তখন শয়তানরাজ আরও কঠোরভাবে কুটি করে বলল, হে অপমানকারী দেবদূত, আমার সহ্যশক্তি কারো থেকে কম নয়, যন্ত্রণার ভয়ে ভীত বা কাতরও নই আমি। তুমি জান আমার শক্তি কতখানি। তুমি দেখেছ একদিন যুদ্ধের মাঝে কেমন ভয়ঙ্কর ও অবিচলভাবে দাঁড়িয়ে সাহায্য করেছিলাম তোমাকে। যে বজ্রগর্জন শুনে ও বজ্রাগ্নি দেখে ভয় পেয়ে সবাই পালিয়ে যায় আমি তাতে ভয় পাইনি। কোন বর্শাফলক ভীত করতে পারেনি আমাকে। আমি ছিলাম নির্ভীক এবং দুর্জয়। তুমি সেকথা জেনেও জানার ভান করছ।
আমি কিন্তু আজও তেমনি নির্ভীক আছি। তাই আমি নতুন কোন আশ্রয়ের সন্ধানে কোন অনুচরকে না পাঠিয়ে নিজে অজানার পথে শূন্যে ঝাঁপ দিই। নিজে কোন বিপদের ঝুঁকি না নিয়ে বসে থেকে আমার অধীনস্থ কারো উপর বিপদের বোঝা চাপিয়ে দিইনি। তাহলে দেখছ, নেতা হিসাবে আমি কতখানি বিশ্বস্ত।
ঈশ্বরের সৃষ্ট এই নতুন জগতে আমাদের নতুন বাসভূমি গড়ে তুলতে চাই আমি। আমার বিপর্যস্ত শক্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চাই এই পৃথিবীতে। তারই সন্ধানে এসেছি আমি। এই মর্ত্যভূমি অথবা স্বর্গ ও মর্ত্যের মাঝখানে কোন শূন্যলোকে কোন বাসভূমি গড়ে তোলা যায় কিনা তাও দেখব আমি। কিন্তু এ জগতের দখলাধিকার বিনা যুদ্ধে পাব না আমি। তবে তোমাদের কাজ তো শুধু ঈশ্বরের সিংহাসনের চারপাশে দাঁড়িয়ে ঈশ্বরের স্তোত্ৰগান করা। ঈশ্বরের জয়গান গাওয়াই হলো তোমাদের কাজ। যুদ্ধ করা তো তোমাদের কাজ নয়।
তা শুনে দেবদূতসেনা গ্যাব্রিয়েল বলল, কি করে একটা কথা বলে পরমুহূর্তেই তা অস্বীকার করো তুমি? প্রথমে তুমি বললে দুঃসহ নরকযন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরেই পালিয়ে এসেছ তুমি, আবার পরমুহূর্তেই বললে সব বিপদের ঝুঁকি নিয়ে এক বিশ্বস্ত নেতা হিসাবে নতুন বাসভূমির সন্ধানে এখানে এসেছ এবং কোন যন্ত্রণার ভয়ে ভীত বা নত নও তুমি। কোন নেতার মুখে কখনো এ কথা শোভা পায় না। কোন নেতা এমন কথা বলে না। মিথ্যাবাদীরাই এমন কথা বলে।
শয়তান, তুমি আর যাই বল, ‘বিশ্বস্ততার কথা তুলে বিশ্বস্ততা’ নামক শব্দকে কলুষিত করো না। তুমি বিশ্বস্ত কার কাছে? মোর বিদ্রোহী অনুচরবৃন্দের কাছে। একদল শয়তান যাদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত শুধু শয়তানিতে ভরা, তাদের কাছে তোমার সমস্ত শৃংখলাবোধ ও বিশ্বস্ততা সীমাবদ্ধ। যিনি পরম ঈশ্বর, সর্বস্বীকৃত সর্ববন্দিত পরম শক্তি তাঁর প্রতি তোমার সমস্ত সামরিক আনুগত্য ও বিশ্বস্ততা নস্যাৎ করে তুমি সেই ধর্মভ্রষ্ট, নীতিভ্রষ্ট শয়তাদের কাছে শুধু বিশ্বস্ত? এক সুচতুর ভণ্ডরূপে তুমি আজ মুক্তির দূত হতে চাইছ, অথচ তুমিই একদিন স্বর্গের রাজার কাছে ক্রীতদাসের মত তাঁর প্রতি অনুরক্ত ছিলে এবং তাঁর পদলেহন করতে। তবে কি সেই স্বর্গাধিপতিকে সিংহাসনচ্যুত করে নিজে স্বর্গে রাজত্ব করার জন্যই তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলে?
সে যাই হোক, এখন আমার কথা শোন, দূর হয়ে যাও এখান থেকে। যেখান থেকে পালিয়ে এসেছ সেখানেই উড়ে চলে যাও। এই মুহূর্তে যদি তুমি এখান থেকে চলে না যাও, যদি তোমাকে স্বর্গের এই পবিত্র সীমানার মধ্যে দেখতে পাই তাহলে তোমাকে শৃংখলে আবদ্ধ করে টানতে টানতে আমি নরকের কারাগারে দিয়ে আসব। সে কারাগারের দ্বার এমন কঠোরভাবে রুদ্ধ করে আসব যে আর তুমি কোনদিন সে দ্বার ভেঙে কোথাও পালাতে পারবে না।
এইভাবে শয়তানরাজকে ভীতি প্রদর্শন করল গ্যাব্রিয়েল। কিন্তু শয়তান তাতে কর্ণপাত করল না। সে আরও ক্রুদ্ধ হয়ে বলল, হে চেরাব নামে সীমান্তরক্ষী যদিও দেবদূত, যদিও তুমি আমাকে তোমার বন্দী ভেবে শৃংখলাবদ্ধ করার ভয় দেখাচ্ছ। কিন্তু তাহলে জেনে রেখো, তার থেকেও ভারী আমার লৌহকঠিন বাহুর চাপ সহ্য করতে হবে তোমায়, যদিও স্বর্গের রাজা তোমার পাখার উপর চড়ে গমনাগমন করেন এবং যদিও অন্যান্য দেবদূতদের সঙ্গে তোমাকে স্বর্গের নক্ষত্রখচিত পথের উপর দিয়ে স্বর্গরাজ্যের রথচক্র টেনে নিয়ে যেতে হয়।
শয়তান যখন এইসব বলছিল তখন দেবদূত সেনারা তাদের অস্ত্র শানিয়ে ও বর্শা উঁচিয়ে শয়তানের দিকে এগিয়ে এল। তাদের সামনে নির্ভীক অবস্থায় মনের সমস্ত শক্তি সংহত করে আটনাস পর্বতের মত দাঁড়িয়ে রইল শয়তানরাজ। তার হাতেও ছিল বর্শা এবং বাণ।
সে সময় উভয়পক্ষে যদি যুদ্ধ হত তাহলে হয়ত ধ্বংসের তাণ্ডব নেমে আসত সমগ্র স্বর্গলোকে। সব কিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে যেত।
এমন সময় ঈশ্বর একটি দাঁড়িপাল্লা নিয়ে শয়তানের ভাগ্য নির্ধারণ করার জন্য দুদিকে নিক্তি ঝুলিয়ে দাঁড়িপাল্লা ধরে বসলেন। দুটি নিক্তির একটিতে ছিল শয়তানের ভাগ্য আর ভবিষ্যৎ আর একটিতে ছিল স্বর্গের ভাগ্য।
এখন দেখা গেল শয়তানের ভাগ্যের নিক্তিটি হাল্কা হয়ে উঠে গেল অনেকটা।
গ্যাব্রিয়েল ঊর্ধ্বে তাকিয়ে তা দেখে শয়তানকে বলল, শয়তান, আমি জানি তোমার শক্তি কতখানি এবং তুমিও জান আমার শক্তি কতদূর। সুতরাং আর অস্ত্র নিয়ে আস্ফালন করে লাভ কি? কারণ আমাদের সকল শক্তিই ঈশ্বরের অধীন। তিনি ইচ্ছা করলে আমাদের সকল শক্তির উচ্ছ্বাসকে স্তব্ধ করে দিতে পারেন মুহূর্তে। যদি একবার প্রমাণ চাও তাহলে ঊর্ধ্বে তাকিয়ে দেখ। দেখ ঈশ্বরের দ্বারা বিধৃত দাঁড়িপাল্লায় তোমার ভাগ্যের দিকটি কত হাল্কা, কতখানি তা উপরে উঠে গেছে। তুমি বাধা দিতে চেষ্টা করলেও আসলে তোমার প্রভুত্বশক্তি কত কম।
