অসংখ্য অবিশ্বস্তের মাঝে একমাত্র বিশ্বস্ত দেবদুত এ্যাবদিয়েল অটুট অবিচলভাবে এই কথাগুলি বলল। কোন ভয়ে কম্পিত না হয়ে, সে তার অদম্য শক্তিকে অটুট রাখল যে শক্তি সমস্ত প্রলোভনকে জয় করে অব্যাহত রয়ে গেল তার ঈশ্বরপ্রেম। কোন কিছুই সত্য থেকে বিচ্যুত করতে পারল না তাকে। অসংখ্যের মাঝে সে একা হলেও তার মন পরিবর্তিত হলো না কিছুতেই।
তাদের মধ্য থেকে সভা ছেড়ে চলে গেল এ্যাবদিয়েল। উপস্থিত সকলের ঘৃণার উত্তরে সে সকলের সামনে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে উড়ে চলে গেল।
০৫ম সর্গ
পঞ্চম সর্গ
সারারাত্রি ধরে সেই নির্ভীক দেবদূত নির্ভয়ে উড়ে যেতে লাগল। অবশেষে রাত্রি প্রভাত হলেই কে যেন তার গোলাপী হাত দিয়ে আলোর দ্বার উন্মুক্ত করে দিল পূর্বাচলে।
ঈশ্বরের সিংহাসনের পাশে একটি গুহা ছিল। সেই গুহাতে আলো-অন্ধকার অনন্তকাল ধরে যাওয়া-আসা করে পালাক্রমে। সে গুহার এক দ্বারপথ দিয়ে আলো দেখা দিলে অন্যপথ দিয়ে অন্ধকার প্রবেশ করে।
একদিন প্রভাতকালে সেই গুহা থেকে আলো বেরিয়ে এসে আকাশে তা ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঈশ্বর তার সিংহাসন থেকে দূরে সমতলভূমির উপর অসংখ্য উজ্জ্বল রথ, সশস্ত্র সৈন্য ও অশ্বসমূহ দেখতে পেলেন। তিনি বুঝতে পারলেন তাঁর সুযোগ্য সেনাদল যুদ্ধশেষে সৈন্যসহ ফিরে আসছে। তিনি বুঝতে পারলেন, এ বিষয়ে যে সংবাদ তিনি আগেই পেয়েছিলেন তা সত্য।
তাই তিনি বেরিয়ে এলেন সেই পবিত্র পর্বতশিখরে। তাঁকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে বিপুল হর্ষধ্বনি করে উঠল বিজয়ী সেনাদল। তারা যুদ্ধে শত্রুদের পরাজিত করে সকলেই অক্ষতদেহে ফিরে এসেছে।
সেই শিখরদেশে ইতস্তত সঞ্চরমান সোনানী মেঘমালার মধ্যে ঈশ্বরের কণ্ঠ ধ্বনিত হলো। তিনি বললেন, হে ঈশ্বরের সেবকবৃন্দ, তোমরা ভালভাবেই যুদ্ধ করেছ। তোমরা অসংখ্য বিদ্রোহী সেনাদের যুদ্ধক্ষেত্র হতে বিতাড়িত করে বীরের উপযুক্ত কার্যই করেছ। তারা এখন সকলের দ্বারা ধিকৃত। কৌশল ও পারদর্শিতার থেকে তাদের বাগাড়ম্বর বেশি। এবার সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত জয়ের পথ আরও সুগম হবে। মিত্রশক্তির সাহায্যে তোমরা আমাদের শত্রুদের আক্রমণ করে তাদের সম্পূর্ণরূপে দমন করে অধিকতর বিজয় গৌরবে ফিরে আসবে। তারা আমার বিধান মানে না, আমার পুত্রের রাজশক্তিকে স্বীকার করেন না।
যাও মাইকেল ও গ্যাব্রিয়েল, তোমরা দুজন হলে স্বর্গের সামরিক শক্তির দুই নেতা। তোমরা আমার হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ দেবসেনা নিয়ে সেই সব দণ্ডিত ঈশ্বরদ্রোহী বিদ্রোহীদের সম্পূর্ণরূপে নিৰ্জিত করার জন্য সঙ্গে যাও। বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র দ্বারা তাদের আক্রমণ করে স্বর্গলোক হতে বিতাড়িত ও অখণ্ড স্বর্গসুখ হতে চিরতরে বঞ্চিত করে নরকগহ্বরে নিক্ষেপ করো। এটাই হবে তাদের চরম শাস্তি। পতনশীল সেই সব বিদ্রোহীদের গ্রাস করার জন্য নরকগহর মুখ বিস্তার করে আছে।
এই বলে ঈশ্বরের কণ্ঠ নীরব হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণকুটিল মেঘমালা ঘনীভূত হতে লাগল পাহাড়ের উপরে। ঈশ্বরের প্রচণ্ড রোষের প্রতীক হিসাবে অগ্নিগর্ভ ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে লাগল আকাশে। সমস্ত দেবসেনারা অভিযানের জন্য প্রস্তুত হয়ে সঙঘবদ্ধভাবে দাঁড়ালে রণবাদ্য বাজতে লাগল। সেই সব বাদ্যে ও রণভেরীতে বীরত্বব্যঞ্জক সুর ধ্বনিত হতে লাগল।
এরপর অসংখ্য দেবসেনা সমরনেতাদের পরিচালনায় সারিবদ্ধভাবে ঈশ্বর ও ঈশ্বরপুত্রের গৌরব ও সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য অটল সংকল্পে দৃঢ় হয়ে আকাশপথে এগিয়ে চলতে লাগল। সে পথে পাহাড়, পর্বত, নদী বা সমুদ্রের কোন বাধা ছিল না। অনুকূল বাতাসে অব্যাহত ছিল তাদের অগ্রগতি।
অবশেষে অবিলম্বে স্বর্গলোকের উত্তর প্রান্তে এসে উপনীত হলো দেবসেনাদল।
এদিকে শয়তানও চুপ করে বসে ছিল না। প্রথম যুদ্ধে সে রণক্ষেত্র হতে পালিয়ে গিয়ে রাত্রির অন্ধকারে আশ্রয় নিলেও আবার সে নূতন রণোদ্যমে তার সেনাদল নিয়ে ভয়ঙ্কর অভিযানে এগিয়ে আসতে লাগল। অহঙ্কারী উচ্চাভিলাষী শয়তান ঈশ্বরের স্বর্গসিংহাসনে অধিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল নিজেকে।
ক্রমে উভয়পক্ষ পরস্পরের নিকটবর্তী হলে উভয়পক্ষ হতে যুদ্ধের ধ্বনি উঠতে লাগল। শয়তানদের রাজা ঈশ্বরের সব কৃত্রিম মহিমায় নিজেকে সমুন্নত করে তার রথের উপর সিংহাসনে বসে ছিল। সে ছিল চেরাবিম জাতীয় বিদ্রোহী দেবসেনাদের দ্বারা পরিবৃত। তার পাশে ছিল সোনার বাঘ আর অস্ত্র। তার গায়ে ছিল সোনার কর্ম।
দুপাশের মাঝখানে যে উন্মুক্ত প্রান্তর বিস্তৃত হয়েছিল, রথ থেকে নেমে শয়তান ধীর পায়ে উদ্ধতভাবে এক রাজকীয় গাম্ভীর্যের সঙ্গে সেই দিকে এগিয়ে যেতে লাগল শত্রুপক্ষের সম্মুখীন হবার জন্য।
শয়তানের এই গর্বোদ্ধত ভাব দেখে সহ্য করতে পারল না এ্যাবিদিয়েল। সে তখন ঈশ্বরের মহান কর্মে ব্ৰতী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার কাছে এটা ধর্মযুদ্ধ, এ যুদ্ধ করার অর্থ হলো ঈশ্বরেরই সেবা করা।
সে তখন নির্ভীক অদম্য অন্তরে আবেগের সঙ্গে বলল, হে ঈশ্বর! তোমার অনুরূপ। এক সর্বোচ্চ শক্তিতে ভূষিত হয়ে একটা শয়তান স্বর্গলোকের সীমানার মধ্যে বিচরণ করবে, এটা কখনই শোভা পায় না। যার মধ্যে কোন ঈশ্বরবিশ্বাস বা ঈশ্বরভক্তি নেই, যে ধর্মচ্যুত, যার গুণহীন অন্তরের অসারতা সাহসিকতার ছদ্মরূপে সকলের দৃষ্টিতে অজেয় হিসাবে প্রতীয়মান করে তুলেছে তাকে, সে কেন এমন এক ছলনাময় ঔদ্ধত্যে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে? সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের সহায়তার উপর বিশ্বাস রেখে আমি তার শক্তি পরীক্ষা করব। আমি তার অসার অসত্য যুক্তিগুলিকে এর আগেই মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছি। সত্যের বিতর্কে যে পাশবিক শক্তির বলে সকল যুক্তিকে নস্যাৎ করে তর্কযুদ্ধেও জয়ী হতে চায় তাকে তুমি এখনো কি করে সহ্য করছ?
