যাই হোক, হাত-পা কেটে বা ছিঁড়ে বেরিয়ে যাবার পরেও প্রাণ বলতে যদি কিছু অবশেষ থাকে আসামীর দেহে, তবে তার অবসান করবার জন্য এইবার গলায় এক ঘা তলোয়ার বা কুড়াল বসানোর জন্য জল্লাদকে ডাকা হয় চটপট। আজকের আসামীটাকে দেখলে তো বেশ ভালো বলেই মনে হয়। দিব্য ভদ্রলোকের মত চেহারা, বছর পঁচিশ বয়স হবে, বেশ পুষ্ট নধর দেহ, পোশাক সাধারণ হলেও পরিচ্ছন্ন। বর্তমান বিপদের জন্য মুখটা বিবর্ণ, কিন্তু কোনরকম চাঞ্চল্যের পরিচয় নেই তার ভাবভঙ্গির ভিতর। বেশ গম্ভীর সংযত ভাবেই সে নমস্কার করলো জজ ও জুরী মহোদয়গণকে।
আসামীর উকিল একগোছা কাগজ নিয়ে ক্রমাগত নাড়া-চাড়া করছেন। আর, তার কাছেই আর-একটি পরচুলা-পরা (তখন সব উকিলই পরচুল পরতেন) উকিল বসে-বসে ছাদের কড়িকাঠ গুনছেন। সরকারী উকিল সওয়াল শুরু করলেন।
“কয়েক বৎসর থেকেই আসামী চার্লস ডার্নে ক্রমাগত ইংলিশ চ্যানেল পারাপার করছে। কী এত প্রয়োজন তার ফ্রান্সে? কেন যায় সে ঘন-ঘন ও-দেশে? খুব সন্দেহজনক নয় কি তার গতিবিধি?
জন বরসাদ হল ঐ ডার্নেরই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। “হল” না বলে, “ছিল” বলাই উচিত বোধহয়। কারণ, আসামীর জঘন্য আচরণের যা পরিচয় পাওয়া গিয়েছে, তাতে সাক্ষী মিঃ বরসাদের মত মহানুভব দেশপ্রেমিকের পক্ষে তাকে আর বন্ধু বলে মনে করা সম্ভব নয়। আসামীর জঘন্য আচরণের পরিচয় প্রথমে এই মিঃ বরসাদই পান, এবং নিছক দেশপ্রেমের তাগিদেই তাঁকে প্রকাশ করে দিতে হয়েছে উক্ত জঘন্য আচরণের কথা। জঘন্য আচরণটা কি?না, ডানে গুপ্তচর। মহা-মহিমান্বিত সদাশয় সর্বগুণান্বিত ইংলভাধিপ শ্রীল তৃতীয় জর্জের সৈন্যবাহিনীতে কত সৈন্য আছে, সে সব সৈন্য কোথায় কোথায় আছে, কী কী অস্ত্রে তারা শিক্ষালাভ করছে–এইসব গুরুতর বিষয়ের সমস্ত খুঁটিনাটি সংবাদ যে কোন উপায়ে সংগ্রহ করে তাই ফরাসীরাজ লুইয়ের দরবারে পেশ করাই হল তার পেশা। ঐসব সংবাদ সরবরাহ করতে তাকে নিজের চোখে দেখেছেন দেশপ্রেমিক বরসাদ। আসামী ঐসব বিবরণ যে কাগজপত্রে লিখে রেখেছিল, তা তার পকেটে ও টেবিলের দেরাজে পাওয়া গিয়েছে, পেয়েছে তারই ভৃত্য। উক্ত ভৃত্যও–তার গুপ্তচর-প্রভুর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে এসেছে; এসেছে দেশপ্রেমেরই তাগিদে।”
সওয়াল শেষ করে সরকারী উকিল বরসাদ এবং রোজার ক্লাইয়ের সাক্ষ্য গ্রহণ করলেন। বাদ ছিল ডানের বন্ধু, ক্লাই ছিল তার ভৃত্য। উকিল পূর্বেই যা বলে রেখেছেন, সাক্ষীরা পরে এসে বললো সেই কথাই। তবে জেরাতে ও-ছাড়াও দু’চারটে নতুন কথা প্রকাশ হয়ে পড়লো। বরসাদের মুখ থেকে যা শোনা গেল তা কতকটা এই রকম :
–তুমি নিজে কোনদিন গুপ্তচর ছিলে?
–না। ও-রকম বদনাম যে দেয়, তাকে ঘৃণা করি আমি।
–কিসে চলে তোমার?
–সম্পত্তি আছে, মশাই!
–সম্পত্তিটা কোথায়?
–সেটা–সেটা ঠিক মনে পড়ছে না চট করে।
–সম্পত্তিটা কী?
–তাতে অন্যের কি প্রয়োজন, মশাই?
–সম্পত্তিটা কারও কাছ থেকে পাওয়া বোধ হয়?–হ্যাঁ, তা বই কি।
কার কাছ থেকে?
–দূর সম্পর্কের আত্মীয় ছিল একজন
–খুবই দূর–বোধ হয়?
–তা, দূরই বটে!
–জেলে গিয়েছিলে কখনো?
–নিশ্চয়ই না।
–দেওয়ানি জেলে? দেনার দরুন?
–এ-মামলার সঙ্গে সে-কথার সম্বন্ধ কী, তা তো বুঝতে পারছি না।
–আবারও বলছি, দেওয়ানি জেলে গিয়েছিলে? উত্তর দাও।
–তা, হ্যাঁ—
–কতবার?
–দু’তিনবার হবে।
–না–পাঁচ-ছ’বার।
–তাও হতে পারে হয়তো!
–পেশা কি?
–ভদ্রলোক! ভদ্রলোকের আবার পেশা কি?
–লাথি খেয়েছো কখনো? কারো কাছে?
–তা—হয়তো–
–বহুবার?
–না, না!
–লাথি মেরে সিঁড়ির ওপর থেকে নিচে ফেলে দিয়েছিল কেউ?
–না, না। সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎ-ই লাথিটা পড়লো এসে! টাল সামলাতে না পেরে নিজেই পড়ে যাই!
–লাথি খেয়েছিলে, জোচ্চুরির দরুন তো?
–বলেছিল বটে সেই মিথক লোকটা। কিন্তু ওটা মিছে কথা! লোকটা মাতাল ছিল তখন!
–যদি বলি, জোচ্চুরিই তোমার পেশা? তাই করেই দিন চলে তোমার?
–কখনো না।
–আসামীর কাছে টাকা ধার করেছিলে?
–হ্যাঁ।
–সে টাকা শোধ দিয়েছিলে?
–না।
–আসামীর সঙ্গে যে বন্ধুত্বের কথা তুলেছে, সেটা কী রকম বন্ধুত্ব? তুমিই গায়ে পড়ে পড়ে খানিকটা আলাপ-পরিচয় জমিয়েছিলে, কী বলে? গাড়িতে, স্টীমারে, হোটেলে এবং রাস্তায়ই যা-কিছু আলাপ–কী বলো?
–না, তা হবে কেন?
–তুমি গভর্নমেন্টের মাইনে-করা গোয়েন্দা কি?
–বলেন কি মশাই?
–এই মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার দরুন বকশিশ পাবে কিছু?
–আরে বলেন কি মশাই?
–ভগবানের নামে দিব্যি করে বলতে পারো এ-কথা?
–লক্ষ বার!
আসামীর কোন এক সময়ের ভৃত্য রোজার ক্লাইকে সরকারী উকিল খুব জোর সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন। সে নাকি কর্তব্যের জন্য সবই করতে পারে। সে নাকি উঁচুদরের দেশপ্রেমিক। জবানবন্দীতে সে বলেছিল–আসামীর পকেটে সে লম্বা লম্বা তালিকা দেখতে পেতো প্রায়ই। ক্যালে বন্দরে একদিন আসামী এই ধরনের কয়েকখানা তালিকা দিয়েছিল এক ফরাসী ভদ্রলোককে। এসব তালিকায় প্রায়ই যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্রের কথা থাকত, যুদ্ধের সময় কোন্খানে ঘাঁটি করলে ভালো হবে, কোন্ জায়গা সকলের আগে দখল করবার দরকার হবে, এসব কথারই উল্লেখ দেখা যেত। সাক্ষী যখন বুঝতে পারলো যে তার প্রভু গুপ্তচর, তখন আর তার পক্ষে চুপ করে বসে থাকা সম্ভব হল না। দেশপ্রেমের প্রেরণায় সে গভর্নমেন্টের কাছে এসে প্রকাশ করতে বাধ্য হল তার প্রভুর জঘন্য বৃত্তির কথা। সে এক নম্বর সাক্ষীকে চেনে। জন বাদ নাম তার। প্রায় সাত-আট বৎসর থেকে চেনে।
