হে দেবদূতোপম সুন্দরী ঈভ, সুখী প্রাণী, তুমিও আমার মত ফল ভক্ষণ করো, যদিও তুমি সুখী, এই ফল ভক্ষণে আরও সুখী হবে। আরও যোগ্য হয়ে উঠবে সবদিক দিয়ে। এই ফল ভক্ষণ করার সঙ্গে সঙ্গে তুমিও দেবতাদের মাঝে এক দেবী হয়ে উঠবে। শুধু মর্ত্যভূমির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে না। তুমি তখন আমাদের মত কখনো শূন্যপথে উড়ে বেড়াতে পারবে, কখনো স্বর্গলোকে উঠতে পারবে। সেখানে উঠে দেখতে পাবে দেবতারা স্বর্গে কি ধরনের জীবন যাপন করে। তুমিও তাদের মতোই স্বর্গীয় সুষমায় পূর্ণ এক দৈব জীবন যাপন করতে পারবে।
এই বলে সে আমাকে ধরে টেনে নিয়ে আমার মুখের উপর সেই ফলের এক অংশ তুলে ধরল। জ্ঞানবৃক্ষ হতে সে ফলটি তুলে সে খাচ্ছিল তখন। সেই ফলের সুমধুর গন্ধে আমার মধ্যে এমনই ক্ষুধার উদ্রেক হলো যে আমি তা না খেয়ে পারলাম না। সে ফলের রস আস্বাদন করার মুহূর্তমধ্যে সেই মূর্তির সঙ্গে আমি মেঘের উপর উঠে পড়লাম। তার তলদেশে দেখলাম অন্তহীন বৈচিত্র্যে প্রসারিত হয়ে আছে এই মহাপৃথিবী। আমার এই আকস্মিক পরিবন ও সমুন্নতি দেখে আমার সেই পথপ্রদর্শক সহসা অন্তর্হিত হয়ে গেল কোথায়। আমার তখন মনে হলো আমি যেন পড়ে যাচ্ছি। সঙ্গে সঙ্গে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম।
তারপর জেগে উঠে যখন বুঝলাম সবই স্বপ্ন তখন আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে কত আনন্দ পেলাম।
এইভাবে ঈভ তার গতরাত্রির অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করলে আদম বলতে লাগল, হে আমার অন্তরের থেকে প্রিয় অর্ধাঙ্গিনী, আমার প্রতিমূর্তি, গতরাত্রিতে নিদ্রাকালে তোমার দেখা দুঃস্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নজনিত ক্লেশ আমাকেও তোমার মত সমানভাবে বিব্রত করে তুলছে। কোন অশুভ শক্তির দ্বারা উৎপন্ন এই কুৎসিত স্বপ্নকে আমিও মেনে নিতে পারছি না। আমার ভয় হচ্ছে। কিন্তু পবিত্রতার মূর্ত প্রতীকরূপে সৃষ্ট তুমি। তোমার মধ্যে তো কোন অশুভ শক্তি স্থান পেতে পারে না। কিন্তু জেনে রেখো, মানুষের আত্মার মধ্যে এমন কতকগুলি হীন অন্তরবৃত্তি আছে যারা যুক্তিকেই তাদের একমাত্র প্রভুরূপে সেবা করে। এই অন্তরবৃত্তিগুলির মধ্যে কল্পনা হচ্ছে প্রধান, যুক্তির পরেই যার স্থান। আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয় বহির্জগতের সকল বস্তুর প্রতিনিধিত্ব করে মনের সঙ্গে তাদের সংযোগসাধন করে, তাদের সাহায্যেই অলীক কল্পনার সৃষ্টি হয় আমাদের মনে। এই কল্পনার সঙ্গে যুক্তিযুক্ত বা নিযুক্ত হয়ে জ্ঞান বা মতামতের সৃষ্টি করে যার দ্বারা আমরা কোন বস্তু বা ঘটনাকে স্বীকার বা অস্বীকার করি।
রাত্রিতে স্তব্ধ অবকাশে মানুষের নিদ্রাকালে তার যুক্তি আর জ্ঞানও বিশ্রামলাভ করে তার গোপন কক্ষে। কিন্তু মাঝে মাঝে সহসা কল্পনা জাগ্রত হয়ে যুক্তি ও জ্ঞানকে জাগ্রত করে স্বপ্নের মধ্যে কতকগুলি অসংগঠিত মূর্তির উদ্ভব ঘটায় এবং উদ্ধত ক্রিয়ার সৃষ্টি করে। স্বপ্নে দেখা অসংলগ্ন অসঙ্গত কথা ও ক্রিয়াসমূহের মধ্যে আমার সুদূর বা অদূরবর্তী অতীতের কথা ও কাজের কিছু সাদৃশ্য খুঁজে পাই ঠিক। কিন্তু তার বাইরেও কিছু অদ্ভুত কথা ও কাজের ব্যাপার থাকে। তথাপি এতে বিষণ্ণ হবার কোন কারণ নেই। কারণ দেবতা বা মানুষের মনের মধ্যে অশুভ শক্তি আসে এবং যায় কিন্তু তা কোন সমর্থন পায় না সে মনে। কোন দোষ বা কলঙ্কের চিহ্ন রেখে যেতে পারে না সে শক্তি। এটাই হচ্ছে আশার কথা আমার পক্ষে।
নিদ্রাকালে স্বপ্নের মধ্যেও যে কাজ করতে তুমি ঘৃণাবোধ করেছিলে, নিশ্চয় সে কাজ করতে চাইবে না তুমি। সুতরাং হতাশ হয়ো না। প্রথম প্রভাতের হাস্যোজ্জ্বল কিরণমালা যখন সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে তখন তোমার যে দৃষ্টি সবচেয়ে আনন্দময় ও প্রশান্ত থাকে সে দৃষ্টিকে বিষাদের কুটিল মেঘের দ্বারা আচ্ছন্ন করে তুলল না। তার থেকে বরং যখন প্রস্ফুটিত কুসুমরাজি তাদের সারারাত্রি সঞ্চিত সুগন্ধিরাশি বনে, প্রান্তরে ও ঝর্ণাধারায় ঢেলে দিচ্ছে তখন আমরা নূতন উদ্যমে চলে গিয়ে কাজ শুরু করি।
এইভাবে তার সুন্দরী স্ত্রীকে উৎফুল্ল করে তোলার চেষ্টা করল আদম। ঈভও তাতে কিছুটা উৎফুল্ল হলো। কিন্তু নিঃশব্দে একটি করে শান্ত অশ্রুবিন্দু ঝরে পড়ল তার দুচোখ থেকে এবং সে তার আলম্বিত কেশপাশ দিয়ে তা মুছে ফেলল সঙ্গে সঙ্গে।
আরো দুটি স্ফটিকস্বচ্ছ অশ্রুবিন্দু ঝরে পড়ার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল ঈভের চোখে। কিন্তু তারা ঝরে পড়ার আগেই এক মধুর সমবেদনার প্রতীকচিহ্ন হিসাবে এক নিবিড় চুম্বনের দ্বারা আদম মুছে দিল সে অশ্রুবিন্দুটিকে।
এইভাবে সকল দুঃস্বপ্নজনিত সকল দুশ্চিন্তার অবসান ঘটল। তারা তাড়াতাড়ি মাঠে কাজ করতে চলে গেল। কিন্তু কাজ শুরু করার আগে তারা ছায়াচ্ছন্ন কুঞ্জবন হতে নবোদিত সূর্যের শিশিরসিক্ত আলোয় এসে দাঁড়িয়েই প্রথমে তারা নত হয়ে স্বতস্ফূর্ত উচ্চারণে গদ্যে ও পদ্যে মিলিয়ে প্রভাতের স্তোত্ৰগান শুরু করল। এক আধ্যাত্মিক আবেগের আতিশয্যে তাদের কণ্ঠ হতে স্বতস্ফূর্তভাবে নিঃসৃত সেই প্রার্থনাসঙ্গীত বীণা বা কোন বাদ্যযন্ত্রসহযোগে গীত না হলেও কিছুমাত্র ক্ষুণ্ণ হয়নি তার মাধুর্য।
পরমস্রষ্টার উদ্দেশ্যে উচ্চারিত সেই স্তোত্ৰগানে তারা বলল, হে পরম মঙ্গলময়, সর্বশক্তিমান, এইসব সুন্দর বস্তুরাজিই তোমার গৌরবময় সৃষ্টি, এই হলো তোমার বিশ্বব্যাপী রূপ। তোমার সৃষ্টি এইসব বস্তু যদি এত সুন্দর ও বিস্ময়কর হয় তাহলে তুমি নিজে কত না সুন্দর ও বিস্ময়কর।
