্য ছিল অনুপম। তাকে এবার দেখলেই আরও দেখার বাসনা শর হয়ে বিদ্ধ করতে থাকে।
আদমের সংশয় নিরশনের জন্য রাফায়েল এবার বলতে লাগল, এ বিষয়ে কোন কিছু প্রশ্ন করা বা গবেষণা করা আমি দোষাবহ বলি না। কারণ স্বর্গলোক হচ্ছে ঈশ্বরের এমন একটি গ্রন্থ যাতে তাঁর আশ্চর্যজনক সৃষ্টিসমূহের কথা জানতে পারা যায়। ঋতু পরিবর্তন, প্রহর, দিন, মাস, বৎসর, প্রকৃতির আবর্তনের কথা জানা যায়। জানা যায় পৃথিবী ঘোরে না গ্রহনক্ষত্রাদি সৌরজগৎ ঘোরে। বাকি বিষয় পরম স্রষ্টা মানুষ বা দেবদূতদের কাছে অপরিজ্ঞাত রেখেছেন। সে রহস্য তারা উদঘাটন করতে পারবে না বা তার কোন চেষ্টাও করবে না, তারা শুধু ঐশ্বরিক সৃষ্টিকার্যের প্রশংসা করে যাবে।
তবু যদি তারা এ বিষয়ে অনুমানের দ্বারা কিছু জানতে চায় এবং তর্কবিতর্ক করে তাতে শুধু বিবাদই বেড়ে যাবে এবং অজ্ঞতাজনিত তাদের নির্বোধসুলভ মন্তব্য ঈশ্বরের মধ্যে হাসির উদ্রেক করবে অর্থাৎ তারা তাঁর কাছে হাস্যাস্পদ হয়ে উঠবে। তারা যদি জানতে যায় স্বর্গলোকের গঠনপ্রণালী কি, কিভাবে এই বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ড গঠিত হয়েছে বা চালিত হচ্ছে, তারা যদি আকাশের অগণিত নক্ষত্ররাজিকে গণনা করতে যায় তাহলে ভুল করবে।
আমি ইতিমধ্যেই তোমার কথা ও প্রশ্ন থেকে জানতে পেরেছি তুমি ভাবছ সৌরজগতের জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর মধ্যস্থিত যে সব গ্রহনক্ষত্রগুলি আকার অনেক বড় এবং সতত আলোকোজ্জ্বল তারা অপেক্ষাকৃত ছোট ও অনুজ্জ্বল গ্রহগুলিকে আলোকদান করে কেন? তারা বড় হয়েও সব সময় সচল ও সক্রিয় এবং তারা স্বতন্ত্র ও অতন্ত্রভাবে তাদের আপন আপন কক্ষপথে আকাশ পরিক্রমা করে অথচ পৃথিবী অন্য জায়গায় স্থির হয়ে থাকে কেন? অথচ পৃথিবীই তাদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি উপকার পায়।
কিন্তু আর একটা জিনিস ভেবে দেখ, কোন বস্তু আকারে বড় এবং উজ্জ্বল হলেই যে তা গুণগতভাবে উত্তম হবে এমন কোন কথা নেই। যদিও পৃথিবী সূর্য বা অন্য সব গ্রহনক্ষত্রের তুলনায় আকারে ছোট এবং তার কোন নিজস্ব উজ্জ্বলতা নেই, তথাপি তার মধ্যে এমন অনেক মূল্যবান ও ব্যবহারযোগ্য বস্তু আছে যা জ্যোতিষ্কগুলির মধ্যে নেই। সূর্য ও গ্রহনক্ষত্রগুলি আকারে ও আয়তনে বিরাটাকায় হলেও তারা একেবারে বন্ধ্যা। কোন প্রাণীর পক্ষেই তা বসবাসযোগ্য বা ব্যবহারযোগ্য নয়। তাদের যে সব নিজস্ব গুণ আছে তার ফল তারা নিজেরাই পায় না, অথচ সেই গুণের দ্বারা পৃথিবী হয় ফলবতী। তাদের আলো পৃথিবীতেই পড়ে এবং পৃথিবী তাতে আলোকিত হয়। অথচ পৃথিবী ও তার অধিবাসীদের কাছ থেকে ঐ সব জ্যোতিষ্কগুলি কত দূরে।
স্বর্গলোকের সুবিশাল পরিমণ্ডল, তার আয়তন ও পরিধি পরম স্রষ্টার মহত্ত্বকেই সূচিত করে। তিনিই তাকে এত বড় ও বিস্তৃত করে গঠন তার সীমারেখা। বিশালায়তন স্বর্গলোকের সুবিস্তৃত পরিসরের একট মাত্র অংশে ঈশ্বর বাস করেন, বাকি স্থানে কারা বাস করে তা তিনিই জানেন। চোখে কিছুই দেখা যায় না পৃথিবী থেকে। অথচ স্বর্গে ও সৌরলোকে যারা থাকে তারা প্রচণ্ড গতিশক্তিসম্পন্ন। একটি জড়দেহের মধ্যে এমন গতিশক্তির সঞ্চার ঈশ্বরেরই সর্বশক্তিমত্তার পরিচয় দান করে। কিন্তু পৃথিবী থেকে সে গতি বোঝা যায় না।
এই আমাকেই ধরো না কেন। আমাকে তুমি ধীরগতি ভেবো না। আমি সুদূর স্বর্গলোক থেকে প্রভাতকালে রওনা হয়েছিলাম এবং বেলা দ্বিপ্রহরের আগেই এখানে এসে উপনীত হয়েছি। অথচ স্বর্গ ও মর্তের মধ্যে দূরত্ব অবর্ণনীয়, অপরিমেয়। এ বিষয়ে তোমার সংশয় দূর করার জন্যই একথা বললাম।
