সেই নতুন জগতের পরিধি ও সীমা নির্ধারণের জন্য হাতে একটি সোনার দিকনির্ণয়যন্ত্র নিলেন ঈশ্বরপুত্র। একটি পাকে শূন্যে এক জায়গায় স্থাপন করে সেটিকে কেন্দ্র করে আর একটি পাকে প্রসারিত করে ও চক্রাকারে ঘুরিয়ে তিনি বলতে লাগলেন, হে নবজাত জগৎ, তুমি এই পর্যন্ত প্রসারিত হবে, এই হবে তোমার পরিধি বা প্রান্তসীমা।
এইভাবে শূন্য থেকে সৃষ্টি হয় এই পৃথিবীর। সৃষ্টির আগে সেই সর্বব্যাপী শূন্যতা গভীর অন্ধকারে আচ্ছন্ন ছিল। তারপর প্রথমে শান্ত জলরাশির সৃষ্টি হলো। ঈশ্বরের আত্মা তখন সেই শান্ত জলরাশির উপর পাখা বিস্তার করে তাঁর প্রাণশক্তির সঞ্চার করলেন। সেই তরল পদার্থকে উত্তপ্ত করলেন। তারপর তার উপর বাতাস ও মাটি সৃষ্টি করে তাদের এক ভারসাম্যের মধ্যে স্থাপন করলেন। এইভাবে পৃথিবীর উৎপত্তি হলো।
তারপর ঈশ্বর বললেন, আলো হোক। সঙ্গে সঙ্গে সেই অন্ধকার গহ্বরের গম্ভীর হতে আলোক উৎপন্ন হয়ে পূর্বদিক হতে সেই শূন্যপথে আকাশ পরিক্রমা করতে লাগল। কিন্তু পৃথিবীতে তখন সূর্য ছিল না। ঈশ্বর তখন পৃথিবীকে উত্তর ও দক্ষিণ–এইদুটি গোলার্ধে বিভক্ত করে আলো ও অন্ধকারকেও ভাগ করে দিলেন। আলোকে দিন আর অন্ধকারকে রাত্রি নাম দিলেন।
স্বর্গের দেবদূতরা যখন প্রথম অন্ধকারের ভিতর হতে স্বচ্ছ আলোকরশ্মিকে বেরিয়ে আসতে দেখল, তখন তারা আনন্দে অভিভূত হয়ে পড়ল। তারা তখন আনন্দোৎসবের সঙ্গে পৃথিবীর জন্মোৎসব পালন করতে লাগল। তাদের উল্লসিত আনন্দধ্বনিতে পরিপূরিত হয়ে উঠল পৃথিবীর আকাশ-বাতাস। সোনার বীণা বাজিয়ে পরম স্রষ্টা ও তার সৃষ্টিকার্যের গৌরবগান করতে লাগল তারা।
এরপর ঈশ্বর বললেন, আকাশ হোক জলের উপরে। এইভাবে ঈশ্বর স্বচ্ছ বায়ুমণ্ডলে পূর্ণ আকাশ উৎপন্ন করে গোলাকার পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করে দিলেন। এই আকাশ উপরের জল থেকে নিচেকার জলরাশিকে বিভক্ত করে দিল। পৃথিবীর নিম্নভাগের অনন্ত জলরাশি মহাসমুদ্ররূপে বিস্তৃত হয়ে রইল। ঈশ্বর আকাশকে স্বর্গ নামে অভিহিত করলেন। পৃথিবী সৃষ্টির দ্বিতীয় দিনে সকাল সন্ধ্যায় দেবদূতেরা সমবেত কণ্ঠে ঈশ্বরের স্তোত্ৰগান করতে লাগল।
পৃথিবী সৃষ্টি হলো বটে, কিন্তু তার জলময় গর্ভে তখন জ্বণের মত যে মাটি ছিল তা বাইরে প্রকাশ পেল না। পৃথিবীর সমগ্র উপরিপৃষ্ঠ জুড়ে অনন্ত মহাসমুদ্র প্রবাহিত হতে লাগল। কিন্তু জল একেবারে নিষ্ক্রিয় ছিল না। তার থেকে তপ্ত বাষ্প উখিত হচ্ছিল। এক আদ্রতা আচ্ছন্ন করেছিল পৃথিবীকে।
ঈশ্বর তখন বললেন, হে আকাশ ও নিকটস্থ জলরাশি, তোমরা একত্রিত হও এক জায়গায়, শুষ্ক ভূমিকে উত্থিত হতে দাও।
সঙ্গে সঙ্গে বহু বিরাট পর্বত বেরিয়ে এল সেই জলরাশির মধ্য হতে। তাদের মাথায় ও পৃষ্ঠদেশে ছিল মেঘের আস্তরণ। সেইসব পর্বতের চূড়াগুলি আকাশ পর্যন্ত উঠে গেছে। তাদের মাথাগুলি যেমন আকাশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, তাদের নিম্নদেশও সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত ছিল বিস্তৃত। সেই খাড়াই পর্বতগুলির গাত্রদেশগুলিকে বিধৌত করে তরঙ্গায়িত জলরাশি প্রবাহিত হয়ে যেতে লাগল।
তারপর ঈশ্বর শুষ্ক তটভূমিসমম্বিত অনেক নদী সৃষ্টি করলেন পৃথিবীতে। তিনি বললেন, পৃথিবীর শুষ্ক ভূমিগুলি সবুজ তৃণগুল্মদ্বারা আচ্ছাদিত হোক। অনেক ফলবান বৃক্ষরাজি উৎপন্ন হোক এবং এক একটি বৃক্ষ তাদের শ্রেণী ও গুণানুসারে এক এক রকমের বিশেষ ফল দান করুক।
ঈশ্বর আদেশদানের সঙ্গে সঙ্গে শুষ্ক মরুভূমির মত পৃথিবীর ভূখণ্ডগুলি তৃণগুল্ম ও অরণ্যরাজির দ্বারা সমাচ্ছাদিত হয়ে মনোরম সবুজের শোভায় শোভিত হয়ে উঠল। বৃক্ষলতাগুলি বিভিন্ন বর্ণগন্ধময় পুষ্পে মণ্ডিত হয়ে উঠল।
প্রথমে ঝোপেঝাড়ে বিভিন্ন লতাগুল্ম ও পরে একে একে অসংখ্য বৃক্ষ তাদের সবুজ পত্ৰশোভিত শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে ফলবতী হয়ে উঠল। কত নদী ও ঝর্ণার জলধারাবিধৌত উপত্যকাগুলি তৃণগুল্ম ও পুষ্পিত ফুলের দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে মনোরম আকার ধারণ করল। শুষ্ক প্রস্তরময় পর্বতশীর্ষগুলিও অরণ্যের দ্বারা আচ্ছাদিত হয়ে উঠল। ক্রমে সমগ্র মর্ত্যভূমি অসংখ্য পাহাড়, পর্বত, উপত্যকা, প্রান্তর, নদী, পুষ্প ও অরণ্য সমন্বিত হয়ে এমন মনোহর শোভায় শোমান হয়ে উঠল যে তা দেবভোগ্য হয়ে উঠল। দেবতারাও সেখানে প্রমোদভ্রমণে বিশেষ প্রীত হতে পারেন। ক্রমে শিশির, কুয়াশা, মেঘ ও বৃষ্টির দ্বারা জলসিঞ্চিত ও সিক্ত করে পৃথিবীর তৃণলতাগুল্ম ও গাছগুলিকে সবুজ ও সজীব করে তুললেন ঈশ্বর। তিনি দেখলেন এই সব কিছুই মঙ্গলময়। এই হলো বিশ্বসৃষ্টির তৃতীয় দিন।
তারপর সর্বশক্তিমান ঈশ্বর বললেন, ঊর্ধ্বলোকে অনন্তবিস্তৃত আকাশের উপর আলোক সৃষ্ট হয়ে পৃথিবীর দিবারাত্রিকে সুস্পষ্টরূপে বিভক্ত করুক এবং তার ফলে একে একে ঋতুর আবক্স ও মাস বৎসরের পরিক্রমা শুরু হোক।
পৃথিবীকে ঠিকমত আলোকিত করার জন্য ও আলোকমালার গতিকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য আকাশের ঊর্ধ্বে অবস্থিত স্বর্গলোকে এক কার্যালয় স্থাপিত হলো। দিনে ও রাত্রিতে পৃথিবীকে পর্যায়ক্রমে আলোকিত করার জন্য সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্রমণ্ডলের সৃষ্টি করেন ঈশ্বর। সূর্য পৃথিবীর দিনকে আলোকিত করতে লাগল এবং চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি রাত্রিকে আলোকিত করে অন্ধকার হতে আলোকে পৃথক করে তুলল।
