তোমার রূপ ও গুণ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। তুমি অবর্ণনীয়রূপে স্বর্গের ঊর্ধ্বলোকে সতত অধিষ্ঠিত থাকায় অপরিদৃশ্য অথবা অস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান আমাদের কাছে। এইসব সুন্দর বস্তু তোমার নিম্নমানের সৃষ্টি হলেও এই সব সৃষ্টি তোমার অচিন্ত্যনীয় সততা, তোমার শুভপ্রদায়িনী ও ঐশ্বরিক শক্তির কথাই ঘোষণা করে। আলোর সন্তান হে দেবদূতবৃন্দ, ঈশ্বরের অবর্ণনীয় মহিমার কথা তোমরাই সবচেয়ে ভাল করে ব্যক্ত করতে পার। কারণ তোমরাই তাঁর দর্শনলাভে ধন্য এবং স্বর্গে তাঁর সিংহাসনের চারপাশে রাত্রিবিহীন অবিচ্ছিন্ন দিবালোকে সতত সমবেত হয়ে সমস্বরে এক সুমধুর ঐকতানে তাঁর জয়গান গেয়ে থাক।
হে মর্ত্যবাসী সকল জীব, তোমরাও ঈশ্বরের অনন্ত গৌরবগানে যোগদান করো সকলে। সে গানের যেন আদি, অন্ত, মধ্য বলে কিছু না থাকে। সে সঙ্গীতের সুরলহরী যেন অনাদ্যন্ত ধারায় চিরপ্রবাহিত হতে থাকে সারা জগতে।
রাত্রিশেষে উদিত সমস্ত নক্ষত্ৰকুলের মধ্যে সুন্দরতম ধ্রুবতারা, তুমিই তোমার স্থির উজ্জ্বল জ্যোতির দ্বারা ঊষাকালকে দ্যোতিত করো। তুমি প্রত্যুষে ঈশ্বরের জয়গান করো তোমার কক্ষপথে।
হে জগচ্চক্ষু ও জগতাত্মা দিবাকর, সেই সর্বশক্তিমান পরমেশ্বরকে তোমার প্রভু বলে স্বীকার করে। তার প্রার্থনা গান করো। যখন তুমি উদিত হও, যখন তুমি মধ্যাহ্ন গগনে ভাস্বর হয়ে ওঠ ভাস্বর মহিমায় অথবা তুমি যখন অস্তাচলে অধোগমন করো–সব সময় সব অবস্থাতেই তুমি তোমার শাশ্বত কক্ষপথে ঈশ্বরের গৌরবগান করো।
হে নক্ষত্রমণ্ডলমধ্যবর্তী চন্দ্র, যিনি অন্ধকার হতে আলোর সৃষ্টি করেন সেই পরমস্রষ্টার গুণগান করো।
বায়ুসহ হে পঞ্চমহাভূত, তোমরাই প্রকৃতির গর্ভজাত আদি সৃষ্টি, তোমরা বিচিত্ররূপে বিরাজিত হয়ে বিশ্বের সকল বস্তুকে লালন করো। অন্তহীন বিরামহীন রূপ পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে আমাদের মহান স্রষ্টার জয়গান করো।
পাহাড় ও উত্তপ্ত জলরাশি হতে উখিত হে কুয়াশা ও বাষ্পরাশি, বিশ্বস্রষ্টার সম্মানে উদিত হয়ে সূর্য যতক্ষণ পর্যন্ত না ধূসরবর্ণের তোমাদের দেহগুলিকে সোনালী বর্ণে অণুরঞ্জিত করে দেয় ততক্ষণ বিরাজিত থাকবে তুমি। বর্ণহীন আকাশ মেঘের বা প্রান্তরভাগগুলি পরিশোভিত করার জন্যই হোক, বা তৃষ্ণার্ত পৃথিবীতে কয়েক পশলা বৃষ্টির দ্বারা বারিসিক্ত করার জন্যই হোক বা যে কোন কারণেই তোমাদের উৎপত্তি হোক না কেন, তোমরা উখানে-পতনে সমানভাবে ঈশ্বরের সেবা করে যাও, তাঁর গুণগান করো।
হে বাতাস, তুমি তাঁরই গৌরবগান চারদিকে প্রবাহিত হয়ে ছড়িয়ে দাও। হে পাইনগাছ, অন্যান্য গাছপালার সঙ্গে তোমরা তোমাদের মাথা নেড়ে তারই গৌরবগান ধ্বনিত করো সশব্দে। হে ঝর্ণাধারা, তোমরা কলশব্দে তারই গুণগান করো। হে পাখিরা, তোমরাও সকল জীবের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ঈশ্বরের প্রার্থনাস্তোত্র গাও। তোমাদের সেই স্তোত্রের সম্মিলিত সুরধারা স্বর্গাভিমুখে উৎক্রমণ করুক। তোমরা পাখা মেলে চারদিকে উড়ে বেড়িয়ে মধুর কলকাকলির মাধ্যমে তাঁর গুণগান করো। আকাশ-বাতাস পূর্ণ হোক সে গানে।
হে জলচর, স্থলচর, উভচর ও সরীসৃপ জাতীয় জীবকুল, তোমরা দেখ, আমি সকাল-সন্ধ্যায় পাহাড়ে-পর্বতে, উপত্যকায় বা নদীতটে যেখানেই যখন থাকি না কেন, জঙ্গম সকল বস্তুকেই তাঁর গুণগান করতে শেখাই।
হে বিশ্বস্রষ্টা, জগৎপতি, তুমি আমাদের মঙ্গলদান করো। অশুভ শক্তির কুটিল অন্ধকার কালরাত্রির মতো আমাদের চারদিকে যতই ঘন হয়ে উঠুক না কেন, আলো যেমন অন্ধকারকে অপসৃত করে তেমনি তুমিও আমাদের চারদিকে ঘনীভূত সে অন্ধকারকে বিদূরিত করো।
এইভাবে সেই আদি পিতামাতা নির্মল নিষ্কলুষ অন্তঃকরণে ঈশ্বরের প্রার্থনা গান করল। আবার এক অনাবিল প্রশান্তি প্রতিষ্ঠিত হলো তাদের অন্তরে। তখন তারা মাঠে তাদের কাজে চলে গেল। যে সব ফলবতী গাছের শাখাগুলি অত্যধিক বেড়ে গিয়ে অন্যান্য গাছগুলিকে উদ্ধতভাবে আলিঙ্গন করতে যাচ্ছিল তাদের সেই সব শাখাগুলিকে কিছুটা করে ছেটে দিল তারা। আঙ্গুরের লতাগুলিকে এলম গাছের সঙ্গে জড়িয়ে দিল। বিবারে যৌতুকস্বরূপ গুচ্ছ গুচ্ছ ফলের উপহার দিয়ে আঙ্গুর লতাগুলি দুহাত বাড়িয়ে এলম গাছগুলিকে বিবাহের বর হিসাবে বরণ করে নিতে চাইছিল যেন। আদম ও ঈভ তাদের সাহায্য করছিল।
স্বর্গাধিপতি ঈশ্বর আদম ও ঈভকে এইভাবে কর্মে নিযুক্ত দেখে রাফায়েল নামে একজন দেবদূতকে ডাকলেন। রাফায়েল তোরিয়াস নামে এক মেয়ে দেবদূতকে বিয়ে করে তার সঙ্গে ঘুরে বেড়াত।
ঈশ্বর রাফায়েলকে ডেকে বললেন, তুমি হয়ত শুনেছ শয়তানদের রাজা অন্ধকার নরকপ্রদেশ থেকে পালিয়ে শূন্যপথে স্বর্গে এসে উঠেছে, মর্ত্যে সে বিচরণ করছে। গত রাতে সে সমগ্র মানবজাতির সর্বনাশ সাধনের জন্য আদি মানবপিতা ও মানবতার সুখনিদ্রাকে ব্যাহত করার চেষ্টা করেছিল। তুমি আজ তাদের কাছে গিয়ে আজকের মত কাজ থেকে বিরত হয়ে তাদের বিশ্রাম নিতে বল। তুমি আদমের সঙ্গে বন্ধুভাবে কথা বলবে। কোন এক ছায়াচ্ছন্ন কুঞ্জবনে তাদের কাছে বসবে।
এমনভাবে তার সঙ্গে কথা বলবে যাতে সে বুঝতে পারে তার এই সুখী জীবন সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করছে তার স্বাধীন ইচ্ছার উপরে। সে যেন বুঝতে পারে তার নিজের ইচ্ছাশক্তি স্বাধীন হলেও তা পরিবর্তনযোগ্য। তাকে সাবধান করে দেবে কথাপ্রসঙ্গে সে যেন তার এই স্বাধীন ইচ্ছাকে সতত অবিচলিত ও অপরিবর্তনীয় রাখতে পারে।
