তবে কিছুক্ষণের মধ্যে আবার সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে উঠল শয়তান। স্বর্গের দেবদূতদের দেহে কখনো কোন আঘাত মরণশীল মানুষের দেরে মত মারাত্মক হয়ে ওঠে না। তারা ইচ্ছামত যে কোন দেহ ধারণ করতে পারে।
সেই রণক্ষেত্রের অন্য দিকে মাইকেলের মত গ্যাব্রিয়েলও তার অনুরূপ সামরিক শক্তির পরিচয় দিচ্ছিল। গ্যাব্রিয়েল তখন মলোক নামে এক বিদ্রোহী সেনাপতির দ্বারা সাজানো ব্যুহ ভেদকরেরথের দিকে অপ্রতিরোধ্য বেগে ধাবিত হলো। গ্যাব্রিয়েলের কোন কথাতেই সংযত হলো না মলোক। উপরন্তু সে এই বলে আস্ফালন করতে লাগল যে সে গ্যাব্রিয়েলকে তার রথের চাকায় বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে যাবে। অথচ কিছুক্ষণের মধ্যেই গ্যাব্রিয়েলের অব্যর্থ আঘাতে তার পৃষ্ঠদেশে আঘাত পেয়ে যন্ত্রণায় হাঁপাতে হাঁপাতে পালিয়ে গেল নাস্তিক মলোক।
এদিকে ইউরিয়েল ও রাফায়েল, আামেকে ও আসমাদাই নামে দুই শত্রুকে পরাজিত করে তাদের পাখায় তাদের বেঁধে নিয়ে উড়ে যেতে লাগল। এ্যাবদিয়েলও বলছিল সেও এরিয়েল, এরিওক, ব্যামিয়েল প্রভৃতি নাস্তিক ঈশ্বরদ্রোহী শত্রুদের পরাভূত করেছে শোচনীয়ভাবে। তাদের সকল গর্ব খর্ব করল। সেই বিস্ময়কর যুদ্ধে বিদ্রোহী দেবতসেনারাও কম শক্তি ও সাহসের পরিচয় দেয়নি। শক্তি, বীরত্ব ও রণকৌশলে তারাও কম চমকপ্রদ ছিল না। কিন্তু তাদের শক্তি ধর্ম এবং ন্যায় ও নীতি হতে ভ্রষ্ট ছিল বলে তাদের সকল বীরত্ব ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় এবং তার ফলে কোন খ্যাতি বা গৌরব লাভ করতে না পেরে নরকে নির্বাসিত হয় তারা। তলিয়ে যায় বিস্মৃতির চির অন্ধকারে।
বিদ্রোহী সেনাদলের শক্তিমান ও পরাক্রমশালী সেনাপতিরা একে একে পরাজিত ও আহত হওয়ায় যুদ্ধের গতি ফিরে গেল। ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল তাদের সেনারা। ভগ্ন রথ ও অস্ত্রশস্ত্র ছড়িয়ে রইল সারা রণক্ষেত্র জুড়ে।
প্রতিরক্ষার আর কোন শক্তি রইল না শয়তানের সেনাদলের। ভয়ে, বিস্ময়ে, লজ্জায় ও বেদনায় বিমূঢ় হয়ে এক হীন পরাজয়ের গ্লানি মাথায় নিয়ে পালাতে লাগল তারা। এই পরাজয় ও বেদনাবোধের অভিজ্ঞতা জীবনে আজ প্রথম তাদের।
পাপ আর অবাধ্যতা তাদের জীবনে যে দুঃখ যে অভিশাপ নিয়ে এল সে দুঃখ বা অভিশাপ আগে ছিল না তাদের জীবনে। তারা সকলেই ছিল সাধু প্রকৃতির দেবদূত, সব দিক দিয়ে উন্নত, সকল শত্রুর কাছে অপরাজেয় অপ্রবৃষ্য। এই ঈশ্বরদ্রোহিতার আগে তারা কোন পাপ করেনি, কোন অবাধ্যতা ছিল না তাদের মধ্যে। ফলে যুদ্ধে তারা ছিল অক্লান্ত, কোন আঘাতের বেদনা সহ্য করতে হত না তাদের।
তারপর রাত্রি নেমে এল। অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে উঠল স্বর্গলোক ও সমগ্র আকাশমণ্ডল। স্তব্ধ হয়ে গেল যুদ্ধের সকল ধ্বনি। রাত্রির নিবিড় অন্ধকারে আশ্রয় গ্রহণ করল বিজেতা আর বিজিতের দল।
যুদ্ধশেষের সেই রণপ্রান্তরে মাইকেল তার দেবদূত-সেনাদের নিয়ে বিজয়ানন্দে শিবিরমধ্যে বিশ্রাম করতে লাগল। জ্বলন্ত মশাল হাতে প্রহরীরা পাহারা দিতে লাগল।
অন্যদিকে শয়তান তার বিদ্রোহী সেনাদের নিয়ে দূরে নিরাশ্রয় অবস্থায় অদৃশ্য হয়ে গেল অন্ধকারের মধ্যে। তারপর তার দলের প্রধানদের নিয়ে মন্ত্রণাসভায় বসল।
সে নির্ভীকভাবে বলতে লাগল, হে আমার প্রিয় সহচরগণ, তোমরা আজ যুদ্ধে তোমাদের যে বিক্রম ও সামরিক শক্তির পরিচয় দিয়েছ তা নির্জিত হয়নি এখনো শত্রুদের দ্বারা। তোমাদের এই শক্তি আজ এই কথাই প্রমাণ করে যে তোমরা শুধু স্বাধীনতার যোগ্য নও, সেই সঙ্গে সম্মান, রাজত্ব, গৌরব ও খ্যাতিরও অধিকারী। একদিনের যুদ্ধে যে শক্তির পরিচয় দান করেছ তোমরা, অনন্তকাল ধরে সে শক্তিতে সমৃদ্ধ কেন থাকবে না তোমরা? স্বর্গাধিপরি কি এমন সার্বভৌম ক্ষমতা আছে। যে তিনি তাঁর ইচ্ছার কাছে আমাদের মাথা নত করানোর জন্য আমাদের বিরুদ্ধে সেনাদল পাঠিয়ে তাঁর রাজক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন? সে শক্তির প্রমাণ কি, পরিচয় কি দিয়েছেন তিনি? সে শক্তি তো এখনো প্রমাণিত হয়নি নিঃসংশয়িরূপে।
এখনো পর্যন্ত তিনি সর্বশক্তিমান হিসাবে পরিগণিত হলেও ভবিষ্যতে তাঁর পতন ঘটবেই। একথা সত্য যে, আমাদের অস্ত্রশস্ত্র অপ্রচুর আর অপ্রতুল থাকার জন্য যুদ্ধে কিছু অসুবিধায় পড়তে হয়েছে আমাদের এবং তার জন্য কিছু আঘাতজনিত ক্ষত ও ব্যথা-বেদনা সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু আগে যে সত্যটি আমরা জানতাম না তা আজ জানলাম। আজ আমরা একথা বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জেনেছি যে আমাদের দৈব দেহাবয়ব মরণশীল জীবের মত কোন মারাত্মক আঘাতের অধীন নয়, কারণ আমরা অক্ষয় অমর। আমাদের দেহে কোন আঘাতজনিত ক্ষত হলেও সে ক্ষত আপন অন্তর্নিহিত শক্তিবলে আরোগ্য হয়ে ওঠে অল্পকালের মধ্যে।
সুতরাং যুদ্ধে আমাদের বিপদের ঝুঁকি যখন কম তখন সহজেই প্রতিকারের উপায় নির্ধারণ করতে পারি। আমরা যদি আরও উন্নত ধরনের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পরে শত্রুদের সম্মুখীন হই তাহলে আমাদের হয়ত ভাল হবে এবং শত্রুদের খারাপ হবে, অথবা উভয় পক্ষের শক্তির সমতা প্রমাণিত হবে। আর যদি আমাদের উপর তাদের শ্রেষ্ঠত্বের পিছনে কোন অজ্ঞাত কারণ থাকে তাহলেও আমরা আমাদের অক্ষুণ্ণ মনোবল ও অবিচল বুদ্ধির দ্বারা এ বিষয়ে উপযুক্ত অনুসন্ধান ও আলোচনা করে সে কারণকে প্রকাশ করব।
