শয়তানরাজ তা দেখেই নিজের অবস্থার কথা বুঝতে পেরে সেই মুহূর্তেই ক্ষোভের সঙ্গে বিড়বিড় করে কি বলতে বলতে পালিয়ে গেল স্বর্গলোক থেকে। তার সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্হিত হলো রাত্রির অন্ধকার।
০৪র্থ সর্গ
চতুর্থ সর্গ
রাত্রিশেষে গোলাপী আলোর আভা পূর্বাকাশে ফুটে উঠতেই ঘুম থেকে জেগে উঠল আদম। প্রতিদিন এই সময়েই ওঠে সে। প্রতিদিন সকালে মৃদু বাতাসে গাছের পাতাগুলো যখন পতপত্ শব্দ করতে থাকে, যখন সকালের আলো আকাশ থেকে মুক্তোর মত ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে, যখন নদী ও ঝর্ণার জলধারাগুলি বয়ে যেতে থাকে কলকল শব্দে, যখন গাছের শাখায় শাখায় পাখিরা গান গাইতে থাকে তখনি ঘুম থেকে জেগে ওঠে আদম। তার সঙ্গে সঙ্গে ঈভও জেগে ওঠে।
কিন্তু সেদিন উঠে এক বিরল ব্যতিক্রম দেখল ঈভের জীবনে। দেখল, ঈভ তখনো ওঠেনি ঘুম থেকে। তার বিস্ত কেশপাশ মাথার চারদিকে ছড়িয়ে আছে। তার নিটোল মসৃণ গালদুটো কচক করছিল। তাকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল রাত্রিতে তার ভাল ঘুম হয়নি বলেই সে এখনো ঘুমোচ্ছে।
আদম তখন ঘুমন্ত ঈভের উপর ঝুঁকে পড়ে দাম্পত্য প্রেমের মাধুর্যমণ্ডিত দৃষ্টিতে তার পানে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে গেল তার সরল স্বাভাবিক সৌন্দর্যে। ঘুমন্ত বা জাগ্রত অবস্থায় সকল সময়ে একই সুষমার দ্যুতি বিকীরণ করে।
আদম এবার জেফাইরাস যেমন একদিন ফ্লোরাকে ডেকেছিল মৃদুস্বরে ঈভের কোমল হাতটি স্পর্শ করে সেও ডাকলো, হে আমার সুন্দরী প্রিয়তমা, আমার প্রিয়তমা পত্নী ওঠ, জাগো। তুমি ঈশ্বরের সর্বোত্তম দান, আমার আনন্দপ্রতিমা। তুমি জাগো, ওঠ, প্রভাতসূর্য নবীন কিরণ জাল বিস্তার করছেন। সজীব শস্যক্ষেত্র আমাদের ডাকছে। এখন না গেলে কিভাবে আমাদের রোপিত চারাগাছগুলি বেড়ে উঠছে, কিভাবে বাতাসে কুঞ্জবনগুলি কঁপছে, কিভাবে প্রকৃতির বিচিত্র বর্ণে পাহাড় কাঁপছে, পর্বত, বন, প্রান্তর, সব কিছুকে রঞ্জিত করে দিয়েছে, কেমন করে মধুমক্ষিকাগুলি প্রস্ফুটিত ফুলের উপর বসে তার থেকে নির্যাস বার করে তা পান করছে–তা আমরা দেখতে পাব না।
এইভাবে ঈভের কানে কানে মৃদুস্বরে কথা বলে তাকে জাগিয়ে তুলল। জেগে উঠেই ঈভ আদমের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠে তাকে আলিঙ্গন করে বলল, হে আমার সকল গৌরবের একমাত্র বস্তু, আমার সকল পূর্ণতার মূর্ত প্রতীক, তোমার মধ্যেই আমার সকল চিন্তা-ভাবনা কেন্দ্রীভূত। প্রভাতের আলোয় তোমাকে প্রথম দেখে আনন্দিত হলাম। গতরাত্রির মত ভয়ঙ্কর রাত্রি জীবনে কখনো যাপন করিনি আমি।
গতরাত্রে আমি এমন এক আশ্চর্য স্বপ্ন দেখেছি যে স্বপ্ন আমি আর কখনো দেখিনি। সাধারণত তোমারই স্বপ্ন দেখি, সারাদিনের কাজের স্বপ্ন, অথবা পরবর্তী দিনের কাজের পরিকল্পনার স্বপ্ন। গতরাতে আমি দেখেছি যত সব বিপজ্জনক অপরাধজনক কামনা-বাসনার স্বপ্ন, যার কথা এর আগে আর কোনদিন মনে আসেনি আমার।
আমি স্বপ্নে দেখলাম কে যেন আমার কানে কানে মৃদুস্বরে তার সঙ্গে হাঁটতে বলছে। আমি ভাবলাম তুমি। সে বলল, কেন ঘুমোচ্ছ ঈভ, শান্ত স্তব্ধ রাত্রির মনোরম
অবকাশে যখন পূর্ণচন্দ্রের আলো বনচ্ছায়ার জালগুলিকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে প্রতিভাত করে তুলছে বিভিন্ন বস্তুর মুখগুলিকে, যখন রাতের পাখিরা ঢেলে দিচ্ছে সুমধুর প্রেমসঙ্গীতের ধারা, তখন কেউ যদি এসব না দেখে তাহলে ঈশ্বরের জাগ্রত দৃষ্টি তোমাকে ছাড়া আর কাকে দেখতে পাবে? হে প্রকৃতির কামনার বস্তু, তুমি ছাড়া আর কাকে সকল জীব দেখবে, আর কাকে দেখে এত আনন্দ পাবে?
তুমি ডাকছ ভেবে আমি উঠে পড়ি, কিন্তু তোমাকে দেখতে না পেয়ে তোমাকে দেখার জন্য হাঁটতে শুরু করি। আমার তখন মনে হচ্ছিল আমি একাই হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটতে এমন একটি পথ ধরলাম যে পথ আমাকে সেই জ্ঞানবৃক্ষের কাছে। নিয়ে গেল।
দিনেতে যেমন দেখি তার থেকেও তখন সুন্দর লাগছিল গাছটিকে। আমি যখন দেখছিলাম ঠিক সেই সময় স্বর্গের দেবদূতের মত পাখাওয়ালা এক মূর্তি যাকে আমরা প্রায়ই দেখতে পাই এবং যার শিশিরসিক্ত কেশপাশ থেকে অমৃতের মধু ঝরে পড়ছিল, সেই জ্ঞানবৃক্ষের তলায় দাঁড়িয়ে সেও গাছটির দিকে তাকিয়ে ছিল। সে বলতে লাগল, হে সুন্দরী ফলবতী বৃক্ষ, তুমি কাউকে কখনো তোমার ফল আস্বাদন করতে দাও না। কাউকে দান করো না তোমার ফল। দেবতা বা মানুষ কাউকে না। জ্ঞান কি এতই তুচ্ছ যে তা লাভ করার উপযুক্ত নয় অথবা তা কি এতই মূল্যবান যে তা সকলের জন্য নয়? অথবা এ বৃক্ষের স্রষ্টা কি ঈর্ষাবশত অন্যের জন্য এর ফলকে নিষিদ্ধ করে রেখেছেন? কিন্তু যেই তা নিষিদ্ধ করে রাখুক, আমাকে আর কেউ তোমার এই প্রসারিত বাহুবিধৃত ফল থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারবে না।
এই বলে সে তার দুঃসাহসী হাতদুটি বাড়িয়ে সেই জ্ঞানবৃক্ষ হতে ফল তুলে খেতে লাগল।
তার এই অসমসাহসিক কথা ও কাজ দেখে ভয়ে হিমশীতল হয়ে উঠল আমার দেহ।
কিন্তু সে তখন আনন্দে উল্লসিত হয়ে বলতে লাগল আবার, হে স্বর্গীয় ফল, তুমি এমনিতেই মধুর, কিন্তু তুমি নিষিদ্ধ বলে তোমাকে এইভাবে গোপনে তুলে খেতে আরও মধুর মনে হচ্ছে। মনে হয় তুমি যেন শুধু দেবতারই ভক্ষণযোগ্য, তবু তোমার এ ফল ভক্ষণ করলে মানুষও দেবতা হয়ে উঠতে পারে। আর মানুষরাই বা ভক্ষণ করবে না কেন? জ্ঞানের মত ভাল জিনিস যতই প্রচারিত হয় ততই ভাল, সে ফল যত বেশি উৎপন্ন হয় ততই ভাল, তাতে তার স্রষ্টা ঈশ্বরের গৌরবহানি হয় না কিছুমাত্র। বরং তাতে বেড়ে যায় তার গৌরব ও সম্মান।
