রাফায়েল কাছে এসে গেলে ভীত না হলেও শ্রদ্ধাবনত চিত্তে ননত ভঙ্গিতে তার সামনে এসে দাঁড়াল আদম। তারপর বলতে লাগল, হে স্বর্গাধিবাসী, স্বর্গ ছাড়া আর কোন লোক এমন উজ্জ্বল মূর্তি ধারণ করতে পারে? স্বর্গলোক ছেড়ে কিছুক্ষণের জন্য তুমি যে আমাদের মত এক মানবদম্পতিকে মনে করে তাদের সাহচর্য দান করতে এসেছ, এজন্য কি বলে ধন্যবাদ দেব তোমায়? এই মাঠটুকু ঈশ্বর আমাদের দান করেছেন। এই মাঠেই আমরা কাজ করি। তবে দুপুরের এই দুঃসহ তাপটা না কমা পর্যন্ত আমরা এই কুঞ্জেই বিশ্রাম করি।
আগন্তুক দেবদূত রাফায়েল তখন বলল, হ্যাঁ আদম, আমি তোমার সঙ্গে কিছুক্ষণ যাপন করার জন্যই এসেছি এখানে। তোমরা এই মনোরম উদ্যানে ও ভূখণ্ডে বাস করলেও স্বর্গের দেবদূতরা মাঝে মাঝে প্রায়ই আসবে তোমাদের কাছে। এখন তোমার ঐ ছায়াশীতল কুঞ্জে চল। আমি এই দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকব তোমার কাছে।
আদম তখন তার কুসুমদামসজ্জিত ও সুবাসিত কুঞ্জমাঝে নিয়ে গেল রাফায়েলকে। ঈভের কিন্তু কোন সাজসজ্জাই ছিল না। তার নগ্ন দেহটি ছিল প্রকৃতিদত্ত স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও লাবণ্যে সমৃদ্ধ। তবু তাকে বনপরী ও যে তিনজন পরমাসুন্দরী দেবী একদিন আইডা পর্বতে রাখালবেশি প্যারিসের কাছে তাদের সৌন্দর্য বিচারের জন্য আবির্ভূত হয়েছিলেন, তাঁদের সকলের থেকে সুন্দরী দেখাচ্ছিল। পরম রূপবতী ও গুণবতী ঈভের মাথায় কোন বস্ত্রের অবগুণ্ঠন ছিল না, মনে কোন দুর্বলতা ছিল না, গণ্ডদ্বয়ের উপর লজ্জার অরুণ আভা ছিল।
তাকে দেখে দেবদূত রাফায়েল সম্মানের সঙ্গে অভিবাদন করে বলল, হে মানবজাতির মাতা, তোমার ফলবতী গর্ভ হতে জাত সন্তানদের দ্বারা সমগ্র জগৎ হবে একদিন পরিপূর্ণ। তারা সংখ্যায় এইসব গাছের ফলের থেকেও বেশি।
তৃণাচ্ছন্ন একটি মাটির উচ্চ টিপি তাদের খাবার টেবিলের কাজ করল। সেই কুঞ্জে বসন্ত ও শরৎ যেন হাত ধরাধরি করে নাচছিল। কথাবার্তা বা আলাপ-আলোচনার আগে তাদের ভোজনপর্ব সেরে ফেলার জন্য আদিপিতা আদম বলল, হে স্বর্গীয় অতিথি, এই সব ফল ভক্ষণ করুন। পরম পিতা ঈশ্বরের ইচ্ছায় এইসব সুস্বাদু ফল প্রচুর পরিমাণে মর্ত্যভূমিতে জন্মায়। এ সবই আমাদের পরম পিতার দান।
তখন দেবদূত রাফায়েল বলল, পরম গৌরবময় ঈশ্বর-সৃষ্ট মানবজীবনের দুটি দিক আছে–দেহ ও আত্মা। দেহ ও আত্মার দুইয়েরই খাদ্য চাই। একটি স্কুল, একটি সূক্ষ্ম। মানুষের আত্মিক দিকে আছে বুদ্ধিবৃত্তি আর যুক্তিবোধ আর আছে পঞ্চ ইন্দ্রিয় যার দ্বারা তারা চোখে দেখে, কানে শোনে, নাক দিয়ে ঘ্রাণ নেয়, হাত দিয়ে স্পর্শ করে আর জিভ আস্বাদন করে। এইভাবে তারা কর্মেন্দ্রিয়কে জ্ঞানেন্দ্রিয়তে পরিণত করে। এই ইন্দ্রিয়জ্ঞানই মানুষের বুদ্ধি ও যুক্তিকে খাদ্যের উপাদান করে পুষ্ট করে তোলে। আবার যুক্তি ও বুদ্ধি দ্বারা পুষ্ট ও বলিষ্ঠ আত্মা উন্নত হয়। ঈশ্বর সারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার খাদ্য চাই। খাদ্যবস্তুদ্বারা পুষ্টি বা লালিত না হলে কোন বস্তু বা জীব কখনো বাঁচতে পারে না।
আবার দেখবে স্কুল বা সূক্ষ্ম যে সব উপাদানের দ্বারা বিশ্বজগৎ গঠিত তাদের মধ্যে স্থূল উপাদানগুলি সূক্ষ্ম উপাদানগুলিকে খাদ্য সরবরাহ করে বাঁচিয়ে রাখে। পঞ্চ মহাভূতের মধ্যে দেখ মাটি সমুদ্র বা জলকে খাদ্য দান করে, জল বাতাসকে খাদ্য দান করে, বাতাস অগ্নিকে খাদ্য দান করে, অগ্নি আবার আকাশ ও চন্দ্রকে খাদ্য যোগায়। যে সূর্য বিশ্বের সকল বস্তু ও জীবকে আলো ও জীবন দান করে সেই সূর্যও পৃথিবীর জলরাশিকে বাষ্পকারে শোষণ করে বেঁচে থাকে। সৃষ্ট হয়। ঈশ্বর এই মানুষের দেহ ও মনকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিভিন্ন বস্তুর সৃষ্টি করেছেন।
এই বলে খেতে বসল রাফায়েল। সে দেবদূত হলেও মানুষের মত তারও পেটে ছিল দারুণ ক্ষুধা এবং সেই ক্ষুধার তাড়নায় সে প্রচুর খেল। তার হজমশক্তি যেন মানুষের মতোই বেশি। যে কোন স্কুল খাদ্যবস্তুকে সে জীর্ণ করে সহজেই তার থেকে আসল নির্যাস আকর্ষণ করে তা দিয়ে তার প্রাণশক্তিকে পুষ্ট করতে পারে। স্বর্ণকারেরা যেমন খাদমিশ্রিত সোনার টুকরোগুলিকে কয়লার আগুনে গলিয়ে খাঁটি সোনায় পরিণত করে।
এদিকে ঈভ তাদের খাবার পরিবেশন করতে লাগল সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায়। খাবার দেওয়ার পর তাদের কাপগুলি উত্তম মদ্যদ্বারা পূর্ণ করে দিল কানায় কানায়। কিন্তু স্বর্গসুলভ এক নিষ্কলুষ নির্দোষিতায় ভরা তখন ঈশ্বরের সৃষ্ট সন্তানদের মনপ্রাণ ছিল কত পবিত্র। কত নির্বিকার। খাদ্যবস্তু পরিবেশনকারিণী ঈভের নগ্ন সৌন্দর্য দেখেও কোন কামপ্রবৃত্তি জাগল না তাদের মনে। যে দুর্বার কামপ্রবৃত্তি প্রেমকে আদর্শচ্যুত করে তার অধোগতি ঘটায়, যে ঈর্ষা প্রেমিক-প্রেমিকাকে নরকে নিয়ে যায়, সে কামপ্রবৃত্তি ও ঈর্ষা থেকে মুক্ত ছিল তাদের মন।
এইভাবে পানভোজনে তৃপ্ত হলো তারা। আদম তখন ভাবল, এই সুযোগ তার হাতছাড়া করা চলবে না। দেবদূত রাফায়েলের কাছ থেকে ঊর্ধ্বলোকে বিরাজিত স্বর্গধামে দেবতাদের জীবনযাত্রা সম্বন্ধে অনেক কিছু জেনে নেবে। কারণ সে জানত দেবতাদের গুণ, গরিমা ও শক্তি মানুষের থেকে অনেক বেশি। তাদের রূপও মানবদেহের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু দেবতাও মানব–দুই জাতির একই পিতা ঈশ্বরের সৃষ্ট হলেও তাদের মধ্যে এই পার্থক্য প্রভেদের মধ্যে কোথায় কোন্ রহস্য আছে তা জানতে চায় সে।
