সেই সঙ্গে তার বিপদের কথাটাও বলে দেবে। তার সে বিপদটা কোন্ দিক থেকে আসতে পারে সেটাও বুঝিয়ে দেবে। বলবে তার শত্রু কে। তার সেই শত্রু স্বর্গ থেকে বিতাড়িত ও নরকে নির্বাসিত হবার পর সে পালিয়ে এসে মানবজাতির বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। সে চাইছে তার মত মানবজাতিরও পতন ঘটুক। সে কিন্তু কোনরকম বলপ্রয়োগ করবে না। কারণ সে জানে তাতে সে বাধা পাবে। এ ব্যাপারে সে শুধু মিথ্যা ও ছলনার আশ্রয় নেবে।
আদমকে সাবধান করবে এ বিষয়ে, সে যেন স্বেচ্ছায় ন্যায়নীতি লঙ্ঘন করে পরে সে কিছু জানত না বলে অজুহাত না দেখায়।
এই বলে পরম পিতা রাফায়েলকে যাবার নির্দেশ দিলেন। রাফায়েলও আর দেরি না করে রওনা হয়ে পড়ল। অসংখ্য দেবদূতের মাঝখানে সে দাঁড়িয়ে ছিল। ঈশ্বরের আদেশ পেয়ে সে তার বিরাট পাখা মেলে আকাশপথে উড়ে গেল। স্বর্গদ্বারের কাছে গিয়ে একবার থামল সে। রুদ্ধদ্বার সঙ্গে সঙ্গে খুলে গেল। পরম স্থপতিরূপে ঈশ্বর এমনইভাবে স্বর্গদ্বারের সোনার স্প্রিং দেওয়া দরজাটি নির্মাণ করেন।
স্বর্গের দ্বারপথ পার হয়ে আবার উড়ে চলল রাফায়েল। কোন মেঘ বা নক্ষত্র কোন বাধা সৃষ্টি করল না তার গতিপথে। রাফায়েল অন্যান্য উজ্জ্বল গ্রহগুলির মত পৃথিবী ও স্বর্গের উদ্যানটিকে দেখতে পেল। রাত্রিতে দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে যেমন চাঁদের মধ্যবর্তী ভূমিখণ্ডকে দেখা যায়, নাবিকরা যেমন সমুদ্র থেকে দক্ষিণ ঈজিয়ান দ্বীপগুলির মধ্যে ভেলস ও সামসকে অস্পষ্টভাবে দেখতে পায় তেমনি অস্পষ্টভাবে রাফায়েল দূরের আকাশ হতে অরণ্যাচ্ছাদিত পাহাড় ঘেরা ইডেনের উদ্যানটিকে দেখতে পেল।
গতিটার বেগ কমিয়ে দিয়ে স্বর্গলোকের পূর্বদিকে অবতরণ করল রাফায়েল। একটা পাহাড়ের উপর নেমেই তার নিজের আসল মূর্তি ধারণ করল। তার স্বর্গীয় পোশাকটা ঢাকার জন্য দুটো পাখা ধারণ করল সে দেহের বিভিন্ন জায়গায়। একজোড়া কাঁধে, একজোড়া বুকে আর একজোড়া জানুতে বেঁধে নিল। তাতে পায়ের আর গোড়ালিদুটো ঢাকা পড়ে গেল।
এইভাবে ছয়টি পাখাদ্বারা তার দেহটিকে যুক্ত করে মাইয়ার পুত্র হামিসের মত দাঁড়িয়ে রইল রাফায়েল। তার পাখার পালক থেকে এক সুগন্ধ নির্গত হয়ে চারদিক আমোদিত করে তুলল।
যে সব দেবদূত সেখানে পাহারা দিচ্ছিল আগে হতে তাদের দলের সবাইকে একনজরে চিনতে পারল রাফায়েল। তারাও তাকে দেখে বুঝতে পারল স্বর্গীয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোন নির্দেশ বা কোন বাণী নিয়ে এসেছে সে।
প্রহরারত দেবদূতদের শিবিরের চকচকে তাঁবুগুলির মধ্যে দিয়ে স্বর্গোদ্যানের সেই মনোরম ছায়াচ্ছন্ন কুঞ্জবনে চলে গেল রাফায়েল। বিচিত্র ফুলের গন্ধভরা সেই কুঞ্জবনে চিরবসন্তের বর্ণগন্ধময় বিচিত্র শোভায় শোভিত প্রকৃতি বিরাজ করছিল উজ্জ্বল মহিমায়। সেখানে অনন্ত সুখ ছিল সতত লীলায়িত।
আকাশে প্রদীপ্তভাস্বর সূর্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত যে তাপ বিকীরণ করছিল তা মর্ত্যভূমির মাটির গর্ভে অনুপ্রবিষ্ট হয়ে মাটিকে উত্তপ্ত করে তোলায় কুঞ্জবনের দ্বারপথে শীতল ছায়াতলে বসেছিল আদম। রাফায়েলকে দেখতে পেয়েই এগিয়ে এল সে। ঈভ তখন কুঞ্জবনের ভিতরে থেকে তাদের মধ্যাহ্নভোজনের ব্যবস্থা করছিল। তাদের ক্ষুধাতৃপ্তির জন্য নানারকমের সুস্বাদু রসাল ফল সে সাজিয়ে রাখছিল। এই সব ফল খেয়ে তারা নিকটবর্তী কোন ঝর্ণা থেকে দুধের মত জলপান করে তৃষ্ণা মেটায়।
দূরে এক দেবদূতকে আসতে দেখে ঈভকে ব্যস্ত হয়ে ডাকল আদম। বলল, এখানে এস ঈভ, পূর্বদিকে একবার চেয়ে দেখ। কি এক উজ্জ্বল মূর্তি আমাদের এই দিকে আসছে। মনে হচ্ছে বেলা দ্বিপ্রহরে অসময়ে এক চাঁদ উঠেছে আকাশে। আর সেই চাঁদ নেমে আসছে আকাশ থেকে। নিশ্চয় কোন দেবদূত স্বর্গ থেকে কোন বাণী নিয়ে আসছে আমাদের জন্য। ঐ স্বর্গীয় অতিথিকে যথাযথভাবে আপ্যায়িত ও প্রীত করার জন্য তাড়াতাড়ি করে তোমার ভাঁড়ারে কি সব ফলমূল আছে দেখ। না থাকে সংগ্রহ করে রাখ। প্রকৃতিজাত ফলমূল কখনো ফুরোয় না। প্রকৃতি যতই ফল দান করে ততই তা জন্মায়।
তা শুনে ঈভ আদমকে বলল, প্রকৃতি জগতে সকল ঋতুতেই প্রচুর পাকা ফল পাওয়া যায়। আমি প্রতিটি বৃক্ষশাখায় ঝুলতে থাকা ভাল ভাল রসাল ফল তুলে এনে তা আমাদের সম্মানীয় দেবদূত-অতিথিকে প্রদান করব। সেইসব ফল ভক্ষণ করে তিনি যেন স্বীকার করতে বাধ্য হন স্বর্গের মত এই মর্ত্যলোকেও ঈশ্বরের দানের সীমা নেই।
এই কথা বলে একমাত্র অতিথিসেবার কথা ভাবতে ভাবতে ব্যস্ত হয়ে ফলবতী বৃক্ষগুলির দিকে চলে গেল ঈভ। অনেক ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন বৃক্ষশাখা থেকে অনেক পাকা রসাল ফল তুলল ঈভ। সেগুলি একটি পাত্রে করে নিয়ে কিছু সুগন্ধি গোলাপ ফুল তুলে পথে ছড়াতে ছড়াতে কুঞ্জমাঝে ফিরে এল সে।
ইতিমধ্যে আমাদের মহান আদিপিতা সেই দেবোপম অতিথিকে সাদর অভ্যর্থনা জানাবার জন্য এগিয়ে গেল। তার নিজস্ব কতকগুলি গুণ ছাড়া কোন অনুচর ছিল না তার সঙ্গে। সে ছিল একা। কিন্তু সে একা হলেও এবং তার অভ্যর্থনায় কোন জাঁকজমক না থাকলেও তা ছিল রাজা-মহারাজের জানানো জাঁকজমক ও প্রভূত ঐশ্বর্যসম্পন্ন অভ্যর্থনার থেকে অনেক ভাল। তা ছিল সরল, স্বাভাবিক এবং গুরুগম্ভীর। কোন কৃত্রিমতা বা অহেতুক কোন উচ্ছ্বাস ছিল না তার মধ্যে।
