এইভাবে উভয় পক্ষের ক্ষিপ্ত যুদ্ধোন্মত্ত সেনাদল স্বর্গলোক ধ্বংস করে ফেলত। কিন্তু এমন সময় সর্বশক্তিমান সর্বজ্ঞ ঈশ্বর তার প্রাসাদদুর্গের মধ্যে থেকেই যুদ্ধের প্রকৃত অবস্থার কথা জানতে পেরে সৈন্যদের ক্ষমতা সীমায়িত করে দিলেন।
তবু কিন্তু পলায়ন বা পশ্চাদপসরণের কথা ভাবল না তারা। তারা কেউ ভয় পেল না। সকলে আবার অদম্য উদ্যমের সঙ্গে যুদ্ধ করে যেতে লাগল।
শয়তান সেদিন এমন প্রবল বিক্রমের সঙ্গে যুদ্ধ করতে লাগল যে মনে হতে লাগল সে যুদ্ধে তার কোন সমকক্ষ নেই। তবু সে দেখতে পেল অপরাজেয় মাইকেলের অস্ত্রাঘাতে তার সব সৈন্য ভূপতিত হচ্ছে। তা দেখে সে মাইকেলকে নিজে বাধা দেবার জন্য এগিয়ে এল। মাইকেলও তার ঘৃণ্য শত্রুকে বন্দী করে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটাতে চাইল। কিন্তু সে তখনই যুদ্ধে প্রবৃত্ত হলো না।
মাইকেল তখন তাকে বলল, হে অশুভ শক্তির জনক, তোমার দৃষ্ট স্বরূপ এই বিদ্রোহের আগে পর্যন্ত অবিদিত ছিল স্বর্গলোকে। এখন তোমার সেই অশুভ স্বরূপ ও পাপপ্রবৃত্তি এই জঘন্য দ্বন্দ্বের মধ্যে প্রকটিত। এখন তোমার মত তোমার অনুগামীরা সকলের ঘৃণার বোঝাভার বহন করছে তোমার এই হীন কাজের জন্য।
একবার ভেবে দেখ, স্বর্গের যে শাস্তি তোমার এই বিদ্রোহের আগে পর্যন্ত অক্ষুণভাবে বিরাজিত ছিল, সে শান্তিকে কিভাবে তুমি বিপন্ন করে তুলেছ, প্রকৃতি জগতের মধ্যে এনেছ কত বিশৃংখলা। একদিন যারা ছিল বিশ্বস্ত ও ন্যায়পরায়ণ সেই হাজার হাজার দেবদূতের মধ্যে হিংসা সঞ্চারিত করেছ। আজ তাদের অবিশ্বস্ততা প্রমাণিত সত্য। কিন্তু ভেবো না তুমি ঈশ্বরের শান্তি ও স্বর্গের পবিত্রতা বিনষ্ট করে তুলবে। ঐশ্বরিক বিধানে এই স্বর্গ হতে তুমি বিতাড়িত, স্বর্গের কোন অংশে আর তোমার স্থান হবে না। পরমসুখে ও অনন্ত শান্তিতে পরিপূর্ণ এই পবিত্র স্বর্গলোক কখনো কোনরূপ হিংসা, বলপ্রয়োগ বা যুদ্ধবিগ্রহ সহ্ করে না। সুতরাং এখন তুমি তোমার দুষ্ট অনুচরদের নিয়ে যত সব অশুভ শক্তির লীলাভূমি নরকে চলে যাও। সেখানে গিয়ে যত খুশি অশান্তি সৃষ্টি করো। যদি না যাও তাহলে প্রতিশোধবাসনায় উদ্ধত আমার এই তরবারি তোমার ধ্বংসসাধন করবে অথবা ঈশ্বরের কোন প্রতিহিংসামূলক উড়ন্ত অস্ত্রের আঘাত তোমার যন্ত্রণাকে দীর্ঘায়িত করবে।
মাইকেল এই কথা বললে তার প্রতিপক্ষ শয়তান বলল, যাকে তুমি এখনো পর্যন্ত কার্যত ভীত করে তুলতে পারনি কে ভেবেছ হাস্তা দিয়ে অর্থাৎ ফাঁকা কথা বলে ভয় দেখাবে? তুমি কি আমার সেনাদলের একজনকেও রণক্ষেত্র হতে পালাতে বাধ্য করেছ অথবা তার পতন ঘটাতে পেরেছ? বরং তারা এক অপরাজেয় বিক্রমের সঙ্গে আমার জন্য যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। তাহলে কোন যুক্তিতে রাজকীয় মেজাজের সঙ্গে বলছ আমাকে তাড়িয়ে দেবে স্বর্গ থেকে? ভুলে যেও না এ যুদ্ধের গৌরব আমাদের পক্ষই লাভ করবে। আমরা জয়ী ঘ অথবা এই সমগ্র স্বর্গলোককে নরকে পরিণত করব। আমরা এখানে রাজত্ব করতে না পারলেও স্বাধীনভাবে বাস করতে চাই। আমাদের স্বাধীনতা যেন অবাধ য় এবং কেউ তাতে হস্তক্ষেপ করতে না পারে। যাই হোক, এখন তোমার সাহায্যের জন্য তোমাদের সর্বশক্তিমানকে ডাক। তাকে বল, তোমার পরম শত্রু আমি কিছুতেই পালাচ্ছি না। পালাব না। যুদ্ধে তোমাকে আহ্বান জানাচ্ছি।
এখানেই তাদের কথাবার্তা শেষ হলো। সম্মুখ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠল দুজনেই। তাদের সে যুদ্ধ অবর্ণনীয়। কোন মানুষ তা বর্ণনা করা তো দূরের কথা তা কল্পনাও করতে পারে না। তাদের গতিভঙ্গি, আকৃতি ও অস্ত্রশস্ত্রের দিক থেকে জনকেই দুই দেবতার মত মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল স্বর্গসাম্রাজ্য কোন পক্ষের অধিকারে থাকবে তা একমাত্র তারাই যেন স্থির করবে। বায়ুস্তর বিদীর্ণ করে তাদের তরবারি দুটি অর্ধবৃত্তাকারে সঞ্চালিত হতে লাগল। তাদের প্রকাণ্ড ঢালদুটি জ্বলন্ত সূর্যের মত দুদিকে দীপ্যমান হয়ে আছে। তাদের সেই যুদ্ধের কাছ থেকে অন্য সেনারা সরে যেতে লাগল ভয়ে।
যুদ্ধে তাদের সেই ক্ষোভ দেখে মনে হচ্ছিল প্রকৃতির নিয়ম ভেঙে জ্যোতিষ্কমণ্ডলী হতে দুটি বিশাল নক্ষত্র মধ্য আকাশে পরস্পরের দিকে পড়তেই তা দু খণ্ড হয়ে গেল। সেই সঙ্গে শয়তানের দক্ষিণ দেহের দিকে সে আঘাতে অনেকটা গভীর ক্ষত হয়ে গেল। জীবনে প্রথম আঘাতের যন্ত্রণা অনুভব করল শয়তান। সে যন্ত্রণায় সে ইতস্তত টলতে লাগল। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিল না।
তবে স্বর্গজাত কোন ব্যক্তির কোন আঘাতে মৃত্যু হয় না বা কোন ক্ষত দীর্ঘস্থায়ী হয় না তার দেহের মধ্যে। তাই শয়তানের সেই ক্ষতস্থান থেকে লাল রক্ত বার হয়ে তার বর্ষটিকে ভিজিয়ে দিলেও তার ক্ষতস্থানটি অল্পক্ষণের মধ্যেই সুস্থ হয়ে উঠল।
সঙ্গে সঙ্গে শয়তানের সাহায্যে একদল বিদ্রোহী সেনা ছুটে এল। আর একদল তাকে ধরাধরি করে তার রথে নিয়ে গিয়ে চাপিয়ে দিল। যুদ্ধক্ষেত্র হতে কিছুটা দূরে ছিল সে রথ। সেখানে কিছুক্ষণ শুয়ে বিশ্রাম করল শয়তান। সেই আঘাতের যন্ত্রণার সঙ্গে সঙ্গে এক অন্তর্বেদনা আচ্ছন্ন করে তুলেছিল শয়তানের মনটাকে। এইভাবে আহত হওয়ায় লজ্জা পাচ্ছিল সে মনে মনে। শক্তিতে সে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের সমকক্ষ তার এই আত্মবিশ্বাস খর্ব হলো অনেকখানি।
