হে ইউরানিয়া, তুমি আমার গানকে শ্রুতিমধুর করে তোল। কিন্তু সুরার দেবতা আনন্দোন্মত্ত বেকারসের বেসুরো বর্বর সঙ্গীতের মত সে সঙ্গতি যেন না হয়। বেকাস একবার রোডোপে একজন থ্রেসীয় চারণকবিকে রেগে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলেন। সেখানে প্রতিটি অরণ্য ও পাহাড় উল্লসিত হয়ে সেই কবির গান শুনত। কিন্তু মত্ত বেকাসের অত্যাচারে সেই কবির কণ্ঠ ও বীণার সুর পৈশাচিক তর্জন-গর্জনের মধ্যে ডুবে যায়। তখন মিউজ বা সঙ্গীত ও কাব্যকলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী তাঁর পুত্রকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেননি। হে ইউরানিয়া, আমি তোমাকে অনুনয়-বিনয় করছি, আমার কথা শোন। কারণ তুমি স্বর্গের দেবী।
হে দেবী বল, অন্যতম প্রধান দেবদূত রাফায়েল শয়তানদের সেই ভয়ঙ্কর পতনের দৃষ্টান্ত দ্বারা আদমকে সতর্ক করে দিলে কি হলো। যাতে আদম ও মানবজাতির স্বর্গীয় বিধান লঙ্ঘনের জন্য শয়তানদের মত পতন না হয় তাকে বারবার সাবধান করে দিল, তারা যেন সেই জ্ঞানবৃক্ষকে স্পর্শ না করে। তারা ক্ষুধাতৃপ্তির জন্য যে কোন বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করতে পারে, কিন্তু তারা যেন জ্ঞানবৃক্ষের ফল আস্বাদন করতে না যায়। তারা যদি ঈশ্বরের অমোঘ নিষেধাজ্ঞা ঘুণাক্ষরেও অমান্য করে তাহলে তাদেরও পতন অনিবার্য। এই বলে তাদের সাবধান করে দিল রাফায়েল।
রাফায়েলের কথাগুলি এবং অতীতের কাহিনী শ্রদ্ধা ও মনোযোগসহকারে শুনল আদম ও তার স্ত্রী ঈভ। শুনতে শুনতে গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগল তারা। কথাগুলি অদ্ভুত মনে হলো তাদের। যে স্বর্গলোকে স্বয়ং ঈশ্বর বাস করেন এবং সতত পরম শান্তি ও স্বর্গীয় সুখ বিরাজ করে সেই স্বর্গে ঘৃণা, যুদ্ধবিগ্রহ বা কোন শৃংখলার স্থান থাকতে পারে–একথা অকল্পনীয় তাদের কাছে। তবে যাই হোক, অশুভ শক্তিগুলি শীঘ্রই নিঃশেষে বিতাড়িত হয়েছে স্বর্গ থেকে। অশুভ শক্তি কখনো পরম শুভ ঐশ্বরিক শক্তির সঙ্গে থাকতে পারে না মিলেমিশে।
অবশেষে আমাদের মনে যে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছিল সে তা ব্যক্ত করল। তবু তার মন ছিল নিষ্পাপ। তাদের জানতে ইচ্ছা হলো কিভাবে এই জগৎ এবং স্বর্গলোকের উৎপত্তি হয়। কখন, কার দ্বারা এবং কি কারণে সৃষ্ট হয় এই স্বর্গ-মর্ত্য? এই ইডেনের ভিতরে বা বাইরে কিভাবে সব জিনিস সৃষ্ট হয়? ইডেনের ভিতরে যে সব ঝর্ণা আছে তার কলতান শোনার সঙ্গে সঙ্গে কেন পিপাসা বেড়ে যায়?
স্বর্গীয় অতিথি রাফায়েলের কাছ থেকে আরও কিছু জানার জন্য আদম বলে যেতে লাগল, এই জগতের বাইরের অনেক বিষয়ের রহস্য উদঘাটন করে তুমি ঈশ্বরের নির্দেশে আমাদের অনেক বিষয়ে যথাসময়ে পূর্ব হতে সতর্ক করে দিয়েছ যা মানুষ কখনো তার সীমিত জ্ঞানের দ্বারা জানতে পারে না এবং তা জেনে আমরা ভুল করে বসলে সমূহ ক্ষতির সম্মুখীন হতাম আমরা। এজন্য পরম মঙ্গলময়ের কাছে আমরা চিরকৃতজ্ঞ এবং তাকে অশেষ ধন্যবাদ। আমরা পরম নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর উপদেশাবলী মেনে চলব এবং তার ইচ্ছা পূরণ করে চলব।
যেহেতু তুমি পার্থিব জ্ঞানের অতীত পরম জ্ঞানের বিষয় আমাদের শিক্ষার জন্য অনেক বলেছ সেইহেতু আমি আরও কিছু জানতে চাই এবং তা আমাদের জানা উচিত বলে মনে করি। তুমি না বললে এসব আরও কোনদিন জানা সম্ভব হবে না আমাদের পক্ষে।
এখন দয়া করে বল, আমাদের ঊর্ধ্বে দূরে যে স্বর্গলোক দেখতে পাচ্ছি, যার চারপাশে অসংখ্য জ্যোতিষ্কমণ্ডলী মহাশূন্যে শৃংখলাবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং যার ভতরে ও বাইরে সর্বত্র বায়ু প্রবাহিত হয়ে চলেছে, পরমস্রষ্টা কি কারণে তাঁর পবিত্র বিশ্রাম ব্যাহত করে তা সৃষ্টি করেন? অনন্ত বিশৃংখলা আর শূন্যতার মাঝে কিভাবে শুরু হয় তার সৃষ্টিকার্য এবং কত শীঘ্রই বা তা শেষ হয়? ঈশ্বরের এইসব অনন্ত সৃষ্টিকার্যের রহস্যময় বিষয়গুলি আমাদের জানালে আমরা তার মহিমা কীর্তন করতে পারি। তাতে তাঁর গৌরব আরো বাড়বে ছাড়া কমবে না। এখনো দিনের আলো শেষ হয়নি, শেষ হয়নি সূর্যের আকাশ পরিক্রমা। সূর্য যেন তোমার মুখ থেকে তার বংশধারার উৎপত্তির কথা শুনতে চায়, শুনতে চায় কি করে এই বিশ্বপ্রকৃতি শূন্যতার অনন্ত গর্ভ হতে সৃষ্ট হয়। এরপর সন্ধ্যাতারা আর চন্দ্রও হয়ত তোমার কথা শুনতে আসবে। তারপর বিশুদ্ধতা ও নিদ্রাসহ রাত্রি এসেও তোমার কথা শুনতে চাইবে। অবশেষে রাত্রি প্রভাত হলে তুমি চলে যাবে।
আদমের কথা শেষ হলে দেবদূতপ্রধান রাফায়েল শান্তকণ্ঠে বলতে লাগল, তুমি সাবধানে অনুরোধ করলেও সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের অনন্ত সৃষ্টিকার্যের সব কথা ভাষায় ব্যক্ত করা কোন দেবদূতের পক্ষে সম্ভব নয়, কোন মানুষের পক্ষে তা বোঝাও সম্ভব নয়। তথাপি স্রষ্টার গৌরববৃদ্ধি করার মানসে এবং তোমাকে সুখী করার জন্য তোমাকে আমি তা শোনাব। কারণ একটি বিশেষ সীমার মধ্যে থেকে তোমার জ্ঞানপিপাসাকে নিবৃত্ত করার জন্য ঈশ্বর আমাকে পাঠিয়েছেন। তাঁর বাইরে আর কিছু জানতে চেও না এবং নিজের কোন চেষ্টার দ্বারাও তা জানতে যেও না। অদৃশ্য সর্বজ্ঞ ঈশ্বর তার আপন আত্মার গুহান্ধকারেই তা নিহিত রেখেছেন। স্বর্গ বা মর্ত্যের কারোরই সে বিষয় জ্ঞাতব্য নয়। সেই পরম গুহ্য বিষয় ছাড়া আর সব কিছুই জানতে পার। জ্ঞান হচ্ছে একরকম খাদ্যের মত। খাদ্যের মত জ্ঞানও হবে পরিমিত। অপরিমিত ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে খাদ্য গ্রহণ করলে যেমন দেহের ক্ষতি হয় তেমনি অনিয়মিত জ্ঞানও নির্বুদ্ধিতায় পরিণত হয়।
