তাদের দেহে বর্ষ থাকার জন্য তাদের কষ্ট আরও বেড়ে যেতে লাগল। কারণ পাথরের জোর আঘাতে লোহার বর্মগুলো ভেঙে খানখান হয়ে যাওয়ায় তাদের গাগুলো ছিঁড়ে-খুঁড়ে গেল এবং ক্ষতবিক্ষত হতে লাগল তাদের গাগুলো। যন্ত্রণায় আর্তনাদ করতে লাগল তারা।
যে পাহাড়ের উপর বিদ্রোহী সেনারা দাঁড়িয়ে ছিল সেই পাহাড়টার উপর দিকটা দেবসেনাদের দ্বারা পাথর নিক্ষেপের ফলে ভেঙে যেতে লাগল। বিদ্রোহী সেনারা তখন সে পাহাড় থেকে নেমে এসে শেষ চেষ্টা হিসাবে মরীয়া হয়ে যুদ্ধ করতে লাগল। উভয় পক্ষের চিৎকার-চেঁচামেচিতে তুমুল গোলমাল ধ্বনিত হতে লাগল। সে যুদ্ধে সমগ্র স্বর্গলোক বিকম্পিত হয়ে এক প্রবল ধ্বংসের সম্মুখীন হলো।
এমন সময় সর্বশক্তিমান পরম পিতা তার পবিত্র সিংহাসনে বসে তার অলৌকিক ঐশ্বরিক শক্তিবলে যুদ্ধের অবস্থার কথা সব জানতে পেরে তাঁর অনুগত অনুচরদের সঙ্গে পরামর্শ করতে লাগলেন। তিনি বললেন তার মহান উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য তার পুত্র গিয়ে শত্রুদের উপর চরম প্রতিশোধ নিয়ে তার ঐশ্বরিক শক্তি ও যোগ্যতার পরিচয় দিক। তার সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসাবে তার যোগ্যতাকে প্রমাণিত করুক।
পরম পিতা এবার তাঁর পুত্রকে বললেন, হে আমার প্রিয় পুত্র, আমার গৌরবের উজ্জ্বল প্রতীক মূর্তি আমার অদৃশ্য মুখমণ্ডল তোমার মুখের মধ্যেই হয়ে ওঠে পরিদৃশ্যমান। আমার পরেই তুমি দ্বিতীয় সর্বশক্তিমান। দুই দিন গত হয়ে গেল আমাদের হিসাবে। মাইকেল তার সেনাদলসহ অবাধ্য বিদ্রোহীদের দমন করতে গেছে। তারা ঘোরতর যুদ্ধে প্রবৃত্ত। তুমি জান ব্যাপারটা আমি তাদের উপরেই ছেড়ে দিয়েছিলাম। সৃষ্টির দিক থেকে সমস্ত দেবদূতই সমান, তারা সকলেই সমান শক্তিমান। শুধু পাপপ্রবৃত্তির ফলে শক্তিতে কিছুটা হীন হয়ে পড়ে বিদ্রোহী দেবদূতেরা। তবু তাদের জৈব দেহাবয়ব ধ্বংস হবে না কিছুতেই। যত যুদ্ধই হোক, শেষ পর্যন্ত জীবিত থাকবে তারা। সুতরাং কোন সমাধানই হবে না, নিষ্পত্তি হবে না এ যুদ্ধ ও বিরোধের।
একদিকে পাহাড়ের পাথর আর একদিকে আগ্নেয়াস্ত্র–এইভাবে দুপক্ষে যুদ্ধ চলছে। কিন্তু স্বর্গলোকে এই ধরনের বিধ্বংসী যুদ্ধ চলতে দেওয়া উচিত নয়। দু দিন তখন হয়ে গেছে। এখন তৃতীয় দিনে তুমি গিয়ে যুদ্ধের অবসান ঘটাবে। এটাই আমার বিধান। এ কাজ একমাত্র তোমার দ্বারাই সম্ভব। তোমার মধ্যে আমি এমন সব আলোকসামান্য গুণের গরিমা ও অতুলনীয় শক্তির মহিমা প্রভূত পরিমাণে সঞ্চারিত করেছি যাতে স্বর্গ ও নরকের সকলে সে গুণ ও শক্তির পরিচয় পেয়ে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। এই অন্যায় বিদ্রোহ দমন করে স্বর্গরাজ্যের একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসাবে তোমার যোগ্যতাকে একান্তভাবে সপ্রমাণিত করবে তুমি।
সুতরাং পিতার শক্তিতে সর্বশক্তিমান হয়ে রথে চড়ে এখনি চলে যাও। আমার সৈন্যসামন্ত এবং ধনুর্বাণ ও বজ্র এই অমোঘ অস্ত্রটি নিয়ে যাও। তোমার কটিদেশে থাকবে তরবারি। দ্রুতগতিতে রথ চালনা করবে। সেই সব অপরিণামদশী বিদ্রোহীদের স্বর্গলোকের ত্রিসীমানা থেকে বিতাড়িত করে নরকের গভীর অন্ধকারে নিক্ষেপ করবে। সেখানে গিয়ে তারা বুঝতে পারবে ঈশ্বর ও তার পুত্রকে অবজ্ঞা করার পরিণাম কী ভীষণ।
ঈশ্বর এই কথাগুলি বললে তাঁর পুত্রের মুখমণ্ডলে এক স্থির জ্যোতি ফুটে উঠল। তিনি পরমপিতার কথাগুলি হৃদয়ঙ্গম করলেন যথাযথভাবে। তারপর পিতার প্রতি ভক্তিনম্র চিত্তে বললেন, হে স্বর্গাধিপতি, পরমপিতা, তুমি সর্বোচ্চ, সর্বোত্তম ও পবিত্রতম। তুমি সকল সময় তোমার পুত্রকে গৌরবান্বিত করতে চাও। আমিও স্বাভাবিক ও ন্যায়সঙ্গতভাবে তোমাকে গৌরবান্বিত করতে চাই। তোমার গৌরবেই আমার গৌরব, তোমার আনন্দেই আমার আনন্দ। তোমার ইচ্ছাপূরণ করাতেই আমার পরম সুখ। তুমি যে রাজদণ্ড, রাজক্ষমতা ও দায়িত্বভার অর্পণ করেছ আমাকে আমি তা সানন্দে বহন করে যাব। তুমি কিন্তু শেষ পর্যন্ত সর্বেসর্বা রয়ে যাবে। তুমি সর্বশক্তিমানই থাকবে এবং তোমার শক্তিতেই আমি হব শক্তিমান। তুমি যাদের ভালবাস তারা হবে আমার আশ্রিত। তুমি যাদের ঘৃণা করো আমিও তাদের ঘৃণা করব। তোমার করুণাময় মূর্তির মত তোমার ভীতিপ্রদ মূর্তিটিও মূর্ত আমার মধ্যে। সকল বিষয়েই আমি তোমার প্রতিরূপ। আমি তোমার শক্তিতে শক্তিমান হয়ে স্বর্গলোককে মুক্ত করব বিদ্রোহীদের কবল থেকে। তাদের কু-উদ্দেশ্যে নির্মিত দুর্গ হতে বিতাড়িত করে কীটকণ্টকিত নরকের অন্ধকারে নিক্ষেপ করব। এইভাবে অন্যায়কারী ঈশ্বরদ্রোহীদের শাস্তি দেব। বুঝিয়ে দেব তোমার প্রতি অকুণ্ঠ আনুগত্যেই আছে পরম সুখ। তারপর তোমার ভক্তবৃন্দের সঙ্গে সুর মিলিত করে স্তোত্রগান করব।
এই বলে তার আসন হতে রাজদণ্ড হাতে উঠে পড়ল ঈশ্বরপুত্র। তখন স্বর্গলোকে ছড়িয়ে পড়ল তৃতীয় দিনের পবিত্র প্রভাতের আলো। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো অভিযান। পরম পিতার রথটি উজ্জ্বল আলোক বিকীর্ণ করতে করতে আপন বেগে এগিয়ে চলতে লাগল। সে রথে কোন অশ্ব যযাজিত ছিল না। স্বয়ংচালিত সেই রথে ঈশ্বরপুত্র ছাড়া ছিল চারজন চেরাবজাতীয় দেবদূত। তাদের মাথার উপর নীল শূন্যে নীলকান্তমণিখচিত সিংহাসনের উপর ঈশ্বরপুত্র আরূঢ় ছিলেন। তাঁর একপাশে ছিল ঈশ্বরের মত পাখাবিশিষ্ট বিজয়মূর্তি। তার একপাশে ছিল একটি বড় ধনুক আর একটি তুণের মধ্যে দ্বিমুখী বজ্র। তার চারপাশে ধূমায়িত অগ্নিশিখা হতে অসংখ্য ফুলিঙ্গ নির্গত হচ্ছিল। তিনি হাজার হাজার সাধুপ্রকৃতির দেবদূতদের দ্বারা পরিবৃত ছিলেন। তার পশ্চাতে ছিল অসংখ্য রথ।
