দূর হতে অসংখ্য রথ সেনাসমভিব্যাহারে স্বচ্ছ আকাশপথে উজ্জ্বলভাবে আসতে দেখে মাইকেল যুদ্ধ বন্ধ করে পাহাড়ের পাথরগুলিকে সাজিয়ে রাখতে লাগল যথাস্থানে। ঈশ্বরপুত্রের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়টি আবার পুষ্পিত গাছপালায় শোভিত হয়ে উঠল।
হতভাগ্য শত্রুরা তাঁকে দেখেও স্থির অনমনীয় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারা কিছু না জেনেই হতাশা থেকে কোনরকমে আশা আহরণ করে তাদের সমস্ত শক্তিকে যুদ্ধের জন্য সংহত করল। কোন স্বর্গীয় আত্মার মধ্যে কখনো এই ধরনের বিকৃত প্রবৃত্তি থাকতে পারে না। কিন্তু যারা অহঙ্কারী, উদ্ধত ও ঈশ্বরদ্রোহী তারা স্বর্গবাসী হলেও কখনো কোন লক্ষণ থেকে কিছু শিক্ষা পায় না। কোন অলৌকিক আশ্চর্যজনক ঘটনা দেখেও তাদের অনমনীয় আত্মা নত হয় না।
ঈশ্বরপুত্রের অলৌকিক শক্তি ও ঐশ্বর্য দেখেও তারা পরিশুদ্ধ ও নত হওয়ার পরিবর্তে কঠোর হয়ে উঠল আরও। তাঁর সমুন্নত অবস্থা ও ঐশ্বর্য দেখে তাদের মধ্যে ঈর্ষা জাগল, প্রবল হয়ে উঠল তাদের অসঙ্গত উচ্চাভিলাষ। তারা আরও ভয়ঙ্করভাবে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠল। তারা স্থির করল মনে মনে হয় তারা তাদের শক্তি বা প্রতারণার দ্বারা ঈশ্বর ও তার পুত্রের উপর নিজেদের প্রভুত্বকে প্রতিষ্ঠিত করবে, হয় তারা জয়লাভ করবে আমরা শোচনীয় পতন বা সর্বনাশকে বরণ করে নেব। এইভেবে তারা শেষ যুদ্ধের জন্য সমবেত হলো।
ঈশ্বরপুত্র তখন তার দুদিকে সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান সেনাদলকে সম্বোধন করে বললেন, হে সশস্ত্র দেবদূতগণ ও সাধু আত্মাগণ, এখন সারিবদ্ধ ও সুশৃঙ্খলভাবে দাঁড়াও। আজ যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত থাক। তোমরা আজ ঈশ্বরের ন্যায়সঙ্গত উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য যুদ্ধ করতে এসেছ। তোমাদের এই কাজ ঈশ্বরের দ্বারা সমর্থিত। তোমরা তাই অজেয় এ যুদ্ধে। কিন্তু অন্যদিকে এ সব অভিশপ্ত বিদ্রোহী সেনাদের চরম শাস্তি পেতেই হবে। তোমাদের সংখ্যা বা শক্তির পরিমাণ যাই হোক, তোমরা শুধু দেখ ঈশ্বরের রোষাগ্নি ঈশ্বরদ্রোহী নাস্তিকদের উপর আমার মধ্য দিয়ে কিভাবে ঝরে পড়ে। ওরা তোমাদের অবজ্ঞা বা তুচ্ছজ্ঞান করেনি, করেছে আমাকে। তারা আমার প্রতি ঈর্ষান্বিত ও ক্রুদ্ধ। কারণ ঈশ্বরের যা কিছু রাজক্ষমতা ও গৌরব আছে তা তিনি আমাকেই দান করেছেন। তার ইচ্ছামত প্রভূত সম্মানে ভূষিত করেছেন আমাকে।
তাই তাদের ধ্বংসসাধনের ভার আমারই উপর ন্যস্ত করেছেন পরম পিতা। তারা তাদের ইচ্ছাপূরণের জন্য আমার সঙ্গে যুদ্ধ করবে। আমার ও তাদের মধ্যে এ যুদ্ধে কে বেশি শক্তিশালী–এটাই দেখতে চায় কারণ শুধু শক্তির মাধ্যমেই সকলের সব মহত্ত্বকে যাচাই করতে চায়। অন্যান্য গুণের বিচার করতে চায় না তারা। সুতরাং আমি আমার শক্তিরই পরীক্ষা দিতে চাই তাদের সমক্ষে।
এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে ঈশ্বরপুত্রের মুখমণ্ডল এমন ভীতিপ্রদ হয়ে উঠল যে সেদিকে তাকানোই যায় না। এবার তার রোষকশায়িত কুটি শত্রুদের করলেন তিনি।
সঙ্গে সঙ্গে তার রথের উপর যে চারজন দেবদূত ছিল তারা তাদের নক্ষত্রখচিত পাখাগুলি মেলে ধরল। তার ফলে এক বিরাট ছায়া বিস্তৃত হয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। রথের চাকাগুলি বন্যা বা প্রবল জলোচ্ছাসের গর্জনের মত প্রচণ্ড শব্দ তুলে বিষাদের অন্ধকারে নিমজ্জিত শত্রুদের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। একমাত্র ঈশ্বরপুত্রের সিংহাসন ছাড়া রথের সব কিছুই কাঁপতে লাগল।
ক্রমে শত্রুসেনাদের মাঝখানে গিয়ে উপস্থিত হলো সেই রথ। ঈশ্বরপুত্রের ডান হাতে ছিল দশ হাজার বর্জ। সেগুলি নিক্ষেপ করার জন্য তুলে ধরলেন তিনি। তা দেখে বিস্ময়াভিভূত শত্রুসেনাদের সব প্রতিরোধক্ষমতা লুপ্ত হয়ে গেল। তারা সব সাহস হারিয়ে ফেলল। তাদের মনে হলো তাদের অস্ত্রগুলি সব বিকল হয়ে গেছে। মনে হলো, সে অস্ত্রপ্রয়োগে কোন কাজ হবে না। তারা ভেবেছিল তাদের উপর আগের মত আবার পাহাড় থেকে পাথর নিক্ষেপ করা হবে। কিন্তু পাথরের পরিবর্তে ঝড়ের বেগে অজস্র বজ্রবাণ বর্ষিত হতে লাগল তাদের উপর।
তখন রথের উপর সেই চারজন দেবদূতের চোখ হতে বিদ্যুতাগ্নি বিচ্ছুরিত হতে লাগল অভিশপ্ত সেনাদের উপর। মনে হলো চারজন দেবদূতের চারজোড়া চোখ অজস্র হয়ে উঠেছে সংখ্যায়। ফলে সব শক্তি হারিয়ে একেবারে হতোদ্যম হয়ে পড়ল বিদ্রোহীরা।
তথাপি ঈশ্বরপুত্র মাত্র অর্ধেক শক্তি প্রয়োগ করেছিলেন। এই যুদ্ধে তাঁর সব। শক্তি প্রয়োগ করলে একেবারে ধবংস হয়ে যেত বিদ্রোহী সেনারা। তাই তিনি বজ্রগুলি নিক্ষেপ করলেও মাঝপথে সেগুলিকে থামিয়ে দিলেন। শত্রুদের ধ্বংস করার কোন উদ্দেশ্য ছিল না তার। তাদের স্বর্গ থেকে উৎখাত ও বিতাড়িত করাই ছিল তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য।
বিদ্রোহী সেনারা আর যুদ্ধ করতে না পারলে ঈশ্বরপুত্র বজ্রাহত ম্রিয়মাণ মেষপালের মত তাদের তাড়িয়ে নিয়ে যেতে লাগলেন স্বর্গলোকের সীমান্তবর্তী প্রাচীরের দিকে।
বিদ্রোহীরা সেই প্রাচীরের নিকটে আসার সঙ্গে সঙ্গে সে প্রাচীর আপনা থেকে ভিতরে সরে এসে তার একটা বিস্তৃত অংশ উন্মুক্ত করে পথ করে দিল। কিন্তু সে প্রাচীরের ওপারে কোন পথ ছিল না। স্বর্গের প্রাচীর যেখানে শেষ হয়েছে তার পরেই এক শূন্য গহ্বর শুরু হয়ে অতল নরকপ্রদেশ পর্যন্ত নেমে গেছে।
