যদি আমরা তাঁর প্রার্থনা করি তাহলে তিনি তাঁর কুর্ণকুহর উন্মুক্ত করে নিশ্চয়ই তা শুনবেন। করুণা জাগবে তার অন্তরে।
বর্তমানে এই পাহাড়ে প্রকৃতির নির্দয়তাহেতু ঋতুবৈষম্যে বৃষ্টি, তুষার, ঝড় ও আরপাতে কষ্ট পাচ্ছি। তীক্ষ্ণ হিমেল বাতাস যখন ঝড়ের বেগে এই সব সুন্দর গাছগুলিকে বিদীর্ণ করে প্রবাহিত হচ্ছে, আমরা যেন আরও আমাদের অসাড় শীতার্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলিকে আচ্ছাদিত করতে চাইছি।
মেঘে মেঘে ঘর্ষণে বিদ্যুতাগ্নিতে পাইন ফার প্রভৃতি গাছগুলি যেমন প্রজ্জ্বলিত হয়ে ওঠে মাঝে মাঝে তেমনি দুটি কঠিন বস্তুর ঘর্ষণে যেমন অগ্নি উৎপন্ন করে, আমরা হয়ত এই তীব্র শৈত্য ও আমাদের পাপজনিত অশুভ শক্তিগুলি হতে মুক্ত করতে পারব নিজেদের।
কিভাবে প্রার্থনার দ্বারা তাঁর করুণা আকর্ষণ করতে হয় তা তিনিই শিখিয়ে দেবেন। মৃত্যুতে শেষ পরিণতি লাভের আগে পর্যন্ত কিভাবে আরাম-স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে জীবন যাপন করতে হয় তা তিনিই বলে দেবেন।
যেখানে ঈশ্বরপুত্র আমাদের বিচার করেছিলেন স্বর্গ হতে অবতীর্ণ হয়ে সেইখানে গিয়ে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত হয়ে আমরা যদি পরম ভক্তি ও শ্রদ্ধার সঙ্গে অনুতপ্ত চিত্তে আমাদের সব দোষ সব পাপ অকপটে স্বীকার করে তার কাছে মার্জনা ভিক্ষা করি, যদি আমরা আমাদের অনুতাপের অশ্রু দিয়ে সিক্ত করে দীর্ঘশ্বাসের দ্বারা বাতাসকে ভারী করে সব অহঙ্কার ও অভিমান ত্যাগ করে বিনয়াবনত চিত্তে তার নিকট অকুণ্ঠভাবে আত্মসমর্পণ করে আমাদের দুঃখের কথা নিবেদন করি তাহলে অবশ্যই তাঁর সব অসন্তোষ ও রোষাবেগ পরিহার করে তিনি সদয় হবেন আমাদের প্রতি। তাহলে তাঁর শান্তমিগ্ধ যে দৃষ্টিতে ভয়ঙ্কর রোষাগ্নি প্রজ্জ্বলিত হয়ে উঠেছিল সে দৃষ্টিতে আমাদের প্রতি অনুগ্রহ ও করুণার দ্যুতি ফুটে উঠবে।
এইভাবে আমাদের আদিপিতা তার অনুতাপ প্রকাশ করল। আদিমাতা ঈভও কম অনুতপ্ত হলো না। তারপর তারা সেই বিচারস্থানে গিয়ে শ্রদ্ধাপূর্ণ ও অনুতপ্ত চিত্তে প্রণিপাত হলো দুজনে। তাদের অশ্রুজলের দ্বারা ভূমিতল সিক্ত করে দীর্ঘশ্বাসের দ্বারা বাতাসকে ভারী করে বিনীতভাবে তাদের সব দোষ স্বীকার করে ক্ষমাভিক্ষা করল। নিবিড় অনুতাপের সঙ্গে তাদের দুঃখের কথা নিবেদন করল।
১০ম সর্গ
দশম সর্গ
এইভাবে তারা বিনয়ের সঙ্গে অনুতপ্ত চিত্তে দাঁড়িয়ে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করে যেতে লাগল। ক্রমে স্বর্গের ঊর্ধ্বলোকে বিরাজিত ঈশ্বরের আসন থেকে এক মহিমা তাদের অনুতাপে বিচলিত হয়ে নেমে এসে তাদের অন্তর হতে প্রস্তরকঠিন উপাদানটিকে অপসারিত করে সেখানে এক মেদুর মাংসল নূতন উপাদান ভরে দিল। এক অব্যক্ত বেদনা ও প্রার্থনা সমন্বিত তাদের অনুচ্চারিত দীর্ঘশ্বাস উচ্চকণ্ঠের বাগ্মিতার থেকেও দ্রুতগতিতে যেন পাখা মেলে উড়ে গেল স্বর্গলোকে। অতীতে পুরাণপুরুষ নোয়া ও তার স্ত্রী পইরা বিচারের দেবী থেমিসের বেদীর সামনে দাঁড়িয়ে সারা জগদ্ব্যাপী মহাপ্লাবনের কবল থেকে মানবজাতিকে উদ্ধার করার জন্য যে কাতর আবেদন জানিয়েছিল, আদম ও ঈভের আবেদন তাদের সেই আবেদনের থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।
আদম ও ঈভের সেই প্রার্থনা প্রতিকূল বাতাসের দ্বারা কোনভাবে বিঘ্নিত বা প্রতিহত না হয়ে, পথ ভুল না করে অভ্রান্ত অপ্রতিহত গতিতে স্বর্গলোকে উঠে গেল। নিরাবয়ব নিরালম্ব সেই প্রার্থনার অমূর্ত ধ্বনি অনায়াসে স্বর্গদ্বারে প্রবেশ করে ধূণাবাসিত ঈশ্বরের স্বৰ্গবেদীতে গিয়ে পুঞ্জীভূত হয়ে রইল।
পরম পিতার সিংহাসনের সম্মুখে বিরাজিত ঈশ্বরপুত্র তা দেখে মানবজাতির পরিত্রাতা হিসাবে বলতে লাগলেন, দেখ পিতা, মানবজাতির মধ্যে তুমি তোমার যে অনুগ্রহের বৃক্ষরোপণ করেছিলে পৃথিবীতে, সেই বৃক্ষ হতে প্রথম ফল ফলেছে। তাদের দীর্ঘশ্বাস ও প্রার্থনা এখানে এসে ধূপের গন্ধের সঙ্গে মিশ্রিত হয়েছে, আমি পুরোহিতের মতো তা তোমার সামনে উপস্থাপিত করেছি। তাদের অন্তরে তোমার হাতে বপন করা অনুতাপের বিশুদ্ধ বীজ হতে যে উপাদেয় ফল উৎপন্ন হয়েছে, তাদের পতনের আগে তাদের হাতে সার দেওয়া বর্ধিত স্বর্গোদ্যানের সব গাছগুলি একসঙ্গে মিলিত হয়েও সে ফল উৎপন্ন করতে পারত না।
এখন তাদের প্রার্থনা ও আবেদনের কথা শোন। তাদের ভাষাহীন দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে অব্যক্ত অনুচ্চারিত বেদনার কথা বোঝ। আমি তার ভাষা বুঝিয়ে দিচ্ছি। আমিই। তাদের প্রবক্তা ও পরিত্রাতা। তাদের সকল কাজ আমারই গুণের দ্বারা পূর্ণতা লাভ করবে। তাদের পাপজনিত সকল ক্ষতি মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পূরণ করে দেব আমি।
আমার কথা শোন। আমার মধ্য দিয়ে তাদের প্রেরিত সুবাসিত শান্তির আবেদন গ্রহণ করো। তোমার সঙ্গে পুনর্মিলিত হয়ে তারা জীবন-যাপন করুক। তাদের জীবন সীমাবদ্ধ। জীবনের দিনগুলি গোণা। মৃত্যু না আসা পর্যন্ত এমন একটি স্থানে তাদের উন্নত জীবন-যাপনের ব্যবস্থা করে দাও যেখানে আমার সমস্ত পাপমুক্ত মানবাত্মারা। বাস করতে পারে। তাদের পরম সুখ মূর্ত হয়ে উঠবে আমার মধ্যে। অনাবিল সুখ আর আমি অভিন্ন হয়ে উঠব।
তখন পরম পিতা বললেন, মানবজাতির জন্য তুমি যে সব অনুরোধ আমায় করেছ তা সবই আমি রক্ষা করব একে একে। এটাই আমার বিধান। কিন্তু মানুষ আর স্বর্গোদ্যানে বাস করতে পারবে না। প্রকৃতিকে যে নিয়মের বিধান দান করেছি তাতে তার আর স্থান হবে না সেখানে।
