সে বলল, লড়াই যদি করতে হয় তাহলে সামনে সামনে করাই ভাল। যে তোমাদের পাঠিয়েছে আমার যা কিছু বাদ-প্রতিবাদ হবে তার সঙ্গে, প্রেরিত তোমাদের সঙ্গে নয়। তাতে হয় অধিকতর গৌরব অর্জন করব অথবা অধিকতর ক্ষতিকে বরণ করে নেব।
জেফন তখন বলল, যদি তুমি আমাদের সঙ্গে যাও তাহলে আমাদের এই অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির জন্য বিচারের সম্মুখীন হতে হবে না। আর যদি না যাও তাহলে তুমি যত বড়ই দুবৃত্ত হও তোমার সঙ্গে আমাদের অবশ্যই যুদ্ধে প্রবৃত্ত হতে হবে।
আর কোন কথা বলল না শয়তানরাজ। রাগের আবেগে এমনই অভিভূত হয়ে পড়েছিল যে কোন বাক্যস্ফুর্তি হলো না তার মুখে। বল্লাবিদমিত দর্পিত অশ্বের মত সে উদ্ধতভাবে এগিয়ে চলতে লাগল দেবদূতদ্বয়ের সঙ্গে।
শয়তান বুঝতে পারল, এ অবস্থায় বলপ্রয়োগের চেষ্টা অথবা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা বৃথা। ঊর্ধ্বলোকের ঐশ্বরিক শান্তির ভয় অবদমিত করল তার অন্তরের ক্ষোভকে। এ ছাড়া অন্য কোন ভয় তার ছিল না।
ক্রমে তারা পশ্চিম প্রান্তে এসে উপনীত হলো। প্রহরারত দেবদূত বাহিনী তাদের দেখতে পেয়ে ঘিরে দাঁড়াল। তাদের কর্তব্যকর্ম সম্বন্ধে নির্দেশের অপেক্ষা করতে লাগল।
তখন তাদের প্রধান গ্যাব্রিয়েল তাদের বলল, বন্ধুগণ, আমি এই পথে কাদের। পদশব্দ শুনে চকিত হয়ে দেখি ইথুরিয়ের ও জেফনের সঙ্গে তৃতীয় এক ব্যক্তি আসছে। সে ব্যক্তির মধ্যে কোন স্বর্গীয় দ্যুতি নেই, তার ভয়ঙ্কর আচরণ থেকে বোঝা যাচ্ছে। সে নরকপ্রদেশের উদ্ধত রাজা! তার চোখের দৃষ্টির মধ্যে প্রকটিত ঔদ্ধত্যের ভাব থেকে বেশ বোঝা যাচ্ছে বিনা যুদ্ধে যাবে না সে এখান থেকে। সুতরাং প্রস্তুত হয়ে দাঁড়াও।
গ্যাব্রিয়েলের কথা শেষ হতে না হতেই ইথুরিয়েল ও জেফন শয়তানকে ধরে এনে বলল কাকে তারা এবং কিজন্য ধরে এনেছে এখানে, কিভাবে তারা দেখতে পায় তাকে এবং কিভাবে সে এক সাপের রূপ ধারণ করে ঘুমন্ত ঈভের কানে কানে কি বলছিল।
গ্যাব্রিয়েল তখন কঠোর ভাষায় শয়তানরাজকে বলতে লাগল, হে শয়তানরাজ, কেন তুমি নরকপ্রদেশের নির্ধারিত সীমানা লঙঘন করে এখানে প্রহরারত দেবদূতদের বিব্রত করতে এসেছ? স্বর্গলোকের সীমানার মধ্যে তোমার এই অবৈধ ও উদ্ধত প্রবেশ সম্পর্কে তোমার কাছ থেকে জবাবদিহি চাইবার অধিকার এবং ক্ষমতা আমাদের আছে। ঈশ্বরের বিধানে এখানে যারা সুখনিদ্রায় অভিভূত আছে তাদের নিদ্রাভঙ্গের কাজে ব্যাপৃত দেখেছে তোমাকে প্রহরীরা। তোমার এই ন্যায়নীতি লঙ্ঘনের কাজকে যে কেউ সমর্থন করবে না এখানে তা কি জান না তুমি?
একথা শুনে ঘৃণায় তার ভ্রুযুগল কুঞ্চিত করে শয়তান বলল, গ্যাব্রিয়েল, স্বর্গে তোমাকে জ্ঞানী বলে সবাই শ্রদ্ধা করে। আমিও এতদিন তাই করতাম। কিন্তু তোমার এই প্রশ্ন সংশয়ান্বিত করে তুলেছে আজ আমার সেই ধারণাকে। এমন কেউ কি কোথাও আছে যে অন্তহীন সীমা-পরিসীমাহীন যন্ত্রণা ও বেদনাকে ভালবাসে? আর যদি তুমি আমার এই অবস্থার মধ্যে পড়তে তাহলে তুমিও আমার মত সব ন্যায়-নীতি লঙঘন করে সেই যন্ত্রণার হাত থেকে মুক্তিলাভের আশায় এমন এক দূরবর্তী স্থানের সন্ধান করতে যেখানে সমস্ত পীড়ন ও যন্ত্রণা পরিণত হবে আরাম আর স্বাচ্ছন্দ্যে। যেখানে সমস্ত দুঃসহ দুঃখক্লেশ পরিণত হয়ে উঠবে এক নিবিড়তম সুখানুভূতিতে। জানবে আমিও সেই সুখের সন্ধানেই এসেছি এখানে। তোমার মধ্যে আছে শুধু ভাল-মন্দের এক অন্ধবোধ, নেই কোন যুক্তিবোধ। কোন মন্দ বা অশুভ অবস্থার মধ্যে, কোন দুঃখকষ্টের মধ্যে জীবনে পড়নি তুমি।
বল, তুমি কি আমাদের এই অসহনীয় কারাবাস সম্বন্ধে সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে? পারবে না। বরং সেই নরকের লৌহদ্বারগুলিকে আরও দৃঢ়ভাবে রুদ্ধ করতে বলবে, যদি তিনি সেখানে আমাদের অবস্থানকে দীর্ঘায়িত করতে চান। এরা আমাকে যেখানে এবং যা করতে দেখেছে তা সত্য। তোমার প্রশ্নের উত্তরে আমি শুধু এই কথাই বলতে চাই। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমি কোন ক্ষতি করেছি বা করতে চেয়েছি।
শয়তানের কথা শেষ হলে যোদ্ধাবেশে গ্যাব্রিয়েল মুখে কিছুটা হাসি ফুটিয়ে ঘৃণার সঙ্গে বলল, যে স্বর্গচ্যুত সে কিনা জ্ঞানীর মত বিচার করছে। যে নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য নরকে নিক্ষিপ্ত ও নির্বাসিত হয় সে সেই নরকের কারাগার থেকে কোন্ সাহসে পালিয়ে এসেছে এখানে তাকে তা জিজ্ঞাসা করায় আমাদের জ্ঞানের বিচার করছে। তার নির্বাসনদণ্ড অমান্য করে বিনা ছাড়পত্রে নরক থেকে ও নাকি যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে পালিয়ে আসাটাকে ও জ্ঞানের পরিচায়ক হিসাবে প্রচার করছে। এইভাবে ও বিধিনির্ধারিত শাস্তিকে পরিহার করে এসেছে জোর করে।
হে দুঃসাহসী বীর, ঠিক আছে, বিচার করে যাও আমাদের। তারপর দেখবে তোমার এই পালিয়ে আসার জন্য দণ্ডদাতার রোষ সাতগুণ হয়ে উঠছে। তোমার নরকবাসের যন্ত্রণা যত তীব্ৰই হোক তাঁর রোষের সমান হতে পারবে না তা কখনো। তাঁর রোষকশায়িত দণ্ড আবার তোমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে নরকে।
কিন্তু তুমি একা কেন? তোমার নরকবাসী সঙ্গীরা কি নরকের কারাগার ভেঙে পালিয়ে আসেনি? তাদের কাছে কি নরকযন্ত্রণা কম অনুভূত হয়? তাই কি তারা পালিয়ে আসেনি? অথবা তাদের থেকে তোমার সহ্যশক্তি কম? হে সাহসী শয়তানরাজ, যদি তুমি তোমার এই পালিয়ে আসার কারণ তোমার সেই নির্বাসিত অনুচরদের বলতে তাহলে তারা তোমাকে একা আসতে দিত না এখানে। তারাও সকলে নরকযন্ত্রণা হতে মুক্তিলাভের আশায় পালিয়ে আসত এখানে।
