ঈভ তখন তাকে সাহস করে বলল, আদম, এক জ্বলন্ত পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আমি দুঃখের সঙ্গে জানতে পারলাম, আমি যে সব কথা তোমাকে বলেছিলাম, যে আশ্বাস তোমাকে দিয়েছিলাম তা কত গুরুত্বহীন, ঘটনার আঘাতে তা কত ভ্রান্ত ও দুঃখজনক প্রতিপন্ন হলো! এইসব সত্ত্বেও অর্থাৎ আমি পাপিষ্ঠ, একথা প্রকাশিত হলেও তোমার দ্বারা আমি তোমার প্রেমের আসনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলাম। আমি কত আশান্বিত হলাম। তোমার এই ভালবাসাই আমার জীবনে-মরণে একমাত্র সান্ত্বনা ও শান্তির উৎস।
যাতে আমি আমার চরম দুঃখের দিনে কিছুটা শান্তি পাই সেই আশায় আমার অশান্ত বুকে যে সব চিন্তার উদয় হচ্ছে তার কোন কিছুই আমি গোপন করব না তোমার কাছে।
আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য আমাদের দুশ্চিন্তা যদি আমাদের এতখানি বিব্রত ও বিপন্ন করে তোলে এবং সে চিন্তা যদি মৃত্যুর দিন পর্যন্ত সমানে আমাদের দুঃখ দিতে থাকে, যদি মনে কর একটি জাতিকে এই অভিশপ্ত জগতে এনে বা জন্ম দিয়ে তাদের দুঃখের কারণ হব আমরা, তাহলে এই অবাঞ্ছিত ঘটনা পরিহার করার শক্তি তো তোমার মধ্যেই আছে। তাহলে যারা এখনো জন্ম নেয়নি সেই হতভাগ্য জাতির জন্মকে তো তুমি আগেই নিবৃত্ত করতে পার।
তুমি এখনো পর্যন্ত নিঃসন্তান আছ এবং নিঃসন্তান অবস্থাতেই থাক। তাহলে মৃত্যু প্রতারিত হবে। তাহলে যে মৃত্যু তার করাল দংষ্ট্রাদ্বারা শুধু আমাদের ধ্বংসসাধন করেই ক্ষান্ত ও তৃপ্ত হবে।
আর যদি মনে করো দাম্পত্য প্রেমের আনুষ্ঠানিক বা আনুষঙ্গিক ক্রিয়াকর্ম ও আলিঙ্গনাদি শৃঙ্কারকার্য হতে বিরত থাকা কঠিন হয়ে পড়বে তোমার পক্ষে আর তার ফলে দীর্ঘায়িত হবে যত সব দুঃখ ও বেদনা, তাহলে এস, আমরা দুজনে নিজেদের জীবন সংক্ষিপ্ত করে নিজেরাই মৃত্যু ঘটিয়ে যত দুঃখ ও ভয়ের অবসান করি। আমাদের সন্তান জন্মের পথ বন্ধ করে দিই চিরতরে। মৃত্যু যদি নিজে থেকে না আসে তাহলে তার ভয়ে সারাজীবন না কেঁদে নিজেদের হাতেই মৃত্যু ঘটাই নিজেদের। ধ্বংসের দ্বারা ধ্বংসকে ধ্বংস করি।
এইখানেই তার কথা শেষ করল ঈভ। গম্ভীর হতাশায় রুদ্ধ হলো তার কণ্ঠস্বর। এতক্ষণ ধরে মৃত্যুর যে চিন্তা পোষণ করে আসছিল তার মনে সে চিন্তাপ্রভাবে মলিন ও বিবর্ণ হয়ে গেছে তার গণ্ডদ্বয়।
আদম কিন্তু ঈভের এই পরামর্শে বিচলিত হলো না কিছুমাত্র। অনেক কষ্ট করে অনেক চিন্তা করে আরও বড় ও ভাল আশার সন্ধান পেয়েছিল সে। সে তাই বলল, ঈভ, তুমি জীবনের প্রতি যে ঘৃণা প্রদর্শন করলে তাতে বোঝা যাচ্ছে জীবনে এক মহত্তর ও অধিকতর ভাল একটা কিছু আছে। তুমি তা কল্পনাও করতে পারনি। কিন্তু আত্মহনন জীবনের সেই বৃহত্তর দিকটাকে লাভ করতে দেবে না। ঘৃণা নয়, অন্তর্বেদনা ও অনুশোচনাই জীবন ও তার আনন্দকে উপেক্ষা বা অগ্রাহ্য করতে বাধ্য করেছিল।
আবার দেখ, যদি তুমি এই দীর্ঘায়িত দুঃখ ও যন্ত্রণার হাত হতে মুক্তি পাবার জন্য মৃত্যু কামনা করো এবং এইভাবে তোমার উপর আরোপিত দণ্ডকে পরিহার করতে চাও তাহলে মনে রেখো, তোমার আমার থেকে অনেক বেশি বিজ্ঞ ঈশ্বর অত সহজে আমাদের ছাড়বেন না। তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে আমাদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য হয়ত নূতন অস্ত্র প্রয়োগ করবেন। আমার মনে হয় মৃত্যুকে যদি আমরা এইভাবে ছিনিয়েও নিই তাহলে কিন্তু মৃত্যুযন্ত্রণার অবসান হবে না। কারণ এই যন্ত্রণাভোগ আমাদের করে যেতেই হবে, এটাই হলো ঐশ্বরিক শাস্তি। বরং আমরা একাজ করলে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর রেগে গিয়ে মৃত্যুর পরও বাঁচিয়ে রাখবেন আমাদের।
তার থেকে অন্য এক নিরাপদ সমাধানের খোঁজ করা উচিত। সে সমাধান মনে হয় পেয়ে গেছি। বিচারের রায় দেবার সময় ঈশ্বরপুত্র বলেন, তোমার বংশধরেরা সর্পকুলের মাথায় আঘাত করবে। আমাদের প্রধান শত্রু শয়তান সাপের রূপ ধরে আমাদের সঙ্গে যে, প্রতারণা করেছে তার জন্য আমাদের প্রতিশোধবাসনা কিছুটা চরিতার্থ হবে এইভাবে।
কিন্তু আমরা যদি নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যাই অথবা তোমার কথামতো আমরা সন্তান সৃষ্টি না করি তাহলে আমাদের সন্তানরা সাপদের মাথা ভাঙতে পারবে না এবং আমাদের প্রতিশোধবাসনা কোনভাবেই চরিতার্থ হবে না। তাহলে আমাদের শত্রু সব শাস্তি এড়িয়ে যাবে এবং সমস্ত শাস্তির বোঝা কেবল আমাদেরই বহন করে যেতে হবে।
সুতরাং আত্মহনন বা স্বেচ্ছাকৃত বন্ধ্যাত্বের কথা আর বলবে না। তাহলে আমাদের কোন আশাই থাকবে না। তাহলে শুধু আত্মবিশ্বাস আর অধৈর্যের সঙ্গে ঈশ্বরের ন্যায়সঙ্গত বিধানের বিরুদ্ধে ঘৃণা আর বিতৃষ্ণা পোষণ করে যাব মনে মনে।
একবার মনে করে দেখ, কত শান্ত ও ধীরভাবে ঈশ্বরপুত্র আমাদের সব কথা শুনে কোনরূপ রাগরোষ না করে বিচার করে গেছেন। সেদিন আমরা ভেবেছিলাম বিচারের সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যু ঘটবে আমাদের।
কিন্তু তার পরিবর্তে তিনি রায় দেন, তোমাকে শুধু সন্তানপ্রসবের কষ্টভোগ করতে হবে। কিন্তু প্রসবের পর তোমার গর্ভের ফলস্বরূপ সন্তানের মুখ দেখে আনন্দ পাবে আর সেই আনন্দের দ্বারা সব প্রসববেদনার কথা ভুলে যাবে।
আমার সম্বন্ধে রায় দেন, আমাকে প্রতিদিন শ্রমের দ্বারা জীবিকা অর্জন করতে হবে। কিন্তু ক্ষতি কি তাতে? আলস্য এর থেকে অনেক খারাপ। আমার শ্রমই আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে। পাছে শীততাপে আমাদের কষ্ট পেতে হয় তার জন্য তিনি যথাসময়ে যত্ন নিয়ে বস্ত্রাবরণে আচ্ছাদিত করেন। এইভাবে আমাদের মত পাপিষ্ঠ ও অযোগ্যদের বিচার করার সময়েও দয়া প্রদর্শন করেন তিনি।
