অথচ স্বর্গলোকের প্রত্যেকে নতজানু হয়ে ঈশ্বরের পুত্রকে তার সকল শক্তি ও সম্মানের একমাত্র বৈধ উত্তরাধিকারী হিসাবে বরণ করে নেবে। আইনের বিধানের সঙ্গে স্বাধীনতাকে যুক্ত করে এক করে দেখে তুমি যা কিছু বলেছ তা সর্বতোভাবে অন্যায়। সমানাধিকারের ভিত্তিতে সকলে সমান হলেও সকল শক্তির অধিকারী একজনই শাসন করে যাচ্ছে। এটাই হলো ঈশ্বরের বিধান। আইন ও স্বাধীনতার মধ্যে কোন বিরোধ নেই। যে ঈশ্বর তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, তোমাকে এই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছেন সেই ঈশ্বরের বিধানকে খণ্ডন করে তার বিরোধিতা করে এক পাল্টা বিধান তুমি সৃষ্টি করতে চাও।
ঈশ্বর গলোকের মধ্যে সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গতভাবে সকলের মধ্যে যোগ্যতানুযায়ী ক্ষমতা বণ্টন করে সে ক্ষমতা নির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ করে দিয়েছেন, যাতে কারো সঙ্গে কোন বিরোধ না বাধে। তাছাড়া আমরা আমাদের অভিজ্ঞতার দ্বারা এটা বেশ বুঝেছি ঈশ্বর পরম মঙ্গলময়, তিনি আমাদের সকল মঙ্গল, সম্মান ও উন্নতির বিধানকর্তা। তিনিই। আমাদের এই সুখী অবস্থায় উন্নীত করেছেন। তিনিই আমাদের ঐক্যবদ্ধ করেছেন।
তোমার মধ্যে দেবদূতের সব গুণগুলি মূর্ত হয়ে ওঠায় তোমাকে ঈশ্বর সৃষ্টি করে এক মহান ও গৌরবময় আসনে অধিষ্ঠিত করে শক্তিতে তাঁর প্রায় সমকক্ষ করে তুলেছেন। ঈশ্বর তোমাকে ও সকল দেবদূতকে সৃষ্টি করেছেন এবং সকলকে তাদের আপন আপন গুণ ও যোগ্যতানুসারে গৌরবে মণ্ডিত করেছেন। তিনি এই স্বর্গরাজ্য শাসন করলেও সে শাসনের দ্বারা কিছুমাত্র খর্ব হয়নি আমাদের গৌরব, বরং তা উজ্জ্বল হয়েছে আরও। তাঁর প্রণীত আইন আমরা বিবেকের আইন ভেবেই মেনে চলি। তাঁর প্রতি যে সম্মান প্রদর্শন করি তা আমাদেরই কাছে ফিরে আসে। সুতরাং এই অধর্মোচিত ক্রোধ পরিহার করা। মিথ্যা কারণে এদের প্ররোচিত করো না। তোমার আচরণে রুষ্ট আমাদের পরম পিতা ও তাঁর পুত্রের কাছে তাড়াতাড়ি গিয়ে তাঁদের সন্তুষ্ট করো। যথাসময়ে চাইলে ক্ষমা মিলতে পারে। কিন্তু দেরি হলে আর মার্জনা পাবে না।
দেবদূত এ্যাবদিয়েল এইসব কথাগুলি আবেগের সঙ্গে বলল। কিন্তু তার কথা উপস্থিত কেউ সমর্থন করল না। সবাই ভাবল এই কথা এখানে অপ্রাসঙ্গিক। কোন এক হঠকারীর ব্যক্তিগত মতামতমাত্র। ফলে সেই দেবদূতপ্রধানরূপী শয়তান খুশি হলো। সে তখন আরও উদ্ধতভাবে বলতে লাগল, তুমি বলছ, ঈশ্বরই আমাদের সৃষ্টি করেন, তাই তার সঙ্গে আমাদের পিতাপুত্রের সম্পর্ক। এ এক অভিনব এবং অদ্ভুত যুক্তি। কোথা থেকে একথা শিখেছ তা জানতে পারি কি?
এই সৃষ্টির উৎপত্তি কে দেখেছে? তোমার জন্মকথা কি তোমার মনে আছে? স্রষ্টা ঠিক কখন তোমার এই অস্তিত্ব দান করেন তা কি মনে আছে তোমার? কেউ তা জানে না। জেনে রেখো, তুমি আমি আমরা সবাই স্বয়ম্ভু, আপনা হতেই সৃষ্টি হয়েছে আমাদের। আপন আপন শক্তিতেই আমাদের জন্ম ও বৃদ্ধি ঘটে। একটি ঘূর্ণমান গ্রহের কক্ষপথ সম্পূর্ণ হওয়ার সময় আমাদের জন্মস্থান এই স্বর্গলোকের যখন উৎপত্তি হয় তখনই আমাদের জন্ম হয়। হে স্বয়ম্ভু সন্তানগণ, তোমরা স্বজাত, স্বয়ংসিদ্ধ। আমাদের এই দক্ষিণ হস্তই আমাদের প্রধান কর্তব্যকগুলি কি তা শিখিয়ে দেবে। কে আমাদের সমকক্ষ, তা আপন শক্তির দ্বারাই প্রমাণিত হবে। এবার তোমরা বিচার-বিবেচনা করে দেখবে, স্বর্গাধিপতির সিংহাসনের চারপাশে স্তাবকের মত সমবেত হয়ে প্রার্থনা ও অনুনয়-বিনয়ের দ্বারা তাঁকে তুষ্ট করবে, না সেই সিংহাসন অবরোধ করবে। অথবা চূড়ান্ত শক্তিপরীক্ষার মাধ্যমেই এ বিষয়ের নিষ্পত্তি করবে।
এই সংবাদ অভিষিক্ত যুবরাজের কাছে যথাশীঘ্র বহন করে নিয়ে যাও। তা না হলে কোন অশুভ শক্তি তোমাদের গতিরোধ করতে পারে।
শয়তান এই কথা বললে গভীর সমুদ্রগর্জনের মত এক প্রবল সমর্থনধ্বনি বিপুল হর্ষধ্বনির সঙ্গে যুক্ত হয়ে অসংখ্য বিদ্রোহী নেতৃবৃন্দের কণ্ঠে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। কিন্তু এ্যাবদিয়েল একাকী শত্রু দ্বারা পরিবৃত হয়েও কোন ভয় পেল না। আগের মত সে নিতীকভাবে উত্তর করল, হে ঈশ্বরদ্রোহী, হে অভিশপ্ত দেবদূত, আজ তুমি সমস্ত শুভ অমঙ্গলকে পরিত্যাগ করলে। আমি দেখতে পাচ্ছি তোমাদের পতন অনিবার্য। তোমরা এই বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণাময় কুকর্মের সঙ্গে তোমার অধীনস্থ এই দেবসেনা দলও সংজড়িত হয়ে পড়ল। তোমার অপরাধ ও শাস্তি সংক্রামক রোগজীবাণুর মত ছড়িয়ে পড়বে তাদের জীবনে।
ঈশ্বরের পুত্রের প্রভুত্বকে পরিহার করার জন্য আজ থেকে আর বিব্রত হতে হবে না তোমায়। ঈশ্বরঘোষিত আইনের বিধান আর মেনে যেতে হবে না তোমাকে। অমোঘ অপরিবীয় শক্তির বিধান জর্জরিত করে তুলবে তোমায়। সুবর্ণময় যে ঐশ্বরিক রাজদণ্ডকে অমান্য করেছ তুমি, সেই রাজদণ্ড আজ লৌহদণ্ড হয়ে তোমার বিদ্রোহের মূলে আঘাত হানবে, তাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাবে।
তুমি ভালই উপদেশ দিয়েছ। কিন্তু তোমার উপদেশ যত খারাপই হোক, আমি তার ভয়ে অথবা তোমার ভয়ে তোমাদের এই অধ্যুষিত বাসস্থান ছেড়ে চলে যাচ্ছি না। আমি যাচ্ছি কারণ ঈশ্বরের ধূমায়িত রোষ সহসা প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠলে তখন কে ভাল কে মন্দ তা বিচার বা বাছাই করার কোন অবকাশ থাকবে না।
আমি বলে দিচ্ছি, শীঘ্রই তুমি অগ্নি উদগীরণকারী বস্ত্রের আঘাত তোমাদের মাথার উপর অনুভব করবে। তবে বুঝতে পারবে কে তোমায় সৃষ্টি করেছে। তখন বুঝতে পারবে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন তিনি তোমাকে ধ্বংস করছেন।
