এরপর ঈশ্বর তার সিংহাসনে উপবেশন করলে দশ হাজার বীণা তাঁর বন্দনাগানে ধ্বনিত হতে লাগল আর সেই মধুর ধ্বনি পৃথিবীর শান্ত আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল। মহাশূন্যে ঘূর্ণমান গ্রহনক্ষত্রগুলি সহসা স্তব্ধ হয়ে সেই বন্দনাগীতির সুর শুনতে লাগল। হে স্বর্গলোক, তোমার শাশ্বত দ্বারপথগুলি উন্মুক্ত করে দাও। সেই দ্বারপথে যেন ছয় দিন ধরে যে সব সৃষ্টি করেছেন এবং যে নূতন জগৎ সৃষ্টি করেছেন ঈশ্বর তা সব প্রবেশাধিকার পায়। সেই নূতন জগতে যে সুখী মানবজাতি বাস করবে সেখানে পরম স্রষ্টা ঈশ্বর মাঝে মাঝে ভ্রমণ করতে যাবেন। সেই জগতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের জন্য প্রায়ই দেবদূতদের পাঠাবেন।
এইভাবে দেবদূতেরা স্বর্গলোকের ঈশ্বরের বন্দনাগান গাইল। সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার আকাশে দৃষ্ট ছায়াপথের মত নক্ষত্রখচিত একটি প্রশস্ত পথ ঈশ্বরের পবিত্র আবাসভূমি পর্যন্ত উন্মুক্ত হলো। সে পথের প্রতিটি ধূলিকণা পর্যন্ত সুবর্ণময়। এদিকে মর্ত্যলোকে সূর্য অস্ত যাওয়ায় পূর্বদিক হতে সন্ধ্যা সমাগত হলো। আভাসিত হয়ে উঠল আসন্ন রাত্রি।
এদিকে স্বর্গের উধ্বলোকে সেই পবিত্র পর্বতশীর্ষে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত ঈশ্বরের রাজসিংহাসনের পাশে এসে ঈশ্বরপুত্ৰ উপবেশন করলেন।
ক্রমাগত ছয়দিন ধরে সৃষ্টিকার্যে ব্যাপৃত থাকার পর বিশ্রাম গ্রহণ করতে লাগলেন ঈশ্বর। সকল কর্ম হতে বিরত হলেন। কিন্তু একেবারে নিঃশব্দে অতিবাহিত হলো না সে বিশ্রামকাল। অজস্র বীণাবাদন সহযোগে বন্দনাগান গীত হতে লাগল দেবদূতদের দ্বারা। এক সোনালী, তরল ও গন্ধবহ মেঘমালা বিস্তৃত হয়ে আচ্ছন্ন করে ফেলল সেই পবিত্র পর্বতশীর্ষস্থ ঈশ্বরের আবাসভূমিটিকে।
দেবদূতেরা তাদের সেই স্তুতিগানে বলতে লাগল, হে জেহোভা, পরম ঈশ্বর, কি মহান তোমার সৃষ্টি, অনন্ত তোমার শক্তি। কোন চিন্তা সে শক্তির পরিমাপ করতে পারে না। কোন ভাষা তা প্রকাশ বা বর্ণনা করতে পারে না। দেবদূতেরা তাদের পূজার্চনার মাধ্যমে তাদের অন্তরের যে ভক্তি-শ্রদ্ধা দান করে তোমায়, তার থেকে অনেক বেশি তারা প্রতিগ্রহণ করে তোমার কাছ থেকে। সেদিন তোমার অজস্র বজ্রের শক্তি সক্রিয় হয়ে ওঠে। কিন্তু তুমি যে পরিমাণ ধ্বংসকার্য সাধন করেছ তার থেকে অনেক বেশি তোমার সৃষ্টিকার্যের পরিমাণ।
হে স্বর্গাধিপতি, কে তোমার শক্তিকে খর্ব করতে পারে? কে তোমার সীমাহীন সাম্রাজ্যকে অধিকার করতে পারে? কত অনায়াসে তুমি বিদ্রোহী দেবদূতদের সকল চক্রান্তকে ব্যর্থ করে দাও। যারা তোমার মহান শক্তিকে খর্ব করতে চায় তারা তাদের অজানিতে তোমার শক্তির মহিমাকে বাইরে প্রকাশিত ও প্রকটিত করে তোলে। যে বিদ্রোহীরা ভেবেছিল তোমার সঙ্গে শক্তিপরীক্ষায় জয়ী হয়ে তোমার বহুসংখ্যক ভক্তকে তোমার প্রতি বিমুখ করে তুলে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাবে, তারা ব্যর্থ ও বিতাড়িত হয়ে তোমার শক্তির শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করল অবিসম্বাদিতভাবে। গূঢ় গোপন সকল অশুভ শক্তিকেই দেখতে পাও তুমি। শুভ ও মঙ্গলজনক সৃষ্টির দ্বারা সেই সব অশুভ শক্তিকে ব্যর্থ ও বিদূরিত করো তুমি।
তুমি তোমার এই গৌরবোজ্জ্বল সিংহাসন হতে পৃথিবী নামে তোমার সৃষ্ট যে নূতন জগৎকে প্রত্যক্ষ করছ তা হচ্ছে মানবজাতির মনোরম স্থায়ী বাসস্থান। সেখানে মানবজাতি সুখে বসবাস করে তোমার উপাসনা করবে এবং তার পুরস্কারস্বরূপ সমুদ্র ও আকাশসমন্বিত পৃথিবীর উপর প্রভুত্ব করবে তারা। একজন আদিপিতা ও আদিমাতা থেকে অসংখ্য মানব সৃষ্ট হয়ে তোমার উপাসনা করবে, তোমাকে ভক্তি করবে।
এইভাবে স্তুতিগান করল তারা এবং সে গানের সুরে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হলো স্বর্গের সাম্রাজ্য। এইভাবে সম্পন্ন হলো তাদের ধর্মোৎসব।
হে আদম, তোমার অনুরোধ আমি রক্ষা করলাম। তুমি জানতে চেয়েছিলে কিভাবে এই পৃথিবীর সৃষ্টি হয়, তোমার স্মৃতিশক্তি জাগ্রত হবার আগে কি কি ঘটেছিল, যাতে তুমি তোমার উত্তরসুরীদের সে সব কথা জানাতে পার। কিন্তু যা মানুষের জ্ঞাতব্য নয়, যা তাদের জ্ঞানের সীমার অতীত তা যেন জানতে চেও না।
০৭ম সর্গ
সপ্তম সর্গ
দেবদূত রাফায়েলের কথা শেষ হলে তার কণ্ঠস্বর আদমের কানে এমনভাবে অনুরণিত হতে লাগল যে তার মনে হলো তার কথা যেন শেষ হয়নি তখনো। মনে হলো এখনো সে সব কথা শুনতে পাচ্ছে।
তখন সে সদ্যনিদ্রোখিত ব্যক্তির মত বলতে লাগল, হে ঐশ্বরিক দৈব ঐতিহাসিক, কি বলে ধন্যবাদ দেব তোমায়? তোমার এ কর্মের জন্য কি প্রতিদান দেব তোমায়? তুমি আমার জ্ঞানপিপাসা নিবৃত্ত করার জন্য অনেক কিছু বলেছ। যে জ্ঞান শত অনুসন্ধান ও চেষ্টার দ্বারা অধিগত করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে, তুমি তোমার দৈব মর্যাদার আসন হতে পরম বন্ধুর মত নেমে এসে সে জ্ঞান আমায় দান করেছ। সে জ্ঞানের কথা আমি বিস্ময় ও আনন্দের সঙ্গে সব শুনেছি এবং উপযুক্ত গৌরবদানের দ্বারা আমাদের পরম স্রষ্টাকেই অনিন্দিত করছি।
তথাপি কিছু সংশয় এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে এবং একমাত্র তুমিই তার সমাধান করতে পার।
যখন আমি স্বর্গ ও মতসমন্বিত এই জগৎকে প্রত্যক্ষ করি এবং তার বিশালতাকে অনুধাবন করার চেষ্টা করি তখন এই পৃথিবীকে অনন্ত প্রসারিত আকাশের তুলনায় একটি শস্যকণা বা অণু বলে মনে হয়। আকাশের অসংখ্য নক্ষত্ররাজি যে দূরত্বের ব্যবধানে আপন আপন কক্ষপথে ঘুরতে থাকে তা সত্যিই রহস্যময় এবং দুর্বোধ্য।
