আদমের এই অনুরোধে রাফায়েল সম্মত হয়ে কিছুক্ষণ থামার পর বলতে আরম্ভ করল, হে আদি মানবপিতা, তুমি আমার উপর যে কাজের ভার দিলে তা যেমন কঠিন তেমনি বিষাদজনক আমার পক্ষে। কেমন করে আমি অদৃশ্য দেবতাদের কার্যাবলী মানুষের জ্ঞানের বিষয়ীভূত করে তুলব? একদিন যারা পূর্ণতার গৌরবে মণ্ডিত হয়ে স্বর্গলোকে প্রতিষ্ঠিত ছিল তাদের ধ্বংস ও পতনের কথা প্রকাশ করে অন্য এক জগতের রহস্য কি করে উদঘাটিত করব? তবু আমি শুধু তোমার মঙ্গলের জন্য মানুষের জ্ঞানের অতীত বিষয় প্রকাশ করব তোমার কাছে। যদিও এই মর্ত্যলোক স্বর্গেরই ছায়ামাত্র এবং যদিও দেহধারী মানুষের সঙ্গে বিদেহী দেবতাদের সম্পর্ক খুবই জটিল তথাপি সে সম্পর্কের কথা বলব তোমায়।
কেন্দ্র ও পরিধিবিশিষ্ট যে জগৎ আজ এখানে দেখছ, যে সব গ্রহ ও জ্যোতিষ্কমণ্ডলীকে আজ মহাশূন্যে শৃংখলাবদ্ধভাবে ঘুরতে দেখছ, সৃষ্টির আদিকালে এসব কিছুই ছিল না। ছিল শুধু এক মহাশূন্য আর যত সব বিশৃংখলা।
এই সময় একদিন যখন স্বর্গের বৎসর গণনা শুরু হয় সেদিন ঈশ্বরের ডাকে স্বর্গের বিভিন্ন প্রান্ত হতে দশ হাজার দেবদূত ঈশ্বরের সিংহাসনের চারপাশে সমবেত হয়। পরম পিতার কোলে ছিল তখন তার সন্তান।
তিনি তখন দেবদূতদের সম্বোধন করে বললেন, শোন হে দেবদূতবৃন্দ, আলোর জনক, কত রাজা, রাজ্য, গুণ ও শক্তির জন্মদাতা। আজ আমি আমার একমাত্র পুত্রের জন্ম ঘোষণা করছি। আজ আমি এই পবিত্র পাহাড়ে তার অভিষেক করছি। যাকে তোমরা আমার কোলের ডানদিকে দেখছ তাকে আমি তোমাদের নেতা নিযুক্ত করেছি। তোমরা তার কাছে মাথা নত করে তাকে তোমরা তোমাদের প্রভু বলে মেনে নেবে। তোমরা তার অধীনে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সুখে শান্তিতে বাস করবে। যে আমার পুত্রকে অমান্য করবে সে আমাকেই অমান্য করবে। সে ঐক্যকে বিচ্ছিন্ন করবে সে ঈশ্বরের আশীর্বাদ হতে বঞ্চিত হবে, ঈশ্বরের দর্শন হতে বঞ্চিত হবে, নরকের গভীর অন্ধকারে পতিত হবে। প্রতিকারের অতীত পাপে মগ্ন হবে সে। অনন্তকাল ধরে নরকজ্বালা সহ্য করবে সে।
সর্বশক্তিমান পরম পিতা এই কথা বলতে উপস্থিত সকলে সন্তুষ্ট হলো বলে মনে হলো, কিন্তু একেবারে সকলে সন্তুষ্ট হলো না। সেদিন দিনের শেষে আসন্ন সন্ধ্যায় অন্যান্য দিনের মত সমবেত দেবদূতেরা নাচগানে মত্ত হয়ে উঠল। তখন মনে হলো তাদের সেই নৃত্যগীতের তালে তালে মহাশূন্যে ঘূর্ণমান গ্রহনক্ষত্রগুলিও যেন নৃত্য করছে।
দেবদূতদের সমবেত কণ্ঠে ও নৃত্যরত গ্রহনক্ষত্রদের তানের মধ্যে এমনই একটি সুমধুর ঐকতান ছিল যে তা শুনে পরম প্রীত হলেন ঈশ্বর। সেদিন কিন্তু ঘূর্ণমান গ্রহনক্ষত্রগুলির মধ্যে আমাদের তেমন শৃংখলা বা নিয়মনিষ্ঠা ছিল না।
ক্রমে সন্ধ্যা সমাগত হলো। তখন কিন্তু সকাল-সন্ধ্যার মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্য ছিল না। সঙ্গে সঙ্গে নাচগান ছেড়ে নৈশভোজনে মন দিল দেবদূতেরা। তারা চক্রাকারে দাঁড়িয়ে পড়ল। তখন তাদের সামনে খাবার টেবিল সাজানো হলো আর দেবদূতদের উপযুক্ত রাশিকৃত খাবার সাজিয়ে দেওয়া হলো। স্বৰ্গজাত পুষ্পমণ্ডিত নানা ফল পরিবেশন করা হলো তাদের। তার সঙ্গে দেওয়া হলো লাল মুক্তোর মত মদ। পরম পিতা ঈশ্বর নিজে প্রচুর পানভোজনের ব্যবস্থা করেছিলেন।
দেবদূতেরা সকলে মিলেমিশে তৃপ্তির সঙ্গে পানাহার করল। পরম আনন্দের এক অমৃতধারা বয়ে যাচ্ছিল যেন তাদের সেই ভোজনসভায়। পরমেশ্বরও তাদের সঙ্গে আনন্দ উপভোগ করছিলেন। আলোছায়ার নাচন চলছিল যেন ঈশ্বরবিরাজিত সেই পবিত্র পাহাড়ে। চলছিল আলোছায়ার চঞ্চল লীলামাধুরী।
রাত্রি আসার সঙ্গে সঙ্গে স্বর্গের উজ্জ্বল মুখমণ্ডল সহসা ধূসরবণ হয়ে উঠল। কারণ স্বর্গলোকে কখনো ঘনীভূত হয়ে ওঠে না রাত্রির অন্ধকার। রাত্রিকালে ঈশ্বরের চক্ষু কখনো নিদ্রিত হয় না। তিনি শুধু দিনের শেষে শায়িত হয়ে বিশ্রাম লাভ করেন।
দেবদূতেরা তখন দলে দলে তাদের শিবিরে প্রস্থান করল। জীবন-বৃক্ষের চারপাশে অসংখ্য চত্বর ছিল। সেখানে তারা শীতল বাতাসে শরীর তোষণ করে সুখনিদ্রায় অভিভূত হয়ে উঠল। যারা শুধু সারারাত ঈশ্বরের সিংহাসনের চারপাশে পালাক্রমে মধুর স্তোত্ৰগান করত তারাই জেগে রইল।
আজ যে শয়তানরাজ নামে অভিহিত, সেদিন রাত্রিতে সেই শয়তান তখন স্বর্গেই থাকল। সেদিন ঘুমোল না, আবার স্তোত্ৰগানরত দেবদূতদের মত কোন কাজ করতে লাগল না। অথচ সে জেগে রইল।
সেদিন আজকের এই শয়তানরাজ ছিল প্রধানতম দেবদূত। সে তখন ঈশ্বরের অনুগৃহীত এবং প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী। কিন্তু ঈশ্বরের প্রকাশ্য পুত্রের প্রতি তার মনে ছিল দারুণ ঈর্ষা। সেদিন ঈশ্বর যখন সেই পবিত্র পাহাড়ে তাঁর পুত্রকে যুবরাজরূপে অভিষিক্ত করেন তখন সে দৃশ্য সইতে পারেনি শয়তান। সে দৃশ্য সে ঈর্ষার জ্বালায় দেখতে পারেনি। তার অহঙ্কারে আঘাত লেগেছিল।
এক গভীর হিংসা ও তীব্র ঘৃণার বশবর্তী হয়ে সেদিন মধ্যরাত্রিতে সংকল্প করল সে, সে ঈশ্বরের প্রতি আর কোন আনুগত্য প্রদর্শন করবে না। তাঁর আদেশ পালন বা মান্য করবে না, শুধু তাই নয়, তাকে সিংহাসনচ্যুত করার চেষ্টা করবে। সে আর ঈশ্বরের কোন উপাসনা করবে না।
প্রধান দেবদূতরূপী শয়তান এই সংকল্প মনে মনে করার পর, তার প্রধান সহকর্মীকে জাগাল ঘুম থেকে। সে বলল, হে আমার প্রিয় সঙ্গী, তুমি ঘুমোচ্ছ? কি করে ঘুম নেমে এল তোমার চোখের পাতায়? গতকাল সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের মুখ থেকে যে কথা নিঃসৃত হয়েছে তা তুমি শুনেছ? আমরা যখন দুজনেই জাগ্রত অবস্থায় ছিলাম তখন আমাদের মনপ্রাণ সব এক ছিল। আমি আমার মনের কথা তোমায় বলতাম, তুমি আমায় বলতে তোমার মনের কথা। এক নতুন আইন প্রবর্তিত হয়েছে। রাজা যখন নতুন আইন বলবৎ করেছে তখন আমরা তাঁর প্রজা হিসাবে সে আইনে সন্দেহ হওয়ায় সে আইন পর্যালোচনা করে অবশ্যই দেখব। সে সন্দেহ আমাদের নিরসন করতে হবে। তবে এখানে এ বিষয়ে বেশি কথা বলা নিরাপদ নয়। তাই আমাদের অধীনে যারা কাজ করে তাদের সবাইকে সমবেত করে উত্তরদিকে আমাদের যে সব বাসা আছে সেখানে তাড়াতাড়ি যেতে আদেশ করো। সেখানে রাত্রি শেষ হবার আগেই আমি চলে যাব। সেখানে আমরা আমাদের রাজার নূতন বিধান ও তার যুবরাজপুত্র সম্বন্ধে বিশেষভাবে আলোচনা করে দেখব। তারা যথাশীঘ্র সম্ভব। তাদের এই নূতন বিধান সর্বত্র বলবৎ করতে চায়।
