আদম তাই বলল, হে ঈশ্বরের নিকটতম প্রতিবেশী, জানি তুমি শুধু আমাদের প্রতি দয়াবশত স্বর্গের আসন ছেড়ে এখানে এসে যে ফল যে খাদ্য ও পানীয় দেবদূতদের পক্ষে উপযুক্ত নয় তা তৃপ্তির সঙ্গে ভোজন করেছ। আমাদের হীন ঘরে মাথা নত করে প্রবেশ করেছ।
দেবদূত রাফায়েল তখন বলল, আদম, সর্বশক্তিমান এক অদ্বিতীয় ঈশ্বর থেকেই সকল বস্তু ও জীবের জন্ম হয় এবং মৃত্যুর পর তার কাছেই ফিরে যায়। কোন জীব যদি সততা থেকে বিচ্যুত না হয় তবে তা পূর্ণতা লাভ করবেই। প্রথমে ঈশ্বর বিচিত্র রূপ ও গুণবিশিষ্ট বস্তুজগৎ সৃষ্টি করেন। তারপর সৃষ্টি করেন প্রাণীজগৎ ও পরে আরও সূক্ষ্ম আরও পবিত্র জ্যোতিষ্কমণ্ডলী যা স্বর্গের নিকটবর্তী আকাশমণ্ডলে বিরাজ করে। একটি বৃক্ষকে দেখ। প্রথমে শিকড়, তারপর কাণ্ড, তারপর পাতা, সবশেষে ফুল ও ফল।
মানুষের জীবনও দেখবে ধীরে ধীরে এক মহান সমুন্নতির দিকে উঠে গেছে। প্রথমে অস্থিমজ্জা মাংসরক্তসমন্বিত দেহ, তারপর প্রাণ, তার মন ও ইন্দ্রিয়সমূহ, বৃদ্ধি, কল্পনা, যুক্তি। সবশেষে আছে আত্মা। এই আত্মার দ্বারাই পূর্ণতা লাভ করে মানুষ। আত্মার চুড়ান্ত উন্নতির দিকেই পরিচালিত হবে মানুষের সকল অন্তরবৃত্তি।
এই আত্মিক উন্নতির মধ্য দিয়ে মানুষ পূর্ণতা লাভ করতে করতে ভবিষ্যতে এমন একদিন আসবে যেদিন মানুষ তার স্থূল দেহ ত্যাগ করে সূক্ষ্ম উজ্জ্বল দেবদূতের দেহ ধারণ করবে। আমাদের মত পাখা নিয়ে আকাশে বাতাসে উড়ে যেতে পারবে আর স্বর্গলোকে বাস করবে। অবশ্য যদি তোমরা একান্তভাবে মনে-প্রাণে ঈশ্বরের প্রতি অনুগত থাকতে পার, তাঁর প্রতি প্রেমে ও বিশ্বস্ততায় অবিচল থাকতে পার তাহলে একদিন তোমরা এই মর্ত্যজীবন থেকে উত্তীর্ণ হয়ে পরম স্বর্গীয় সুখের আস্বাদন লাভ করে ধন্য হতে পারবে। আপাতত যে অবস্থায় আছ তাতেই সন্তুষ্ট থাক। এখন এর বেশি কিছু পাওয়া সম্ভব নয়।
তা শুনে আদি মানবপিতা বলল, হে দৈব অতিথি, বন্ধু দেবদূত, কিভাবে আমরা আমাদের জ্ঞানকে ঠিকপথে পরিচালিত করে সৃষ্ট জীব হিসাবে ধাপে ধাপে ক্ষেত্র থেকে পরিধির পথে যেতে পারি, কিভাবে এই স্কুল দেহ ত্যাগ করে পবিত্র ও অতিসূক্ষ্ম উজ্জ্বল দেবমূর্তি ধারণ করে স্বর্গলোকে গিয়ে ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভ করতে পারি সে বিষয়ে যথার্থ শিক্ষা ও উপদেশ দান করেছ।
কিন্তু একটা জিনিস বল, তুমি কথা প্রসঙ্গে বললে, যদি তোমরা অনুগত থাক–একথার অর্থ কি? তবে কি আমরা ঈশ্বরের প্রতি অনুগত নই? তিনি আমাদের সৃষ্টি করলেও তাঁর প্রেম কি আমাদের এখন পরিত্যাগ করেছে? তিনিই তো আমাদের এখানে প্রতিষ্ঠিত করে মানুষ যে সুখ কামনা করে সেই সুখ চূড়ান্তভাবে ঈশ্বর আমাদের দান করেছেন।
রাফায়েল তখন বলল, হে স্বর্গ ও মর্ত্যের সম্ভান, শোন, তুমি এখন সুখী এবং এই সুখের জন্য ঈশ্বরের কাছে ঋণী, আবার তোমার এই সুখ যদি স্থায়ী হয় তাহলেও তুমি থাকবে তাঁর কাছে। তোমার এই সুখ-শান্তি নির্ভর করবে তাঁর প্রতি আনুগত্যের উপর। আমি তখন ‘অনুগত’ কথাটির মধ্য দিয়ে এটাই বোঝাতে চেয়েছিলাম।
সুতরাং আমার উপদেশ শোন। ঈশ্বর তোমাকে পূর্ণতা দান করেছেন ঠিক, কিন্তু তোমার এই পূর্ণতা অপরিবর্তনীয় নয়। তোমার গুণাবলীর অভাব ঘটলে, তোমার মধ্যে সততা ও নীতিবোধের অভাব ঘটলে এই পূর্ণতা তোমার নাও থাকতে পারে।
ঈশ্বর তোমাকে সৎ করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন কিন্তু চেষ্টা ও অধ্যবসায়ের দ্বারা তোমার জীবনের নির্দিষ্ট কর্ম সম্পাদন করে এই সততা বজায় রাখা তোমার ইচ্ছাশক্তির উপর নির্ভর করে। মনে রেখো, তোমার ইচ্ছাশক্তি স্বাধীন, তা ভাগ্য বা কঠোর অভাব বা প্রয়োজনীয়তার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়।
ঈশ্বর চান আমাদের ঐচ্ছিক সেবা ও আনুগত্য। কোন প্রয়োজনের দ্বারা বাধ্য হয়ে আমরা তাঁর সেবা করি–এটা চান না তিনি। এ ধরনের সেবা গ্রহণ করেন না তিনি। মানুষের অন্তর যদি স্বাধীন হয়, তবে কেন মৃত্যুর পর তার বিচার হয়, সে স্বেচ্ছায় ঈশ্বরের সেবা করেছে কোন প্রয়োজনের বা কোন কামনার তাড়নায় সে সেবা করেছে তা বিচার করে দেখা হয়? যদি মানুষের ইচ্ছাশক্তি স্বাধীন না হত, যদি তারা ভাগ্যের দ্বারা তাড়িত হয়ে সবকিছু করত তাহলে সে কাজের জন্য বিচার করার কি অর্থ হত?
আরও দেখ, আজ আমি ও আমার মত যত সব দেবদূতেরা স্বর্গ-সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ঈশ্বরের চারদিকে অবস্থান করে পরম স্বর্গীয় সুখ উপভোগ করছি, তা শুধু তার প্রতি আমাদের আনুগত্যের জন্য। এই আনুগত্য যতদিন আমাদের থাকবে ততদিনই আমরা উপভোগ করে যাব এ সুখ। অন্য কোন কারণ নেই। আমরা আমাদের স্বাধীন ইচ্ছার বশবর্তী হয়েই ঈশ্বরকে ভালবাসি এবং তাঁর সেবা করি। এই দেশ, ভালবাসা ও আনুগত্যের দ্বারাই আমরা এই অবস্থার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত থাকব। আবার এই গুণগুলির অভাব ঘটলেই আমাদেরও পতন ঘটবে। আজ যারা অধঃপতিত, স্বর্গচ্যুত হয়ে নরকে নির্বাসিত, আনুগত্যের অভাব আর ঈশ্বরদ্রোহিতাই তার একমাত্র কারণ। আর সেই পতনের ফল কি দেখ। কি পরিমাণ স্বর্গীয় সুখ থেকে আজ কি ভীষণ নরকযন্ত্রণা তারা সহ্য করছে!
তখন আমাদের আদিপিতা বলল, তোমার কথাগুলি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। হে ঐশ্বরিক। পরামর্শদাতা, তোমার উপদেশামৃত আমি সানন্দে আমার কণ্ঠদ্বারা পান করেছি। চেরাবজাতীয় দেবদূতদের নৈশ সঙ্গীতের থেকেও শ্রুতিমধুর তোমার নীতি উপদেশ। আমি জানতাম না মানুষের ইচ্ছা ও কর্ম স্বাধীন। যাই হোক, আমি কখনো আমাদের পরম পিতার প্রতি ভালবাসার কথাকে ভুলব না। তার ন্যায়সঙ্গত আদেশ আমি কখনো অমান্য করব না। এ বিষয়ে আমি নিশ্চিন্ত, আমার চিন্তা ও সংকল্প স্থির। যদিও তুমি ঈশ্বরের নামে অনেক কিছুই বলেছ তথাপি কিছু সংশয় রয়ে গেছে আমার মনে। আমি আরো কিছু জানতে চাই। অবশ্য যদি তোমার অমত না থাকে তবে বলতে পার। ঈশ্বর ও আমাদের মধ্যে যে রহস্যময় সম্পর্ক বিদ্যমান তার পূর্ণ বিবরণ আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই। এখনো সময় আছে। সূর্য সবেমাত্র তার আহ্নিক গতিপথের অর্ধাংশ অতিক্রম করেছে।
