গ্যাব্রিয়েলের কাছ থেকে এই প্রতিশ্রুতি পেয়ে ইউরিয়েল তার সৌরমণ্ডলের মাঝে চলে গেল। সূর্য তখন আকাশের পূর্বপ্রান্তে ঢলে পড়েছে সারাদিনের কাজ শেষ করে। পশ্চিম প্রান্তে মেঘগুলিকে নীলচে ও সোনালী রঙে রাঙিয়ে দিয়েছে কে যেন।
এবার ধীরে ধীরে নেমে এল নিস্তব্ধ নিঝুম সন্ধ্যা। গোধূলির ধূসর-গম্ভীর আবরণে সব কিছু আচ্ছন্ন হয়ে গেল একেবারে। এক অখণ্ড নীরবতা বিরাজ করতে লাগল চারিদিকে। পশুরা তাদের তৃণশয্যায় শয়ন করল, পাখিরা চলে গেল তাদের আপন আপন বাসায়। একমাত্র নাইটিঙ্গেল সারারাত জেগে জেগে এক প্রেমমধুর গান গেয়ে চলল একটানা। সে গানের সুরে পুলকের জোয়ার জাগল সেই নৈশ নীরবতার বুকে।
সহসা জীবন্ত মুক্তাসন্নিভ এক আভায় উজ্জ্বল হয়ে উঠল সমগ্র আকাশমণ্ডল। সন্ধ্যাতারার পিতা যে হেসপারায়াস নক্ষত্রগুলিকে পরিচালিত করে নিয়ে আসছিল, আকাশে সে হেসপারায়াস উজ্জ্বল হয়ে উঠলে অবগুণ্ঠিত চন্দ্ররাণী উদিত হয়ে তার রজতশুভ্র আলোর আবরণগুলি ছড়িয়ে দিলেন অন্ধকারের উপর।
আদি মানবপিতা আদম তখন ঈভকে বললেন, হে আমার জীবনসঙ্গী, এখন রাত্রিকাল সমাগত। এই কাল সকল জীবেরই বিশ্রামলাভের সময়। চল আমরাও বিশ্রামলাভ করিগে। কারণ শ্রম এবং বিশ্রাম, দিন এবং রাত্রি এক অবিচ্ছিন্ন পারম্পর্যে ঈশ্বরই সৃষ্টি করেছেন। নিদ্রায় শিশিরবিন্দুগুলি নিদ্রার বোঝাভার নিয়ে ঝরে পড়ছে আমাদের চোখের পাতার উপর। অন্যান্য প্রাণীরা কর্মহীন অবস্থায় ঘুরে বেড়ায় বলে তাদের বিশ্রামের প্রয়োজন কম কিন্তু মানুষকে প্রতিদিন দৈহিক বা মানসিক কর্মে ব্যাপৃত থাকতে হয় এবং তাতেই তার গৌরব। তার সকল পথে সকল কাজেই ঈশ্বরকে ভক্তি করে চলে মানুষ। কারণ তার কর্মাকর্মের ভাল-মন্দ দিকগুলি ঈশ্বর বিচার করে দেখেন এবং সেইমত ফলদান করেন। কিন্তু অন্যান্য জীবদের কর্মকর্ম সম্বন্ধে উদাসীন থাকেন তিনি।
আগামীকাল প্রভাতে পূর্বদিকে আলো ফুটে ওঠার আগে ঘুম থেকে উঠতে হবে আমাদের। তারপর কাজে মন দিতে হবে। ঐ ফুলগাছগুলির গোড়া থেকে আগাছা পরিষ্কার করতে হবে। তারপর দুপুরে বিভিন্ন গাছের যে সব শাখাপ্রশাখাগুলি অতিরিক্ত বেড়ে গাছের গোড়ায় দেওয়া সারগুলি খেয়ে ফেলে সেই শাখাপ্রশাখাগুলিকে হেঁটে ফেলতে হবে। কিন্তু এ কাজে আরও লোকের দরকার। শুধু আমাদের দ্বারা সম্ভব নয়। যে সব ফুলের কুঁড়িগুলি গাছ থেকে ঝরে তলায় ছড়িয়ে পড়ে আছে সেগুলোকে পরিষ্কার করতে হবে। যাই হোক, এখন আমরা কিছুই করতে পারব না, কারণ এখন রাত্রিকাল, শুধু বিশ্রামের সময়।
রূপলাবণ্যবতী ঈভ তখন বলল, হে আমার প্রভু ও পরিপালক, তুমি আমাকে যা করার নির্দেশ দেবে, আমি বিনা প্রতিবাদে তাই করব। ঈশ্বরের বিধানই হলো এই। তোমার কাছে ঈশ্বরই আইন, আর আমার আইন তুমি। অধিক না জানতে চাওয়াটাই নারীদের পক্ষে সুখের, এবং প্রশংসার যোগ্য।
তোমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমি সময়ের কথা, ঋতু ও ঋতু পরিবর্তনের কথা সব ভুলে যাই। কী সুন্দর ও শান্ত এই প্রভাতকাল। পাখিদের সুমধুর সঙ্গীতে মধুময় হয়ে উঠেছে এই সকাল। সকালের মনোহর সূর্য এই মনোরম উদ্যানভূমিতে ওষধি, বৃক্ষপত্রে, ফুলে-ফলে পতিত শিশিরবিন্দুর উপর তার পূর্বাচলের আলোক বিকীরণ শিশিরসিক্ত বস্তুগুলিতে সূর্যকিরণ পড়ায় তা চকচক করছে মুক্তার মত। বৃষ্টির পর এই উর্বর ভূমি সুগন্ধি হয়ে ওঠে।
তারপর যখন শান্ত স্তব্ধ সন্ধ্যা নেমে আসে এবং তারপর আসে রাত্রি তখন পাখিগুলি ঘুমিয়ে পড়ে এবং চাঁদ ওঠে। তখন নক্ষত্ররাজি মুক্তার মত আকাশে কিরণ দিতে থাকে। কিন্তু শান্ত সকাল, পাখিদের গান, সূর্যকিরণোজ্জ্বল বৃক্ষরাজি ও ফুল-ফল, মুক্তাসন্নিত শিশিরবিন্দু, বর্ষণোত্তর মাটির সৌরভ, অথবা শান্ত সন্ধ্যা, নিস্তব্ধ রাত্রি, চন্দ্রের আকাশ পরিক্রমা, উজ্জ্বল নক্ষত্র তুমি বিনা আনন্দ দান করতে পারে না। কিন্তু স্বর্গ ও মর্ত্যের সকল জীবই যখন তাদের চক্ষু মুদিত করে ঘুমিয়ে আছে তখন সারারাত ধরে এই চন্দ্র ও এই সব নক্ষত্ররাজি কি কারণে কিরণ দান করে চলেছে?
তখন আমাদের আদিপিতা বললেন, হে ঈশ্বরদুহিতা মানবী, অনন্তগুণসম্পন্না ঈভ, এই সব নৈশ জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর কাজই হল পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে উদয়-অস্তের মাধ্যমে আপন আপন কর্তব্য পালন করা। রাত্রিকালে যদি এরা কিরণ না দেয়, যদি পরিপূর্ণ অন্ধকারের উপর রাত্রির সনাতন অধিকার ফিরে না পায় তাহলে প্রকৃতি ও জীবজগতের সকল প্রাণের আগুন নির্বাপিত হয়ে যাবে। চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি তাদের উজ্জ্বলকিরণের দ্বারা রাত্রিকালে প্রকৃতি ও জীবজগতের সবকিছুকে শুধু আলোকিত করে তোলে না, সেই উত্তপ্ত ও নানাবিধ প্রভাবের দ্বারা তাদের উত্তপ্ত ও অনুপ্রাণিত করে।
রাত্রিকালে মর্ত্যজাত যে সব বস্তুরাজি চন্দ্র ও নক্ষত্রমণ্ডল হতে জ্যোতির যে একটি অংশ পায় তারা সূর্যের পর্যাপ্ত ও পূর্ণায়ত কিরণলাভের জন্য ব্যগ্র হয়ে ওঠে।
যদিও রাত্রি গম্ভীর হলে চন্দ্র ও নক্ষত্রলোক দেখার জন্য কোন মানব জাগ্রত থাকে না, তথাপি সে আলোক বৃথা যায় না। স্বর্গলোকে কখনো নৈশ দর্শক বা চন্দ্রালোক বা নক্ষত্রালোক উপভোগের অভাব হয় না। ঈশ্বর চান তাঁর গৌরবগান বা প্রশংসা। রাত্রিকালে সারা পৃথিবী জুড়ে লক্ষ লক্ষ অদৃশ্য দেবদূত চন্দ্র ও নক্ষত্রমণ্ডলের আলোকমালা উপভোগ করে বেড়ায়। আমরা জাগ্রত বা নিদ্রিত কোন অবস্থাতেই দেখতে পাই না তাদের।
