এই বলে সেই মন্ত্রণাসভায় বসে পড়ল শয়তানরাজ। তখন নিসরুক নামে এক প্রধান নেতা উঠে দাঁড়াল। তাকে খুবই রণক্লান্ত দেখাচ্ছিল। তার আহত ও ক্ষতবিক্ষত বাহুদুটির জন্য প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পালিয়ে আসে সে। তার চেহারাটাকে স্নান দেখাচ্ছিল মেঘাচ্ছন্ন সূর্যের মত।
নিসরক বলতে লাগল, হে আমাদের পরিত্রাতা, আমাদের স্বাধীনতা ও স্বাধিকারের প্রবক্তা, এমন কি দেবতারা যে স্বাধীনতা, যে অধিকার ভোগ করতে পারে না আমরা যাতে সেই স্বাধীনতা ও অধিকার ভোগ করতে পারি তারই জন্য সংগ্রাম করছ তুমি। কিন্তু এই সংগ্রামে আমরা কি বুঝেছি? আমরা বুঝেছি ঈশ্বরের অনুগত দেবসেনাদের সমকক্ষ নই আমরা। অস্ত্রশস্ত্রের দিক থেকে অসম দুই পক্ষে কি যুদ্ধ সম্ভব? আমরা যারা আঘাত ও ব্যথা-বেদনার অধীন তারা কি যারা ব্যথা-বেদনার অতীত তাদের সঙ্গে মর্যাদাসহকারে যুদ্ধ করতে পারে? এর ফল অশুভ হতে বাধ্য আমাদের। এতে শুধু আমাদের আসন্ন সর্বনাশেরই সম্ভাবনা বিদ্যমান। যে ব্যথা যে বেদনা সকলকে প্রতিপক্ষের বশীভূত করে তোলে, শুধু পরাজয় আর পলায়নী মনোবৃত্তির জন্ম দেয় সেই ব্যথা-বেদনার অধীন হয়ে শুধু সাহস আর অতুলনীয় শক্তি নিয়ে কি করব আমরা? তার কি মূল্য আছে আমাদের কাছে? এতে শুধু সর্বশক্তিমানের হাতই শক্ত হবে। অবশ্য আমরা জীবনের সব আনন্দ হারিয়ে অনুতাপ বা অনুশোচনাহীন এক কৃত্রিম সন্তোষের মধ্যে মনপ্রাণকে কেন্দ্রীভূত করে শান্ত থাকতে পারি। কিন্তু যন্ত্রণার মত জীবনে দুঃখ আর নেই, এই যন্ত্রণা বেদনাই জীবনে সবচেয়ে অশুভ ও অবাঞ্ছিত ঘটনা। এই যন্ত্রণা যখন আতিশয্যে অসহনীয় হয়ে ওঠে তখন তা সকল ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার বিচ্যুতি ঘটায়।
সুতরাং এখন কেউ যদি আমরা কিভাবে অধিকতর শক্তি সঞ্চয় করে ও উপযুক্ত অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহের দ্বারা শত্রুদের সমতুল প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করতে পারি এবং তার ফলে অপযুদস্ত শত্রুদের পযুদস্ত করতে পারি তার উপায় নির্ধারণ করতে পারেন তাহলে তিনিই হবেন আমাদের আকাঙিক্ষত মুক্তির মৃত প্রতীক।
একথা শুনে শয়তানরাজ তার স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলল, তুমি ঠিকই বলেছ। সে উপায় তো অনির্ধারিত বা অনাবিষ্কৃত নেই। বৃক্ষলতা, ফুল, ফল, মণিমুক্তা, স্বর্ণ প্রভৃতির দ্বারা পরিশোভিত আমাদের এই বাসভূমি স্বর্গলোকের উজ্জ্বল উপরিপৃষ্ঠটি আমাদের মধ্যে যারা দেখেছে তারা কিন্তু ভাবতে পারেনি, এই উপরিপৃষ্ঠের অন্তরালে এই ভূখণ্ডের গভীর অন্ধকার গর্ভে কত অজানিত অপরিজ্ঞাত সম্পদ লুকিয়ে আছে।
উপযুক্ত আলোকপাতের দ্বারা সেই সব সম্পদ আহরণ করে অগ্নির দ্বারা পরিশোধিত করে আমাদের কার্যসিদ্ধি করব। সেই সব সম্পদ থেকে অগ্নিগর্ভ বজ্রের মত এমন এক ভয়ঙ্কর ক্ষতিকারক অস্ত্র নির্মাণ করে তা শত্রুদের প্রতি নিক্ষেপ করব যা আমাদের সকল প্রতিপক্ষের অগ্রপ্রসারী ও আক্রমণোদ্যত শক্তিকে ছিন্নভিন্ন করে দেবে। তখন তারা বুঝতে পারবে তাদের বস্ত্রধারীর বজ্রকেও হার মানিয়েছি আমরা। এর জন্য দীর্ঘায়িত শ্রমের প্রয়োজন হবে না। রাত্রি প্রভাত হবার আগেই ফলবতী হয়ে উঠবে আমাদের অভিলাষ। সুতরাং ভয় ত্যাগ করে নূতন প্রাণশক্তিতে সঞ্জীবিত হয়ে ওঠ। এ কাজ মোটেই কঠিন বলে মনে করো না। হতাশার কিছু নেই।
শয়তানের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে তার সেনাদলের নিরানন্দ মন আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল আবার। উদ্দীপিত হয়ে উঠল তাদের সকল আশা। সাফল্যের মূলমন্ত্রস্বরূপ সেই উপায় উদ্ভাবনের প্রশংসা করতে লাগল সকলে। তাদের দলের অনেকে ভাবল এ উপায় যখন পাওয়া গেছে তখন তা খুব সহজ এবং তাদের যে কেউ তা আবিষ্কার করতে পারে। আবার অনেকে ভাবল তা যখন এখনো কার্যকরী হয়নি তখন তা অসম্ভব।
হে মানবজাতি, ভবিষ্যতে হয়ত হিংসার বশবর্তী হয়ে আবার কোন শয়তানী বুদ্ধি ও কৌশলের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে মানবসন্তানদের ধ্বংস করার জন্য অনুরূপ এক অস্ত্র আবিষ্কার করবে। পাপযুদ্ধে পরস্পর পরস্পরকে বধ করবে।
শয়তানের কথামত সেই বিদ্রোহী সেনাদল মন্ত্রণাসভা ত্যাগ করে কর্মে প্রবৃত্ত হলো। কেউ কোন কথা বলল না, কেউ দাঁড়িয়ে রইল না আলস্যভরে। অসংখ্য হস্ত এগিয়ে এল কর্মে যোগদান করার জন্য। মুহূর্তমধ্যে তারা স্বর্গলোকের উপরিপৃষ্ঠের মাটি সরিয়ে তার গর্ভে দেখল প্রকৃতির মূল উপাদানের সঙ্গে সালফার ও নাইট্রোজেন দুটি ধাতু রয়েছে। তারা কৌশলে সেই দুটি ধাতু মিলিয়ে কাজে লাগাবার মত একরকম বস্তু তৈরি করে সেগুলি সঞ্চয় করে রাখল। তারপর আরও মাটি খুঁড়ে পৃথিবীর ভূগর্ভনিহিত ধাতব পদার্থের মত দাহিকাশক্তিসম্পন্ন এক পদার্থ দেখতে পেল। সামান্য অগ্নিসংযোগেই তা ভয়ঙ্কর ক্ষেপণাস্ত্রের রূপ ধারণ করবে। এইভাবে রাত্রি শেষ হবার আগেই গোপনে সকলের অলক্ষ্যে অগোচরে সর্ব কার্য সাধন করল।
তারপর পূর্বদিকের আকাশে প্রভাতের আলো দেখা দিলে বিজেতা দেবদূতেরা উঠে পড়ে অস্ত্র ধারণ করল। রণসজ্জায় সাজতে লাগল। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে দলবদ্ধভাবে দাঁড়াল তারা। তাদের মধ্যে একটি দল প্রভাতকিরণমণ্ডিত পর্বতশীর্ষ হতে চারদিকে তাকিয়ে শত্রুদের খোঁজ করতে লাগল। শত্রুরা পালিয়ে গেছে না দূরে কোথায় আছে, তারা সচল না অচল অবস্থায় আছে তা লক্ষ্য করতে লাগল।
