এইভাবে সেই আর্কেঞ্জাল বা দেবদূতপ্রধান তার সহকর্মীদের মনকে প্রভাবিত করে তার কথা বুঝিয়ে বলল। তার সহকর্মী ও তাদের অধীনস্থ দেবসেনাদের সমবেতভাবে ও ব্যক্তিগতভাবে ডেকে তার প্রধানের কথাগুলি বুঝিয়ে বলল। দ্বৰ্থবোধক কথায় ও প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে সে ঐক্যবদ্ধ করে তাদের কু-অভিসন্ধির কথাগুলি বুঝিয়ে দিল। তাদের ক্ষমতাশালী নেতার কথা তারা মেনে চলতে সম্মত হলো।
রাত্রিশেষে ধ্রুবতারা আকাশে উঠতেই স্বর্গের সেনাদলের এই একটি অংশ সমবেত হলো তাদের প্রধানের আদেশমতো। লুসিফারই হলো এই ধ্রুবতারা। তাকে দেখে উৎসাহিত হলো তারা।
এদিকে সর্বশক্তিমান সর্বদশী ঈশ্বরের যে চক্ষু সকল অন্তঃগূঢ় গোপন চিন্তাগুলিকেও দেখতে পায় এবং বুঝতে পারে, সেই চক্ষু সেই পবিত্র পর্বতে সারারাত্রি ধরে প্রজ্জ্বলিত স্বর্ণদীপের শিখায় দেখতে পেল এক বিদ্রোহের অভ্যুত্থান হচ্ছে। তিনি বুঝতে পারলেন কারা তাঁর সৃষ্ট দেবসন্তানদের একটি অংশের মধ্যে সেই বিদ্রোহের বিষাক্ত হাওয়া ছড়িয়ে দিচ্ছে। বুঝতে পারলেন তারা তাঁর বিধানের বিরোধিতা করছে।
তিনি যখন তাঁর পুত্রকে হাসিমুখে বললেন, হে আমার পুত্র, আমার শক্তির একমাত্র অধিকারী, আমার গৌরবের মূর্ত প্রতীক, এখন আমাদের অবিসম্বাদিত শক্তিপরীক্ষার সময় এসেছে। আমাদের শক্তি কতখানি সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে হবে আমাদের। আমাদের প্রাচীন সাম্রাজ্য রক্ষা করার জন্য অস্ত্র প্রয়োগ করতে হবে। এমন এক প্রবল শত্রুর উদ্ভব হয়েছে যে স্বর্গলোকের উত্তরে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আমাদের মতোই রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে সিংহাসনে বসতে চায়। আবার এতেই সন্তুষ্ট নয় সে। সে আমাদের অধিকার ও প্রভুত্বকে অস্বীকার করে যুদ্ধে আমাদের শক্তি পরীক্ষা করতে চায়। এখন এ বিষয়ে কি করা উচিত বল। এখন দেখ, আমাদের কি পরিমাণ শক্তি অর্থাৎ সৈন্য ও অস্ত্রবল আছে এবং সেই সমস্ত সামরিক শক্তি আমাদের প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত করে বিপদটা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করো। তা না হলে শত্রুদের অতর্কিত আক্রমণে আমাদের এই পবিত্র পার্বত্য রাজ্যটিকে হারাতে হতে পারে।
এ কথার উত্তরে ঈশ্বরপুত্র প্রশান্ত চিত্তে মৃদু অথচ স্পষ্ট কণ্ঠস্বরে বলল, হে পরম শক্তিমান পিতা, শত্রুরা যতই চক্রান্ত করুক, যতই হৈচৈ করুক, তাদের ষড়যন্ত্র ও প্রয়াস ব্যর্থ হতে বাধ্য। এটা আমার পক্ষে সত্যিই এক গৌরবের বিষয়। আমিই হলাম তাদের এই বিদ্রোহ ও ষড়যন্ত্রের কারণ। তারা যখন দেখল তুমি তাদের উদ্ধত গর্বকে খর্ব করার জন্য আমাকে তোমার সমস্ত রাজশক্তি দান করেছ তখন তারা এ বিষয়ে আমার যোগ্যতা কতখানি তা যাচাই করে দেখতে চাইল।
ঈশ্বরপুত্র যখন এইসব কথাগুলি বলছিল ঠিক সেই সময় শয়তান তার সেনাদল নিয়ে বহু দূরবর্তী উত্তরাঞ্চল থেকে পাখায় ভর দিয়ে অনেক পথ পার হয়ে একটি পাহাড়ের দিকে উড়ে আসতে লাগল।
যে পাহাড়ে ঈশ্বরপুত্রের অভিষেকক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল, এ পাহাড়টি ছিল তারই অনুরূপ। সেই পাহাড়ের উপরেই ছিল দেবদুতপ্রধান লুসিফারের প্রাসাদ। সেখানে ঈশ্বরপুত্রের অনুরূপ এক রাজকীয় সিংহাসন স্থাপন করেছিল সে। এইখানেইলুসিফাররূপী শয়তান তার অধীনস্থ সেনাদের সমবেত করে তার পরিকল্পনার কথা জানায়। ছলনা ও এক হীন অপকৌশলের দ্বারা নানাভাবে যত অসত্য কথা বলে তাদের বশীভূত করে তোলে।
সে তাদের বলতে লাগল, ভাই সব, রাজত্ব ও রাজক্ষমতার কোনরকম বিকেন্দ্রীকরণ না করে একজনমাত্র সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে। তারপর তার পুত্রকে যুবরাজরূপে অভিষিক্ত করে আইনের বিধানদ্বারা আমাদের সব অধিকার গ্রাস করে আমাদের সকলকে তার অধীনস্থ দাস করে রেখেছে।
এই কারণেই আজ এই মধ্যরাত্রিতে তাড়াতাড়ি এই সভার আয়োজন করেছি। আজ যে ঈশ্বরপুত্র হিসাবে পিতার নিজের দ্বিগুণীকৃত শক্তি ও সম্মানে ভূষিত সেই ঈশ্বরপুত্রকে আমরা ক্রীতদাসের মত নতজানু বা প্রণিপাত হয়ে সসম্মানে বরণ করে নেব কিনা সে বিষয়ে আলোচনা করব এই সভায়। অথবা ভেবে দেখতে হবে এই হীনতা ও পরাধীনতার জোয়াল হতে মুক্ত করার জন্য কোন ভাল পরিকল্পনা খাড়া করতে পারি কি না। তোমরা কি তোমাদের কাঁধের উপর জোয়াল ধারণ করবে? তোমরা কি তার সামনে নতজানু হবে?
আমি যতদূর জানি তোমরা তা পারবে না। তোমরা যদি নিজেদের সম্বন্ধে ভালভাবে জান এবং নিজেদের অধিকার সম্বন্ধে সচেতন হও তাহলে বুঝতে পারবে পদের দিক থেকে তোমরা সকলে সমান না হলেও তোমরা সকলেই সমানভাবে স্বাধীন। পদের তারতম্য ও শৃংখলা কখনো স্বাধীনতার পরিপন্থী নয়। শক্তি ও ঐশ্বর্যে সমান না হলেও অধিকারের দিক থেকে আমরা যদি সমান ও সকলেই স্বাধীন হই তাহলে একজন কেন শুধু তার রাজশক্তির জোরে আমাদের সকলের উপর প্রভুত্ব করবে? কেন সে আইনের বিধান আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়ে শাসন করবে আমাদের? কেন আমাদের প্রভু হয়ে শুধু সম্মান আর শ্রদ্ধা উপচার চাইবে আমাদের কাছ থেকে? কিন্তু যে নীতি অনুসারে আমরাই আমাদের প্রভু, আমরা কারো দাসত্ব করতে বাধ্য নই, আমাদের স্বতন্ত্র ও স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় যে নীতি সে নীতিকে লঙঘন করতে চায় ঈশ্বর।
এইরকম উদ্ধতভাবে অনেকক্ষণ ধরে উত্তেজনামূলক কথাগুলি বলে চলল সেই দেবদূতপ্রধান শয়তান। এমন সময় এ্যাবদিয়েল নামে সেরাফিম জাতীয় এক দেবদূত যে ঈশ্বরকে খুব ভক্তি করত এবং সব ঐশ্বরিক আদেশ নির্বিবাদে পালন করত, শয়তানের কথা শুনে প্রচণ্ড ক্রোধানলে উত্তপ্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। এক জ্বলন্ত প্রতিবাদে ফেটে পড়ে সে বলতে লাগল, হে নাস্তিক, ঈশ্বরদ্রোহী, এই মিথ্যা গর্বোদ্ধত কথাগুলি স্বর্গলোকের মধ্যে অন্তত তোমার মুখে শোভা পায় না। যে তুমি আর সকলের থেকে উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত সেই তোমার মুখ থেকে এসব কথা শোনার কেউ আশাই করতে পারে না। ঈশ্বর তাঁর একমাত্র পুত্রকে ন্যায়সঙ্গতভাবে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত ও রাজশক্তিতে ভূষিত করে যে শপথবাক্য উচ্চারণ করেছেন ও যে বিধান ঘোষণা করেছেন সেই বিধানের বিরুদ্ধে ন্যায়, নীতি ও ধর্মবিহর্গিতভাবে তীব্র ভাষায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেছ।
