জেরার মুখে ক্লাই প্রকাশ করে ফেললো–সে যেচে এসে আসামীর কাছে চাকরিতে ভর্তি হয়েছিল, এক স্টীমারের উপরে! কষ্টে পড়েছে, খেতে পাচ্ছে না ইত্যাদি বলেই সে আসামীর দয়া লাভ করেছিল। তারপর সে একটা রুপোর টি পট চুরি করে।
তৃতীয় সাক্ষী হলেন মিস্টার জার্ভিস্ লরী। সরকারী উকিলের সঙ্গে তার এইরকম প্রশ্নোত্তর হল :
–মিস্টার লরী, আপনি টেলসন ব্যাঙ্কের কর্মচারী?
–হ্যাঁ।
–১৭৭৫ সালের নভেম্বরে এক শুক্রবার রাত্রে ডোভার-মেলে যাত্রী ছিলেন আপনি?
-হ্যাঁ।
–ডাকগাড়িতে আর যাত্রী ছিল?
–দু’জন ছিল।
–তারা রাত্রির ভিতরেই রাস্তায় নেমে গিয়েছিল?
–গিয়েছিল।
–এই আসামী কি সেই দু’জনের ভিতর একজন? দেখে বলুন।
–বলা সম্ভব নয়। তারা দুজনেই এভাবে কাপড়-চোপড়ে ঢাকা ছিল, আর রাত্রি ছিল এমন অন্ধকার যে কারো মুখ বা আকৃতি কিছুমাত্র দেখতে পাইনি আমি।
–এ আসামীর সঙ্গে তাদের কারও কোন সাদৃশ্য ছিল না, এমন কথাও তো জোর করে বলতে পারেন না আপনি?
–তা পারি না।
–তাহলে এমনও হতে পারে যে, এ লোকটি ছিল সেদিন সে-গাড়িতে?
–তা হতেও পারে।
–এ আসামীকে আপনি দেখেছেন আগে?
–দেখেছি!
–কবে?
–ক্যালে থেকে আসবার সময়ে স্টীমারে। উনিও আসছিলেন।
–ক’টার সময়ে স্টীমারে উঠেছিল আসামী?
–রাত্রি বারোটার একটু পরে।
–অর্থাৎ, নিশুতি রাতে। ওসময়ে আর কেউ এসেছিল?
–না। উনি একাই এসেছিলেন।
–আপনি কি একা ভ্রমণ করছিলেন?
–আমার সঙ্গে দু’জন ছিলেন আরও। এক তরুণী মহিলা, এবং এক বৃদ্ধ। ভদ্রলোক। তারা এখানে উপস্থিত আছেন।
–ঐ সময় আসামীর সঙ্গে কোন কথা হয়েছিল আপনার?
–বিশেষ কিছু নয়।
সরকারী উকিল ডাকলেন–মিস্ ম্যানেট!
তরুণী মহিলাটি নিকটেই উপবিষ্ট ছিলেন, তার পিতার পাশে। সেইখানেই উঠে দাঁড়ালেন তিনি, সঙ্গে-সঙ্গে তাঁর পিতাও দাঁড়ালেন।
–কুমারী ম্যানেট! এই আসামীকে পূর্বে দেখেছেন কখনো?
–দেখেছি। যে স্টীমারের কথা আগের সাক্ষী এইমাত্র বললেন–সেই স্টীমারেই দেখেছি। মিস্টার লরীর সঙ্গিনী সেই মহিলা–আমিই।
–চ্যানেল পার হওয়ার সময়ে আসামীর সঙ্গে আপনার কোন আলাপ হয়েছিল–মিস্ ম্যানেট?
০০হয়েছিল।
–মনে করে বলুন তোকী কথা হয়েছিল!
–ভদ্রলোকটি যখন স্টীমারে উঠলেন—
–বলুন–আসামী।
–আচ্ছা। আসামী যখন স্টীমারে উঠলেন তখন খুব হাওয়া ছিল–ঝড়ের বেগে বইছিল হাওয়া। আমার পিতার স্বাস্থ্য তখন খুবই খারাপ ছিল। কীভাবে কোথায় তাঁকে রাখলে হাওয়া কম লাগবে তার গায়ে, সেই বিষয়ে দয়া করে উনি পরামর্শ দিয়েছিলেন আমায়। এইভাবেই আলাপের শুরু হয় তার সঙ্গে।
–উনি কি একা এসেছিলেন স্টীমারে?
–না, দু’জন ফরাসী ভদ্রলোক ছিলেন ওঁর সঙ্গে।
–কোন কাগজপত্রের আদান-প্রদান হয়েছিল কি–আসামী আর তাদের ভিতর?
–হ্যাঁ, তবে কী কাগজ, তা জানি না আমি।
–কী কথা হয়েছিল আপনার সঙ্গে আসামীর?
–উনি বলেছিলেন–খুব গোপনীয় কাজে উনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সে কাজ যে কী, তা প্রকাশ হয়ে পড়লে অনেক লোক বিপদে পড়ে যেতে পারে হয়তো। সেইজন্য উনি ভ্রমণ করছিলেন বেনামীতে। অনেকবার ফ্রান্স আর ইংলন্ডের মাঝে ঘোরাঘুরি করতে হয়েছে, এবং পরে আরও অনেকবার হয়তো ঘুরতে হবে, এ রকম কথাও বলেছিলেন তিনি।
–আমেরিকা সম্বন্ধে কিছু বলেছিল আসামী?
–আমেরিকার সঙ্গে ইংলন্ডের কলহ কী করে শুরু হল, তাই বলেছিলেন তিনি। তার মতে ইংলন্ডেরই অন্যায় ছিল এ কলহে। রহস্য করে তিনি একথাও বলেছিলেন যে, হয়তো ইতিহাসে জর্জ ওয়াশিংটনের নাম, রাজা তৃতীয় জর্জের সমানই গৌরব লাভ করবে একদিন। তবে কথাটা নিছক রহস্যই, আমাদের মহান্ রাজাকে খেলো করবার উদ্দেশ্য ওর ভিতর ছিল না মোটেই।
এইভাবে সাক্ষ্য দিতে, কুমারী ম্যানেট যে খুবই দুঃখ অনুভব করছেন, তা আদালত কক্ষে উপস্থিত অগণিত লোক কারুরই বুঝতে বাকি ছিল না। সত্যিই দুঃখের কারণ ছিল কুমারীর। ডার্নে যেরকম ভদ্র ব্যবহার করেছিলেন জাহাজের উপর, তাতে তার কাছে কুমারী কৃতজ্ঞ হয়েই আছেন। অথচ সত্যের খাতিরে যে-কথা তাকে এখন বলতে হচ্ছে আদালতে, তা হয়ত জুরীর বিচারে ডানের বিরুদ্ধেই যাবে। ডার্নের যদি মৃত্যুদণ্ডই হয়, তবে তার জন্য কুমারী ম্যানেটকেও খানিকটা নিমিত্তের ভাগী হতে হবে বই কি!
অতঃপর সরকারী উকিল এই মহিলার পিতাকে সাক্ষ্য দিতে আহ্বান করলেন। ডাক পড়লো’ডাক্তার ম্যানেট!
–ডাক্তার ম্যানেট, এই আসামীকে দেখুন। পূর্বে একে দেখেছেন কখনো?
–একবার আমার লন্ডনের বাসায় এসেছিলেন উনি। তিন বা সাড়ে তিন বৎসর আগে।
–সীমারে একে দেখেছিলেন আপনি? আপনার কন্যার সঙ্গে আসামীর যে আলাপ হয়েছিল সেই স্টীমারে–তা শুনেছিলেন আপনি?
–আমি এ-সম্বন্ধে কিছুই বলতে পারি না মহাশয়।
–না পিরবার কোন বিশেষ কারণ আছে কি?
–আছে।–অত্যন্ত নিম্নস্বরে এই কথা বললেন ম্যানেট।
–বিনা বিচারে দীর্ঘদিন আপনাকে কি কারারুদ্ধ থাকতে হয়েছিল স্বদেশে?
–দীর্ঘ দিন, দীর্ঘ দিন!–এমন করুণ সুরে ম্যানেট এই কথা বললেন যে, উপস্থিত সমস্ত লোকের হৃদয় ব্যথায় ভরে উঠলো তা শুনে।
–আপনি কি ঐ স্টীমারে উঠবার অল্পদিন আগে মুক্ত হয়েছিলেন–সেই কারাবাস থেকে?
–তাই শুনেছি বটে।
–আপনার কি সে-কথা কিছুই মনে নেই?
–কিছু না। কারাগারে কবরস্থ হবার কিছুদিন পরেই আমার স্মৃতি, বুদ্ধি, চৈত্য সবই লোপ পায়। আমার মাথা এবং মন তখন ছিল একেবারে শূন্য। সে সময় আমি জুতো সেলাই করতাম কেবল। নিজের এবং পৃথিবীর সম্বন্ধে আমি আবার সচেতন হয়ে উঠলাম, লন্ডনে আসবার পর, আমার এই কন্যার সেবায় ও সাহচর্যে। আমার মানসিক শক্তি ফিরে পাবার কত দিন আগে থেকে যে কন্যার সেই সেবা ও সাহচর্য আমি পাচ্ছিলাম–সে-সব কিছুই মনে নেই আমার।
