এই ব্যাপারে ঈশ্বর প্রথমে আকাশের জ্যোতিষ্কমণ্ডলের মধ্যে প্রথমে সূর্য ও এক ক্ষীণালোকসম্পন্ন নক্ষত্রমণ্ডলের সৃষ্টি করলেন। সূর্য যেমন দূরের আকাশ থেকে দিনের বেলায় পৃথিবীর একটি গোলার্ধকে আলোকদান করতে লাগল আর সূর্য থেকে আলোকসম্ভার বার করে চন্দ্র দূর থেকে পৃথিবীর অন্য একটি গোলার্ধকে অপেক্ষাকৃত কম উজ্জ্বল আলোকদান করতে লাগল। এই চন্দ্র হাজার হাজার নক্ষত্ৰদ্বারা পরিবৃত। রাত্রিশেষে আকাশে সূর্য উদিত হবার আগেই ঊষাকালে সূর্যের অগ্রবর্তী আলোকরশ্মির দ্বারা আকাশের পূর্ব দিগন্ত আলোকিত হয়। তারপর সূর্য ধীরে ধীরে উদিত হয় এবং দিবাভাগ শুরু হয়। এই হলো চতুর্থ দিন।
অতঃপর ঈশ্বর বললেন, পৃথিবীর জলরাশিতে সরীসৃপ জাতীয় প্রচুরসংখ্যক জীব সৃষ্টি হোক। এই বলে তিনি জলের মধ্যে তিমি মাছ ও নানা প্রকার জলজ জীবজন্তুর সৃষ্টি করলেন।
তারপর সৃষ্টি করলেন নানা রকমের পাখি যারা পাখা মেলে উড়ে বেড়াতে লাগল নীল আকাশে। নানা রকম মাছ তাদের পাখনা আর উজ্জ্বল চকচকে আঁশ নিয়ে জলের তলায় ঘুরে বেড়াতে লাগল। তারা কখনো একা একা আবার কখনো বা তাদের সাথীসহ জলজ আগাছা-সমূহ ভক্ষণ করতে লাগল। খেলা করে বেড়াতে বেড়াতে মাঝে মাঝে তারা জলের উপরিপৃষ্ঠে তাদের মুক্তোর মত চকচকে গাগুলোকে তুলে ধরতে লাগল সূর্যের আলোয়।
তারপর সমুদ্রের মধ্যে সবচেয়ে বৃহদাকার লেভিয়াথান বা বিরাটাকায় এক জলজন্তুর উৎপত্তি হলো। তারা কখনো ঘুমোতো, কখনো বা সাঁতার কাটতো জলে। সাঁতার কাটার সময় তাদের এক একটি সচল দ্বীপের মত দেখাত। আকারে তারা এমনই বড় ছিল।
তারপর ঈগল পাখিরা পাহাড়ের চূড়ায় ও দেবদারু গাছের উপর বসে থাকতে লাগল আবার কখনো উড়ে বেড়াতে লাগল। সারস পাখিরা বছরে একবার এক একটি জায়গায় অনুকূল বাতাসে ভর করে উড়ে আসত। এ ছাড়া আরও কত সব ছোট ছোট পাখি তাদের গানের মিষ্টি স্বরে বনভূমিগুলিকে মুখরিত করে তুলত। মধুকষ্ঠি নাইটিঙ্গেলরা গান গাইত রাত্রিতে।
শুভ্রপক্ষ শুভ্রবক্ষ জলচর হাঁসেরা নদী ও হ্রদে সাঁতার কেটে বেড়াতে লাগল সারিবদ্ধভাবে।
এইভাবে জল, মাছ ও জলজন্তুর দ্বারা এবং পৃথিবীর আকাশ বাতাস ও পাখিদের দ্বারা পূর্ণ হওয়ায় সৃষ্টির পঞ্চম দিন গত হলো।
ষষ্ঠ দিনে ঈশ্বর বললেন, এবার পৃথিবীতে বিভিন্ন শ্রেণীর পশু সৃষ্টি হোক। সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী সে আদেশ পালন করল। পৃথিবীর স্থলভাগে অসংখ্য ও বিভিন্ন জাতীয় জন্তু-জানোয়ার জন্মগ্রহণ করল। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই তারা পূর্ণ আকৃতি লাভ করল। ব্যাঘ্র, সিংহ প্রভৃতি বন্য হিংস্র জন্তুর সঙ্গে সঙ্গে মেষ, মৃগ, গরু প্রভৃতি শান্ত পশুর সৃষ্টি হলো। স্থলচর সর্প ও মৌমাছির সৃষ্টি হলো।
কিন্তু বন্যজন্তুদের প্রকৃতি যাই হোক, তোমাদের পক্ষে কিন্তু তারা কেউ ক্ষতিকর হবে না। বরং তোমার ডাকে সবাই শান্তভাবে আসবে তোমার কাছে।
এইভাবে স্বর্গ ও মর্ত্য আপন আপন গৌরব ও গরিমায় মণ্ডিত হয়ে আপন আপন কক্ষপথ পরিক্রমা করতে লাগল। পৃথিবীর মাটি, জল ও আকাশ বিভিন্ন জাতীয় প্রাণীর দ্বারা পূর্ণ হয়ে গৌরববোধ করতে লাগল।
সৃষ্টির ষষ্ঠ দিন তখনো অতিবাহিত হয়নি। ঈশ্বর তখন সহসা উপলব্ধি করলেন, তিনি এতকিছু সৃষ্টি করা সত্ত্বেও সৃষ্টিকার্য সম্পূর্ণ হয়নি তাঁর। তাঁকে এখনো এমন এক প্রাণী সৃষ্টি করতে হবে যারা অন্যান্য বন্যজন্তুদের মত বন্য বা বর্বর নয়, যাদের যুক্তিবোধ আছে এবং যারা বিভিন্ন সদ্গুণাবলীতে ভূষিত। এই প্রাণী অন্যান্য প্রাণীদের শাসন করবে এবং যার মহত্ত্ব স্বর্গবাসীদের সমতুল।
তাই পরম পিতা তাঁর পুত্রকে বললেন, এবার আমরা আমাদেরই প্রতিরূপ মানুষ সৃষ্টি করি। তারা হবে দেহের দিক থেকে আমাদেরই প্রতিমূর্তি। তারা পৃথিবীতে জলে স্থলে অন্তরীক্ষে সকল জীবের উপর প্রভুত্ব করবে।
এই বলে তিনি হে আদম, তোমাকে সৃষ্টি করলেন। তুমিই হচ্ছ আদি মানব। তোমার নাসারন্ধ্র দিয়ে প্রাণবায়ু প্রবাহিত হচ্ছে। তোমাকে তিনি তাঁরই প্রতিরূপ হিসাবে সৃষ্টি করেছেন। তুমি এক জীবন্ত আত্মা। তোমাকে পুরুষজাতি এবং তোমার সাথীকে নারীজাতিরূপে সৃষ্টি করেছেন। তোমাদের থেকে সৃষ্টি হবে মানবজাতির।
সৃষ্টির পরেই তোমাদের তিনি বলেছেন, হে মানব, সংখ্যাবৃদ্ধি করো। সমগ্র পৃথিবীকে মানবজাতির দ্বারা পরিপূর্ণ করে পৃথিবীর জলে স্থলে বিচরণকারী সকল জীবের উপর প্রভুত্ব করো। ঈশ্বর তাঁরই বৃক্ষশোভিত এই মনোরম উদ্যান মধ্যস্থিত কুঞ্জবনে নিয়ে এসেছেন তোমাকে। এখানকার সুন্দর সুন্দর ফলগুলি তোমারই ভক্ষণের জন্য দান করেছেন তিনি। কিন্তু একমাত্র জ্ঞানবৃক্ষের ফল তুমি ভক্ষণ করতে পাবে না। যেদিন তুমি তা ভক্ষণ করবে সেইদিনই তোমার মৃত্যু ঘটবে। মৃত্যুই তার শাস্তি। সুতরাং তোমার ক্ষুধা আর কৌতূহলকে নিয়ন্ত্রিত করবে। তা না হলে নিয়মভঙ্গের জন্য পাপ আর সেই পাপের ফলে মৃত্যু অনিবার্য।
এইখানেই সমাপ্ত হলো ঈশ্বরের সৃষ্টিকার্য। তিনি যা যা সৃষ্টি করেছেন তা সব নিরীক্ষণ করলেন। এইভাবে ষষ্ঠ দিন সমাপ্ত হলো।
এইসব সৃষ্টিকার্যে ঈশ্বর কোন ক্লান্তিবোধ না করলেও কাজ শেষ করে স্বর্গলোকের ঊর্ধ্বতন লোকে তার আবাসভূমিতে উঠে গেলেন তিনি। সেখান থেকে তিনি তার সৃষ্ট নূতন জগৎকে প্রত্যক্ষ করতে লাগলেন। এই নূতন জগতের দ্বারা আরও প্রসারিত হলো তাঁর সাম্রাজ্য। তাঁর সিংহাসন থেকে সে জগৎ দেখতে কত সুন্দর, কত ভাল। তিনি ঠিক যেমনটি চেয়েছিলেন ঠিক তেমনটি।
