জেনে রাখ, স্বর্গের ভূতপূর্ব দেবদূতদের প্রধান লুসিফারের পতন ঘটলে এবং সে তার অনুগত বিদ্রোহী সেনাদের নিয়ে জ্বলন্ত নরককুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হলে ঈশ্বরপুত্র সদলবলে ঈশ্বরের সিংহাসনের কাছে বিজয়গৌরবে ফিরে এলেন।
ঈশ্বর তখন তাঁর পুত্রকে বললেন, অবশেষে আমার প্রতিহিংসাপরায়ণ শক্তির পতন ঘটল। ব্যর্থ হলো তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ। সে ভেবেছিল স্বর্গের সব দেবদূতই তার মত বিদ্রোহী হয়ে উঠবে। ভেবেছিল স্বর্গের সব দেবদূতদের ঈশ্বরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী করে তুলে তাদের সাহায্যে আমাদের সিংহাসনচ্যুত করে সমগ্র স্বর্গসাম্রাজ্যের অধীশ্বর হয়ে উঠবে। তাই সে প্রতারণা ও ছলনামূলক কথায় অনেক দেবদূতকে বশীভূত করে বিদ্রোহী করে তোলে। তাদেরও তাই পন ঘটে। তাদের আর কোন দিন স্থান হবে না এই স্বর্গলোকে। তবে বেশির ভাগ দেবদূতই আজও আমার অনুগত আছে। স্বর্গের জনসংখ্যা খুব একটা কম না হলেও এই স্বর্গলোকের মধ্যে বিস্তীর্ণ অঞ্চল আছে যেখানে কোন লোকবসতি নেই। তাছাড়া এখানে মন্দিরে আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্ম ও পূজা-অর্চনার জন্য অনেক লোক দরকার। কিন্তু ইতিমধ্যেই আমার এই স্বর্গলোকের অনেক অধিবাসীদের তার দলভুক্ত করে নিয়ে গিয়ে যে ক্ষতি সে আমার করেছে সে ক্ষতি পূরণ করতে হবে আমাকে।
আমার যতই ক্ষতি হোক, আমি একমুহূর্তে আর এক জগৎ সৃষ্টি করব। একজন মানুষ থেকে অসংখ্য মানুষ জন্মলাভ করে সে জগতে বাস করবে। সে জগৎ হবে এই স্বর্গলোক থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। এই মানবজাতিকে তাদের গুণাবলীর উন্নতিসাধনের দ্বারা ধীরে ধীরে উন্নীত করার জন্য কিছুকাল তাদের সেই জগতে অর্থাৎ মর্ত্যলোকে রাখব। সেখানে তাদের আনুগত্য ও ঈশ্বরভক্তির পরীক্ষা করব। পরে তারা সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে এবং দেবোপম গুণগরিমায় সমুন্নত হলে আমি তাদের সেই মর্ত্যকে একদিন স্বর্গলোকে পরিণত করব এবং এই স্বর্গ ও মতের সব ব্যবধান লুপ্ত করে দিয়ে দুটি জগৎকে এক করে তুলব। দুটিকে যুক্ত করে এক রাজ্যে পরিণত করব এবং সেই সম্মিলিত স্বর্গরাজ্যে দেবতা ও মানুষ সব এক হয়ে সকলে মিলেমিশে এক অনন্ত মিলনানন্দ উপভোগ করবে।
এখন আমি তোমার মাধ্যমে এ কাজ করতে চাই। তুমিই এ কাজ সম্পন্ন করবে। সুতরাং হে আমার পুত্র, তুমি যাও। এই স্বর্গলোকের নিম্নদেশে যে শূন্যতার গহ্বর অতলান্তিক গভীরে নেমে গেছে, তুমি সে শূন্যতাকে শুধু মর্ত্যলোকে পরিণত হবার জন্য আদেশ করবে। সঙ্গে সঙ্গে তা মর্ত্যজগৎ হয়ে উঠবে। মনে রাখবে, সেই শূন্যতার মাঝেও আমি আছি। আমার সীমাহীন অন্তহীন সত্তা কোন এক বিশেষ স্থানে আবদ্ধ থাকে না। আমি জলে স্থলে অন্তরীক্ষের শূন্যতায় এক সর্বব্যাপী মহাসত্তায় বিরাজিত থাকি।
সর্বশক্তিমান ঈশ্বর এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সে আদেশ কার্যকরী করার জন্য সময়ের থেকে দ্রুতগতিতে চলে গেলেন ঈশ্বরপুত্র। ঈশ্বরের এই ইচ্ছা ঘোষিত হতেই এক বিপুল আনন্দের সাড়া পড়ে গেল স্বর্গলোকে। ঈশ্বরের জয়গান গাইতে লাগল দেবদূতেরা। ভবিষ্যৎ মানবজাতির শান্তিপূর্ণ আবাসভূমির প্রতি অকুণ্ঠ শুভেচ্ছা জানাতে লাগল তারা। তারা বলল, ঈশ্বরের প্রতিশোধাত্মক রোষ পবিত্র স্বর্গভূমি হতে ঈশ্বরদ্রোহীদের ও সকল অশুভ শক্তিকে ন্যায়সঙ্গতভাবে বিতাড়িত করে তাদের জায়গায় এক নূতন প্রজাতিকে সৃষ্টি করতে চলেছেন।
এইভাবে পরম মঙ্গলময় ও পরম স্রষ্টা ঈশ্বরের গৌরবগান করতে লাগল সাধু দেবদূতেরা। তারা বুঝতে পারল এইভাবে তাদের পরম-পিতার মঙ্গলময় শুভপ্রসারী হস্ত লোকে লোকান্তরে যুগ যুগান্তরে চিরকাল ধরে প্রসারিত হবে।
এদিকে ঈশ্বরপুত্রের সেই বিরাট সৃষ্টি-অভিযান শুরু হয়ে গেল। সর্বশক্তিমানের শক্তিতে সমৃদ্ধ হয়ে তার জ্যোতিতে মস্তক ও মুখমণ্ডলকে দ্যোতিত করে তিনি যাত্রা শুরু করার জন্য প্রস্তুত হলে অসংখ্য রথ এসে উপনীত হলো তাঁর সামনে। অসংখ্য দেবদুত তাঁর সহকারী হিসাবে তার সঙ্গে যাবার জন্য এগিয়ে এল।
স্বর্গের অনন্ত ঐশ্বর্যসম্ভার ও অজস্র দেবদূতে পরিপূর্ণ রথগুলি যেতে লাগল । স্বর্গসীমান্তের দিকে। সবার আগে ছিল ঈশ্বরপুত্রের রথ। ঘর্ঘর শব্দে রথগুলি নিকটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বর্গদ্বার উন্মুক্ত হয়ে গেল আপনা থেকে।
এক নূতন জগৎসৃষ্টির মানসে অগ্রসরমান ঈশ্বরপুত্র ও দেবদূতেরা স্বর্গলোকের সেই শেষ প্রান্তে উপনীত হয়ে থামলেন।
ঈশ্বরপুত্র সেখান থেকে দৃষ্টি প্রসারিত করে অবলোকন করলেন। তিনি দেখলেন, স্বর্গলোকের প্রান্তসীমা যেখানে শেষ হয়েছে সেই উপকূলভাগের পর থেকেই শুরু হয়েছে এক অপরিমেয় শূন্যতার অন্ধকার গহুর। সে শূন্যতার যেন শেষ নাই, সমুদ্রের মতোই অন্তহীন, অতলান্তিক ও সর্বগ্রাসী সেই শূন্য গহ্বরের অতল থেকে সমুদ্র তরঙ্গের মতই বেগবান বাতাসের বিশাল ঢেউগুলি সমুন্নত স্বর্গলোককে আঘাত হানার জন্য ছুটে আসতে লাগল প্রবলতম উচ্ছ্বাসে।
ঈশ্বরপুত্র সেইদিকে তাকিয়ে জলদগম্ভীর স্বরে বললেন, স্তব্ধ হও হেবিক্ষুব্ধ বায়ুপ্রবাহ ও তরঙ্গমালা, হে গভীর গহুর, শান্ত হও। তোমাদের সর্বগ্রাসী ক্ষোভের অবসান ঘটুক।
এই বলে কিন্তু ক্ষান্ত হয়ে রইলেন না ঈশ্বরপুত্র। তিনি দেবদূতদের পাখায় ভর করে তার পরম পিতার গৌরবে গৌরবমণ্ডিত হয়ে সেই শূন্যগহ্বরের মধ্যে ঝাঁপ দিলেন। এক সীমাহীন শূন্যতার মধ্য থেকে কোন্ অলৌকিক শক্তিবলে এক নূতন জগতের সৃষ্টি করেন ঈশ্বরপুত্র তা দেখার জন্য দেবদূতেরাও তাঁর সঙ্গে তাদের পাখা মেলে ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই গহ্বরে।
