সেই অতলান্তিক অন্ধকার শূন্য গহ্বরের পানে একবার তাকিয়েই ভয়ে কিছুটা পিছিয়ে এল বিদ্রোহীরা। কিন্তু পিছিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই আবার অজস্র বজ্রসহ তাড়া করলেন ঈশ্বরপুত্র। তারা তখন দেখল পতনের থেকে সেই বজ্রাগ্নির জ্বালা আরও ভয়াবহ। তাই আর তিলমাত্র অপেক্ষা না করে শেষ সীমানা থেকে অন্ধকার শূন্য গহুরে ঝাঁপ দিল বিদ্রোহীরা।
তখন ঈশ্বরপুত্র তাদের অনুসরণ না করলেও ঈশ্বরের রোষাগ্নির জ্বালা অনুভব করতে লাগল নরকপ্রদেশ পর্যন্ত। অধঃপতিত বিদ্রোহী নাস্তিকদের কাতর আর্তনাদে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে লাগল সমগ্র নরকপ্রদেশ। তারা বুঝতে পারল স্বর্গবাসীদের একটি দলই স্বর্গলোক ধ্বংস করে দেবার উপক্রম করেছিল। পরে যুদ্ধে পরাভূত হয়ে ঈশ্বরের বিধানে এই নরকের গভীরে শাস্তিভোগ করতে এসেছে। পুরো নয়দিন ধরে বিদ্রোহীদের পতন চলতে লাগল। প্রচুর গোলমাল ও চেঁচামেচি চলতে লাগল। নরকগহুর মুখ বিস্তার করে পাপাত্মা বিদ্রোহীদের গ্রাস করল সকলকে। তারপর সমস্ত বিদ্রোহী নরকপ্রদেশে প্রবেশ করলে নরকের মুখ বন্ধ হয়ে গেল। নরকদ্বার রুদ্ধ হলো। অনির্বাণ অগ্নিদ্বারা প্রজ্জ্বলিত, অন্তহীন দুঃখ ও যন্ত্রণার আধার নরকপ্রদেশই তাদের উপযুক্ত বাসস্থান।
এদিকে স্বর্গলোক বিদ্রোহীদের কবল হতে মুক্ত হয়ে আনন্দোৎসব করতে লাগল। যুদ্ধের জন্য স্বর্গলোকের যে সব জায়গা ভেঙেচুরে গিয়েছিল, সে সব জায়গা শীঘ্রই মেরামত হয়ে গেল। তার শত্রুদের স্বর্গের সীমানা থেকে সম্পূর্ণরূপে বিতাড়িত করে একমাত্র বিজয়ী হয়ে তার বিজয়রথ যুদ্ধক্ষেত্র হতে ঘুরিয়ে রাজধানীর অভিমুখে চালিত করতে লাগলেন ঈশ্বরপুত্র।
সর্বদশী সর্বশক্তিমান ঈশ্বর কিন্তু এতক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে দুর থেকে সব কিছুই প্রত্যক্ষ করছিলেন। অনুগত দেবদূতসেনারা যখন তালপাতা মাথায় দিয়ে ঈশ্বরের যোগ্যতম বিজয়ী বীরপুত্রের জয়গান গাইতে গাইতে আসছিল তখন তা দেখতে পেয়ে ঈশ্বর এগিয়ে গেলেন কিছুটা তাদের অভ্যর্থনা জানাবার জন্য।
স্বর্গলোকে স্থাপিত যে সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলেন ঈশ্বরপুত্র মেসিয়া সেদিকে এগিয়ে আসতে লাগলেন। ঈশ্বরও সাদরে বরণ করেছিলেন তাদের।
আমি তোমার অনুরোধে স্বর্গলোকে যা যা ঘটে গেছে তার বিষয় বলেছি যাতে তুমি অতীতের ঘটনাবলীর সম্বন্ধে সচেতন হয়ে শিক্ষা পেতে পার। কোন মানুষের পক্ষে যা জানা সম্ভব নয় তোমার কাছে তা ব্যক্ত করছি। স্বর্গে ঈশ্বরের সঙ্গে যে বিরোধ বাধে এবং যে যুদ্ধ হয় আর সেই যুদ্ধের ফলে উচ্চাভিলাষী দেবদূতদের পতন ঘটে তার কথা সব বলেছি তোমায়। যে শয়তান বিদ্রোহী দেবদূতদের নেতৃত্বদান করে ঈশ্বর ও ঈশ্বরপুত্রের বিরুদ্ধে সেই শয়তান তোমার সুখী অবস্থার প্রতি ঈর্ষান্বিত। সে এখন তুমি যাতে ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্য ও ভক্তি হতে বিচ্যুত হয়ে স্বর্গসুখ হতে বঞ্চিত হও এবং তার মত নরকে গিয়ে শাস্তিভোগ করতে থাক অনন্তকাল ধরে তার জন্য সে চক্রান্ত করছে। প্ররোচিত করবে সে তোমাকে ঈশ্বরের বিরোধিতা করতে। সেটা করাই হবে তার সান্ত্বনা ও ঈশ্বরের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ। সে তোমাদের তাদের দুঃখ ও যন্ত্রণার অংশভাগী করে খুশি হতে চায় কিন্তু তার প্রলোভনে যেন তুমি সাড়া দিও না কখনো। তোমার দুর্বলতর সাথীকে এ বিষয়ে সাবধান করে দিও। শয়তান তার অবাধ্যতা ও ঈশ্বরদ্রোহিতার প্রতিফলস্বরূপ যে শাস্তি পায় তার ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত দেখে তুমি সাবধান হতে পার। মনে রাখবে যে যত শক্তিমানই হোক পতনকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি সে। সুতরাং ঐশ্বরিক বিধান লঙ্ঘনের প্রতিফলের প্রতি সচেতন থাকবে।
০৬ষ্ঠ সর্গ
ষষ্ঠ সর্গ
হে ইউরানিয়া, আমি অলিম্পাস পর্বতের ঊর্ধ্বলোকে বিরাজিত যে স্বর্গলোকে কাব্য ও সঙ্গীতের অধিষ্ঠাত্রী দেবীদের অনুগৃহীত অশ্ব পেগাসের পাখায় ভর করে উড়ে যেতে চাই সেই স্বর্গলোক হতে তোমার অলৌকিক কণ্ঠনিঃসৃত সুরধারা সহ নেমে এস। তুমি স্বর্গজাত, শিল্পকলার অধিষ্ঠাত্রী নয়জন দেবীর সঙ্গে সুপ্রাচীন অলিম্পাস পর্বতের উপর বাস করো।
তুমি সেই পর্বতে ঝর্ণার ধারে তোমর কোন জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর সঙ্গে কথা বল। তুমি একবার তোমার বোনের সঙ্গে পরম পিতাকে অলৌকিক সঙ্গীত শুনিয়ে তাঁকে প্রীত করেছিলে।
আমি ভেবেছিলাম আমার মত একজন মর্ত্যলোকের অতিথিকে আকাশমণ্ডলের মধ্যে দিয়ে পথ দেখিয়ে স্বর্গলোকে নিয়ে যাবে এবং আবার নিরাপদে আমাকে আমার এই মর্ত্যলোকের আবাসভূমিতে পৌঁছিয়ে দিয়ে যাবে। তা না হলে শিমেরাকে হত্যা করে বেলারোফোন যেমন পক্ষীরাজ ঘোড়ায় করে স্বর্গে যেতে গিয়ে দেবরাজ জিয়াসের কোপে লাইসিয়ায় এ্যানিয়ার সমতলভূমিতে পতিত হয়েছিল, আমারও হয়ত তেমনি অবস্থা হবে। সুতরাং স্বর্গলোকে একাকী যাওয়া বা সেখানে ঘুরে বেড়ানো আমার পক্ষে বিপজ্জনক।
আমার সব গান গাওয়া এখনো হয়নি। অর্ধেক বাকি আছে।
আমি একজন মরণশীল মানুষ, এই মর্ত্যভূমির সীমার ঊর্ধ্বে উঠতে পারি না। আমি এই মর্ত্যভূমির উপর নিরাপদে দাঁড়িয়ে আপন মনে আপন কণ্ঠে গান করি কিন্তু সে গানের সুর ঠিক হয় না। দুঃখকষ্ট দুঃসময়ের অন্ধকারে নিষ্ফল হয়ে বিপদের আশঙ্কার দ্বারা পরিবৃত হয়ে আমি একাকী গান করি। কিন্তু তুমি যখন রাত্রিতে আমার ঘুমের মধ্যে আবির্ভূত হও, তখন আর আমি একা থাকি না।
