এইসব অদৃশ্য দেবদূতেরা সারা দিন-রাত ঈশ্বরের সৃষ্টিকার্য দেখে তার প্রশংসা করে এবং ঈশ্বরের গুণগান করে। কতবার আমরা গভীর নিশীথে খাড়াই পাহাড়ের উপর অথবা গভীর অরণ্যমাঝে কত দৈব কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হতে শুনেছি। এই কণ্ঠস্বর এক জায়গায় কোথাও ধ্বনিত হলে অন্য এক জায়গায় অন্য এক কণ্ঠস্বর যেন তার প্রত্যুত্তর দেয় এই সব কণ্ঠস্বরগুলি তাদের মহান স্রষ্টা পরমেশ্বরের গৌরবগান করে বেড়ায়। যখন তারা দলে দলে পাহারা দেয়, যখন তারা নৈশপ্রহরায় নিযুক্ত হয়ে রাত্রিকালে ঘুরে ঘুরে বেড়ায় তখন তারা বাদ্যযন্ত্র সহযোগে ঈশ্বরের নামকীর্তন করে। তাদের সেই ভিন্ন ভিন্ন দলগত সঙ্গীতের সুরধারাগুলি এক ঐকতানে মিলিত হয়ে রাত্রির অখণ্ড বিশুদ্ধতাকে খণ্ড খণ্ড করে আমাদের সকল চিন্তাকে ঊর্ধ্বাভিমুখী ও ঈশ্বরাভিমুখী করে তোলে।
এইভাবে কথা বলতে বলতে হাত ধরাধরি করে তাদের পরম আনন্দঘন কুঞ্জমাঝে চলে গেল তারা। পরমস্রষ্টা মানুষের আনন্দ বিধানের জন্য লড়েল ও মাটেল গাছের লতাপাতার ছাদবিশিষ্ট এই কুঞ্জবন নির্মাণ করে দেন। সে কুঞ্জবনের চারিদিকে ছিল সুগন্ধি সুন্দর ফুলে ভরা গাছের বেড়া। সে কুঞ্জের মেঝের উপর ছিল দামী পাথরের পরিবর্তে আইরিস, গোলাপ, যুঁই, ভায়োলেট প্রভৃতি বিভিন্ন রঙের সুগন্ধি ফুলের মেদুর আস্তরণ। কোন পশু-পাখি বা কীটপতঙ্গ মানুষের ভয়ে প্রবেশ করতে পারে না সে কুঞ্জবনে। এর থেকে বেশি নিভৃত নির্জন বা বেশি ছায়াচ্ছন্ন কুঞ্জবনে বনদেবতা প্যান, সিলভানাস বা কোন পরী কখনো ঘুমোয়নি বা বাস করেনি।
ফুল, মালা ও সুগন্ধি ওষধিতে পরিপূর্ণ এই বিস্তৃত কুঞ্জবনের মাঝেই একদিন আদম ও ঈরে প্রথম বাসরশয্যা স্থাপিত হয়। স্বর্গের দেবদূতেরা সেদিন বিবাহের দেবতা হাইমেনের গান গেয়ে নগ্ন সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ ঈভকে বিবাহের নববধূ হিসাবে আদি মানব আদমের হাতে তুলে দেয়। ঈভ ছিল প্যান্ডোরার থেকে বেশি সুন্দরী এবং দেবতারা তাকে বিবিধ অপার্থিব উপহারে ভূষিত করেন। এমনি করে একদিন প্যান্ডোরাকে তার উপহারের বাক্সটাই অগ্নিদেবতা প্রমিথিউসের ভাই এপিমেথিউসকে ছলনার দ্বারা মুগ্ধ করার জন্য এনে দেয়। প্যান্ডোরার সেই উপহারের বাক্স খোলার সঙ্গে সঙ্গে অভিশাপ নেমে আসে মানবজগতের উপর।
আদি মানবপিতা আদম ও আদিমাতা ঈভ সেই বিস্তৃত কুঞ্জমাঝে প্রবেশ করে দুজনেই পঁড়িয়ে রইল। তারপর তারা যে ঈশ্বর যে পরমশ্রষ্টা স্বর্গ-মর্ত্য, জ্যোতির্ময় চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি সৃষ্টি করেছেন সেই ঈশ্বরের বন্দনাগান করতে লাগল। তারা স্তবের মাধ্যমে বলতে লাগল, হে পরমেশ্বর, হে সর্বশক্তিমান, তুমিই এই রাত্রি ও দিন
সৃষ্টি করেছ। সারাদিন আমরা আমাদের নির্দিষ্ট কর্মগুলি যথাযথভাবে পরস্পরের সাহায্যে সম্পন্ন করে আমাদের এই দাম্পত্যশয্যায় বিশ্রামলাভের জন্য এসেছি।
আমাদের এই দাম্পত্য সুখ তোমারই অনুগ্রহে লব্ধ। কিন্তু এই মনোরম স্থান এতই বড় যে অনেক লোক এখানে স্বচ্ছন্দে বাস করতে পারে। আমাদের দুজন থাকার পরও অনেক জায়গা খালি পড়ে থাকে এখানে।
আমাদের দুজনের কাছ থেকে এই প্রতিশ্রুতি লাভ করেছিলে যে আমাদের এই দুজনের মিলন থেকে এমন এক জাতির উদ্ভব হবে যারা সমগ্র মত্যভূমি পরিপূরিত করে থাকবে এবং যারা আমাদের মত জাগ্রত অথবা নিদ্রাকালে ঈশ্বরের অনন্ত মহানুভবতার জন্য গৌরবগান করবে।
এইভাবে তার নৈশ প্রার্থনা শেষ করলেন আদিপিতা আদম এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্মগুলি করলেন। তারপর চারদিকে অকিয়ে দেখলেন কেউ কোথাও নেই। তখন সেই কুঞ্জের ভিতরকার দিকের একটি ঘরে পাশাপাশি দুজনে শুয়ে পড়লেন মুখোমুখি। আদম বা ঈভ কেউ কারও দিকে পিছন ফিরে পাশ ফিরলেন না।
প্রেমের যে রহস্য ভণ্ড প্রেমিকরা ধরতে পারে না, দাম্পত্য প্রেমের যে পবিত্রতা ও শুচিতা তারা রক্ষা করতে পারে না, আমাদের আদি পিতা-মাতা ঈশ্বর নির্দেশিত পথে চলে সেই পবিত্র দাম্পত্য প্রেমের প্রতি ছিলেন একান্তভাবে বিশ্বস্ত ও মনেপ্রাণে শুচিশুদ্ধ।
ঈশ্বর চান এই দাম্পত্য প্রেম হবে সন্তানবৃদ্ধির উৎস। তিনি চান সুসন্তানদের সংখ্যাবৃদ্ধি। শুধু যারা ঈশ্বর ও মানবজাতির শত্ৰু, যারা ঈশ্বরদ্রোহী, দেবদ্রোহী ও মানবদ্রোহী, সেই দেববৈরী ও মানববৈরী ধ্বংসকারীরাই ঈশ্বরের কাছে সম্পূর্ণ অবাঞ্ছিত।
হে রহস্যময় ঐশ্বরিক বিধান দ্বারা বিধৃত দাম্পত্য প্রেম, তুমিই মানব-সন্তান বৃদ্ধির একমাত্র উৎস, স্বর্গ ও মর্ত্যের সকল জীবের তুমিই একমাত্র প্রকৃত উৎপাদনকারী। তোমারই দ্বারা ব্যভিচারী ও অবৈধ কামনা-বাসনাগুলি মানবজাতির মন থেকে বিতাড়িত ও বিদূরিত হয়ে পশুদের জগতে চলে যায়। তুমিই সকল প্রেমের মধ্যে যুক্তিবোধ, সততা, বিশ্বস্ততা, ন্যায়পরায়ণতা, পবিত্রতা প্রভৃতি সদ্গুণগুলি প্রবর্তন করো। তোমারই
সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। তোমার উপর কোন পাপদোষ আরোপ করে বা কোন অন্যায়ে অভিযুক্ত করে তোমাকে এই পবিত্রতম স্থানের অনুপযুক্ত হিসাবে পরিগণিত করতে পারি না আমি। তুমি সকল পারিবারিক সম্পর্কের মাধুর্যের স্থায়ী উৎস।
হে দাম্পত্য প্রেম, তোমার শয্যা চিরনিষ্কলুষ ও চিরপবিত্র। সাধু ব্যক্তিরা ও ধার্মিক পিতারা এই শয্যায় শয়ন করেই সৎপুত্রদের জন্মদান করে থাকেন।
