এই পবিত্র দাম্পত্য প্রেম কখনো সুবর্ণ বাণ নিক্ষেপ করে, কোথাও তার স্থিরোজ্জ্বল প্রদীপটি জ্বালিয়ে দেয়। কখনো বা নীল পাখা মেলে কল্পনার আকাশে উড়ে চলে। এই দাম্পত্য প্রেমের শুচিতা ও বিশ্বস্ততা কখনো অর্থলোলুপ ব্যভিচারিণী রমণীদের কৃত্রিম হাসিতে অথবা চটুল নৃত্যগীত ও তরল আমোদ-প্রমোদে প্রমত্তচিত্ত অভিজাত সমাজের নর-নারীদের মধ্যে পাওয়া যায় না। অথবা কোন ক্ষুধার্ত প্রেমিকা তার গর্বিত প্রেমিকের কাছে যে গান গায় সেই গানের প্রাণহীন সুরের মধ্যেও প্রেমের কোন শুচিতা আশা করা যায় না।
এই পবিত্র দাম্পত্য প্রেমে চিরবিশ্বস্ত আমাদের আদি পিতামাতা আদম ও ঈভ পরস্পর নগ্ন ও আলিঙ্গনাবদ্ধ অবস্থায় সেই নিভৃত কুঞ্জবনের মধ্যে তৃণশয্যায় শয়ন করে নাইটিঙ্গেল পাখির গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়লেন। কুঞ্জগৃহের কুসুমাস্তীর্ণ চন্দ্রাতপ হতে গোলাপ ঝরে পড়তে লাগল।
হে দম্পতিযুগল, তোমরা সুখে নিদ্রা যাও। তোমরা যে পরম সুখে সুখী তার থেকে বেশি সুখ আর চেও না। তোমরা যা জান তার থেকে আর বেশি কিছু জানতে চেও না।
রাত্রির প্রহর তখন অতীতপ্রায়। চন্দ্র সবেমাত্র আকাশস্থ তার যাত্রাপথ অর্ধাংশ। পরিক্রমা করেছে। এমন সময় নৈশ প্রহরায় নিযুক্ত চেরাবিম জাতীয় দেবদুতেরা যুদ্ধের বেশে এসে নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়াল।
গ্যাব্রিয়েল তার পাশের আর এক দেবদূতকে বলল, শোন উজ্জীয়েল, তোমাদের দলের অর্ধেক সংখ্যক দেবদূত দক্ষিণ প্রান্তে প্রহরা দিক। আর একদল উত্তর দিকে প্রহরা দিতে থাক। আমাদের দল থাকবে পশ্চিম দিকে।
সঙ্গে সঙ্গে দেবদূতরা বাণ, বর্শা প্রভৃতি অস্ত্র হাতে এক একটি অগ্নিশিখার মত চলে গেল। এরপর ইথুরিয়েল ও জেফন নামে দুজন বলিষ্ঠ দেবদূতকে ডাকল গ্যাব্রিয়েল।
তাদের উপর এক কার্যভার দিয়ে বলল, ইথুরিয়েল ও জেফন, তোমরা তোমাদের পাখায় ভর দিয়ে উড়ে সারা উদ্যানটা খুঁজে দেখ। কোন জায়গা বাদ রাখবে না। বিশেষ করে যেখানে দুজন মানব-মানবী নিশ্চিন্ত নিদ্রায় অভিভূত হয়ে আছে। আজ বিকালে সূর্যের অস্তগমনকালে নরকের কোনও এক শয়তান নরকের কারাগার থেকে অসদুদ্দেশ্যে পালিয়ে এখানে উঠে এসেছে। সে কোথায় লুকিয়ে আছে খুঁজে বার করো। তাকে ধরে নিয়ে এস এখানে।
এই বলে গ্যাব্রিয়েল তার জ্যোতির্ময় মূর্তিতে চন্দ্রের উজ্জ্বলতাকে ম্লান করে তার নিজের কাজে চলে গেল। অন্য দুজন দেবদূত শয়তানের সন্ধানে কুঞ্জবনের দিকে চলে গেল। কুঞ্জবনে তারা গিয়ে দেখল সেই পলাতক শয়তান এক সাপের রূপ ধরে ঈভের কানে কানে কি বলছে। এইভাবে শয়তান এক হীন অপকৌশলের দ্বারা ঈভের কল্পনাকে নাড়া দিয়ে তার মধ্যে যত সব ভ্রান্ত আশা ও স্বপ্ন সঞ্চারিত করার চেষ্টা করছে। এক অবৈধ ও নীতিবিগর্হিত অভিলাষের বিষ তার কানের মধ্যে ঢেলে তার জৈব সত্তার মধ্যে প্রবাহিত বিশুদ্ধ রক্তের ধারাকে কলুষিত করে দিচ্ছে। এইভাবে ঈভের মধ্যে ঘুমের ঘোরে জাগল কতকগুলি বিক্ষুব্ধ চিন্তা। জাগল ব্যর্থ আশা, ব্যর্থ লক্ষ্য, অসঙ্গত কামনা-বাসনা আর এক মিথ্যা আহঙ্কার আর আত্মম্ভরিতার ঊর্ধ্বচাপ।
ইথুরিয়েল তখন তার বর্শা দিয়ে শয়তানকে মৃদুভাবে স্পর্শ করল। কোন মিথ্যা বা মিথ্যাবাদী স্বর্গের রোষকশায়িত স্পর্শ সহ্য করতে পারে না।
শয়তান বিস্ময়ে চমকিত হয়ে উঠে দাঁড়াল ব্যস্ত হয়ে। নাইগ্রীস পাউডারের স্থূপে কোন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ পড়লে বারুদের স্পর্শে যেমন আগুন জ্বলে ওঠে, তেমনি শয়তান ক্রোধে জ্বলে উঠে তার আসল মূর্তি পরিগ্রহ করে দেবদূত দুজনের সামনে এগিয়ে গেল। দেবদূতদ্বয়ও অকস্মাৎ নরকের শয়তানরাজকে স্বর্গলোকের উদ্যানে দেখে বেশকিছুটা বিস্মিত না হয়ে পারল না।
তবু তারা কোনরূপ ভয় না পেয়ে অবিচলিতচিত্তে শয়তানরাজকে বলতে লাগল, নরকে নির্বাসিত কোন বিদ্রোহী আত্মা, তুমি নরকের কারাগার ভেঙে এখানে পালিয়ে এসে ছদ্মরূপ ধারণ করে প্রাচীর লঙ্ঘনকারী তস্করের মত এখানে সুখনিদ্রায় অভিভূত দুজনের মাথার কাছে বসে কি করছিলে?
শয়তানরাজ তখন ঘৃণাভরে বলল, আমাকে তোমরা জান না? চিনতে পারছ না আমায়? একদিন তোমরা যেখানে উঠতে পারতে না সেই সুউচ্চ গৌরবের আসনে আমি যখন সমাসীন থাকতাম তখন তোমরা আমার সঙ্গে কথা বলতে বা আমার কাছে যেতে সাহস পেতে না। আর আজ কিনা বলছ আমাকে তোমরা চেনই না। আর চিনতে যদি পেরেই থাক তবে বৃথা জিজ্ঞাসা করে কি লাভ?
দেবদূত জেফন তখন ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যুত্তর দিল, হে বিদ্রোহী আত্মা! তুমি যেন ভেবো না, একদিন স্বর্গবাসকালে যে উজ্জ্বল মূর্তিতে অক্ষুণ্ণ গৌরবে প্রতিষ্ঠিত ছিলে, আজও তোমার সেই মূর্তি আছে। তখন তোমার মধ্যে যে ন্যায়পরায়ণতা, সততা ও পবিত্রতা ছিল এখন তা নেই। আজ তুমি সে স্বর্গলোক হতে নির্বাসিত। আজ তোমার পাপ, নারকীয় অন্ধকারের কুটিলতা মূর্ত তোমার মধ্যে। যাই হোক, এখন চল, যিনি আমাকে এই স্থানের প্রতিরক্ষা ও পবিত্রতা রক্ষার কাজে নিযুক্ত করেছেন, যিনি আমাদের এখানে তোমার সন্ধানে পাঠিয়েছেন, তুমি তার কাছে গিয়ে তোমার আসার কারণ ও যাবতীয় বিবরণ দান করবে।
চেরাব জাতীয় সেই দেবদূত এই কথা বলল। তার এই তীব্র ভর্ৎসনা তার যৌবনসমৃদ্ধ চোখমুখকে এক বিশেষ দ্যুতির দ্বারা উজ্জ্বল করে তুলল আরও। অপ্রতিরোধ্য করে তুলল তার ভর্ৎসনার আবেদনটিকে। লজ্জারুণ অবস্থায় দাঁড়িয়ে রইল শয়তানরাজ। সে বুঝতে পারল সততা ও সাধুতার তেজ কত ভয়ানক। দেখল স্বর্গীয় গুণাবলী তার দেহে কত সুন্দরভাবে প্রকটিত। হারানো গৌরবের কথা ভেবে দুঃখে জর্জরিত হয়ে উঠল সে। এক তীব্র অনুশোচনা জাগল তার মধ্যে। তার এই গৌরবহীন হতশ্লান অবস্থায় তার অলক্ষ্যে অজান্তে দেবদূতরা তাকে দেখে ফেলায় লজ্জাভিভূত না হয়ে পারল না সে। তবু সে দমল না কিছুমাত্র। তবু হার মানল না দেবদূতদের কাছে।
