আপন মনে এ্যাবদিয়েল এই সব বলার পর তার সহযোদ্ধাদের মধ্যে হতে এগিয়ে এসে শয়তানের সম্মুখীন হলো। তার পরম শত্রুর সামনে গিয়ে তার প্রতিরোধ করে বলল, শোন বলগর্বিত অহঙ্কারী, তোমার অভিলাষ কি পূর্ণ হয়েছে? তুমি ভেবেছিলে তোমার অন্যায় অসঙ্গত উচ্চাভিলাষ অবাধে সিদ্ধির সর্বোচ্চ শিখরে উন্নীত হবে। তুমি ভেবেছিলে, ঈশ্বরের অরক্ষিত স্বর্গসিংহাসনের গিয়ে বিনা বাধায় অনায়াসে উপবেশন করবে আর তোমার বাহুবল ও বাক্যবলের জন্য ঈশ্বরের পক্ষভুক্ত সকলে তাঁকে ত্যাগ করে পালিয়ে যাবে। নির্বোধ, এখন বোঝ, সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করার পরিণাম কি ভয়াবহ! এখন দেখ, সেই সর্বশক্তিমানের শক্তি কতখানি। কিভাবে তিনি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র শক্তি হয়ে এক বিরাট দুর্বার বাহিনীর উদ্ভব করে তোমার নিবুদ্ধিতার অসারতাকে ব্যর্থ করে দিয়েছেন। তিনি ইচ্ছা করলে একা কারো সাহায্য না নিয়েই শুধু নিজের হাতে তোমাকে ধ্বংস করে তোমার সমস্ত সেনাবাহিনীকে নরকের অন্ধকারে নিক্ষেপ করতে পারতেন।
এখন দেখতে পাচ্ছি, সকলেই তোমার দলভুক্ত নয়। সে দলের মধ্যে এমন একজনও অন্তত আছে যে ধর্ম ও ঈশ্বরবিশ্বাসকে সবচেয়ে বড় বলে মনে করে। তোমরা সকলেই যখন উদভ্রান্ত হয়ে ভুল পথে যাচ্ছিলে তখন আমি একা তোমাদের দল থেকে বেরিয়ে এসে সত্যের পথ অবলম্বন করি। এবার তাহলে বুঝতে পারছ হাজারজন ভুল করলেও
এ্যাবিদিয়েলের একথা শুনে তার পরম শত্রু শয়তান তখন বলল, হে দুবৃত্ত দেবদূত! আমার দল থেকে পালিয়ে ঠিক সময়েই আমার সামনে এসে পড়েছিস। তোর উপর আমি আমার প্রা প্রথম চরিতার্থ করতে চাই। এবার তোর এ কাজের উপযুক্ত পুরস্কার গ্রহণ কর। আমার উত্তেজিত দক্ষিণ হস্তের প্রথম আক্রমণ তোরই উপরে পতিত হোক। তুই-ই আমাদের সেই ধর্মসভায় তোর শানিত জিহ্বার দ্বারা আমাদের যুক্তিকে খণ্ডন করার দুঃসাহস দেখিয়েছিলি। আমরা যখন আমাদের দৈবশক্তিকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস পাই, আমরা যখন আমাদের মধ্যে এক দৈবশক্তিকে অনুভব করি তখন কেন অন্য একজনকে সর্বশক্তিমান বলে মান্য করব? কিছুতেই তা করব
যাই হোক, এখন তুমি তোমার দলের সকলের থেকে আগে এগিয়ে এসেছ। তুমি আমার পাখা থেকে একটি পালক তুলে আমার গৌরবকে খর্ব করতে চাও, তোমার দলের ধ্বংসকে ডেকে আনতে চাও। তুমি উচ্চাভিলাষী। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম স্বর্গে ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং ঐশ্বরিক শক্তি এক ও অভিন্ন। কিন্তু এখন দেখছি তোমার মত যারা অপদার্থ তাদেরই কাছে ব্যক্তিস্বাধীনতার কোন মূল্য নেই। তোমাদের কাছে দাসত্ব আর স্বাধীনতার কোন ভেদ নেই। তোমরা শুধু পান-ভোজন বন্দনাগান গেয়েই খুশি।
এ্যাবিদিয়েল তখন তার উত্তরে বলল, হে দেবদূতপ্রধান, এখনো তুমি ভুল করছ এবং তোমার এ ভুলের আর শেষ হবে না কখনো। তোমার এই ভ্রান্ত পথ অন্যের– পথ হতে অনেক দূরে। ঈশ্বরসেবা করার কাজকে তুমি দাসত্বের নামে অন্যায়ভাবে কলুষিত করছ। এই সেবার কাজ প্রকৃতি ও বিধিনির্দিষ্ট। যিনি যোগ্যতম হিসাবে শাসন করেন, যিনি শাসিতদের থেকে সব দিক দিয়ে বড়, যিনি সর্বগুণান্বিত তার সেবা করাকে দাসত্ব করা বলে? বরং যে অবিজ্ঞ অজ্ঞানী, যে ঈর্ষাবশত তার থেকে যোগ্যতর জনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তার সেবা করাই হলো দাসত্ব। যেমন তোমার অধীনস্থ যারা তোমার সেবা করে তারাই তোমার দাসত্ব করে। আসলে তোমারই কোন স্বাধীনতা নেই। তুমি প্রকৃত স্বাধীনতার মর্ম বোঝ না। তুমি তোমারই সকাম সত্তার দাস, নিজের কাছেই নিজে পরাধীন। তুমি নরকে গিয়ে সেখানকার রাজা হয়ে রাজত্ব করো। আমাকে স্বর্গে থাকতে দাও। আমি চিরকাল সুখে শান্তিতে স্বর্গবাস করে যিনি আমাদের মধ্যে যোগ্যতম, যিনি পরমেশ্বর তার সেবা করে ঐশ্বরিক আদেশ পালন করে ধন্য হতে চাই। শৃঙ্খলিত অবস্থায় আমি নরকবাস করতে চাই না। তুমি বলেছিলে আমি পালিয়ে এসেছি। এবার তোমার অধার্মিক মস্তকে আমার অভ্যর্থনা গ্রহণ করো।
এই বলে ঝড়ের বেগে এত তাড়াতাড়ি শয়তানের মাথায় আঘাত করল এ্যাবিদিয়েল যে শয়তান তা কল্পনাও করতে পারেনি। তার হাত সে আঘাতের প্রতিরোধ করতে পারল না। শয়তান সে আঘাত সহ্য করতে না পেরে দশ পা পিছিয়ে গিয়ে নতজানু হয়ে বসে পড়ল। মনে হলো, ঝড়-জলের প্রচণ্ড আঘাতে অসংখ্য পাইনগাছসহ একটি পাহাড়ের অর্ধেকটা ধসে গেল মাটির তলায়।
তাদের নেতার এই অবস্থা দেখে বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল বিদ্রোহী সেনাদল।
এদিকে মাইকেল ও গ্যাব্রিয়েলের অধীনস্থ দেবসেনাগণ জয়ঢাক বাজিয়ে ঈশ্বরের জয়গান গাইতে লাগল। বিপক্ষ সেনাদল তখন প্রচণ্ড বিক্রমে যুদ্ধ শুরু করল। অজস্র অস্ত্রের ঝংকার নিনাদিত হতে লাগল সমগ্র রণক্ষেত্র জুড়ে। শাঁ শাঁ শব্দে তীর উড়ে যেতে লাগল লক্ষ্যাভিমুখে। রথের চাকাগুলি উন্মত্ত হয়ে ঘুরতে লাগল ক্রমাগত।
উভয় পক্ষের যুদ্ধ ঘোরতর হয়ে উঠল। তুমূল হয়ে উঠল সৈন্যদের চিৎকার ও রণধ্বনি। তখন যদি পৃথিবী থাকত তাহলে সে পৃথিবীর ভিত্তিমূল পর্যন্ত কাঁপতে থাকত। সে এক আশ্চর্যজনক ঘটনা। উভয় পক্ষের লক্ষ লক্ষ দেবদূত যুদ্ধ করতে লাগল। তারা পরস্পরকে একেবারে ধ্বংস করতে না পারলেও বিক্ষত করে তুলছিল বিশেষভাবে। এক একজন সৈন্যকে অনেক সৈন্য বলে মনে হচ্ছিল।
