সরকারী উকিল এইবার আর-একজন সাক্ষী ডাকলেন। সে লোকটির বক্তব্য এইরকম :
পাঁচ বৎসর আগে নভেম্বর মাসের এক শুক্রবার রাত্রে ডোভার-মেলের অনেক যাত্রীর ভিতর আসামী ছিল একজন। পথের কোন এক স্থানে সে নামে। তারপর মাইল-বারা পথ সে ফিরে আসে পায়ে হেঁটে, পুলিশের চোখে ধূলো দেবার জন্য। ফিরে আসে এক শহরে যার অতি নিকটে রয়েছে রাজার এক বৃহৎ সেনানিবাস। সেখানে এসে সেনানিবাসের খুঁটিনাটি বিবরণ সংগ্রহ করে সে। এই সময়ে এক হোটেলে সাক্ষী তাকে দেখতে পায়। জীবনে সেই একবারই দেখেছে আসামীকে; এই আসামী যে সেই ব্যক্তি, তাতে সাক্ষীর কিছুমাত্র সন্দেহ নেই।
এ সাক্ষী সত্যই বিপদ ঘটাবে। আসামীর উকিল জেরা করেও ওর কোন গলদ এ টেল অব টু সিটীজ। বার করতে পারছেন না। এমন সময়ে একটা ঘটনা ঘটলো।
আসামীর উকিলের নিকটেই আর-একজন উকিল ছাদের দিকে তাকিয়ে বসেছিলেন গোড়া থেকে, এ-কথা আগেই বলা হয়েছে। এই ভদ্রলোক হঠাৎ এক টুকরো কাগজে কি লিখে আসামীর উকিলকে ছুঁড়ে মারলেন। তিনি সে কাগজ পড়ে এক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন, তারপর তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলেন একবার আসামীর মুখের দিকে, আর একবার সেই পত্ৰলেখক উকিল বন্ধুর দিকে! এইবার তিনি প্রশ্ন করলেন সাক্ষীকে
–তুমি সেই হোটেলে যাকে দেখেছিলে, সে যে এই আসামী, এ-কথা তুমি শপথ করে বলছো?
–অবশ্য।
–আসামীর সঙ্গে চেহারায় হুবহু মিল আছে, এমন কোন লোককে তুমি দেখেছো
কখনো?
–এমন মিল কারো দেখিনি–যাতে লোক ভুল হবে, মশাই!
–ঐ যে উকিল ভদ্রলোক বসে আছেন ছাদের দিকে তাকিয়ে, ওঁকে দেখ তো একবার! তারপর আসামীকে দেখ আবার! কী বলল এখন? একজনকে দেখে আর-একজন বলে ভুল হতে পারে কি?
উকিলের এই অদ্ভুত অনুরোধে শুধু সাক্ষী কেন, আদালতসুদ্ধ লোক বিস্ময়ে অবাক হয়ে গেল। একজনকে দেখে আর-একজন বলে ভুল! ওরা কি যমজ ভাই। নাকি?–জজ, জুরী, উকিল, পুলিশ, শত-শত দর্শক–সবাই দম বন্ধ করে তাকাতে লাগলো–একবার এর দিকে, একবার ওর দিকে। জজের আদেশে উকিল ভদ্রলোক মাথায় পরচুলা খুলে ফেলে দিলেন। এইবার আর কারোই সন্দেহ রইল না যে, একটা অদ্ভুত মিল রয়েছে, দু’জনের মুখের চেহারায়। আসামী হয়তো একটু বেশি সংযত ও গম্ভীর, উকিল-লোকটির মুখে-চোখে হয়তো অসংযত জীবন যাপনের দরুন দু’চারটে বাড়তি রেখাপাত হয়েছে এখানে-ওখানে, কিন্তু মোটামুটি সাদৃশ্য অতিশয় প্রবল। যে-লোক এঁদের দুজনকেই খুব ভালরকম চেনে না, তার চোখে দু’জনের চেহারার ঐ অতি সামান্য পার্থক্যটুকু দিনের আলোতেও ধরা পড়া সম্ভব নয়।
“তাহলে কি মিস্টার কার্টনকেই এখন রাজদ্রোহের অপরাধে অভিযুক্ত করতে বলছেন নাকি?” জজ সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন আসামীর উকিলকে।
কার্টন হল ঐ উকিল-ভদ্রলোকের নাম, আসামীর সঙ্গে যাঁর চেহারার মিল মামলাটিকেই বানচাল করে দিতে বসেছে।
কার্টনকে অভিযুক্ত করার অভিসন্ধি কারোই ছিল না, কিন্তু ডার্নের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রমাণ যা-কিছু ছিল, তার অর্ধেকই ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেল। জুরীরা অনেক বিবেচনা এ টে অব টু সিটীজ ও বিতর্কের পরে রায় দিতে বাধ্য হলেন যে, আসামীকে অপরাধী বলে সাব্যস্ত করবার মত জোরালো প্রমাণ কিছুই পাওয়া যায়নি। অগত্যা জজ ডার্নেকে মুক্ত করে দিতে আদেশ দিলেন, ঘোর অনিচ্ছায়। অনিচ্ছা এইজন্য যে, জর্জ ওয়াশিংটন সম্বন্ধে ডানের উচ্চ ধারণা ভয়ানক চটিয়ে দিয়েছে রাজভক্ত জজ বাহাদুরকে। কোন সাক্ষ্য-প্রমাণ তার বিরুদ্ধে থাক বা না-থাক, ডার্নেকে দণ্ড দিতে পারলেই তিনি খুশি হতেন।
ডার্নে মুক্ত হলেন, এবং সেই থেকে ম্যানেট-পরিবারের সঙ্গে তার আত্মীয়তা গাঢ়তর হয়ে উঠলো। মামলার কালে লুসী ম্যানেট ও তাঁর পিতা ডানের উপর যে সহানুভূতি প্রকাশ করেছিলেন, তার দরুন ডার্নে চিরদিনের জন্য কৃতজ্ঞ হয়ে রইলেন তাদের কাছে।
ওদিকে একান্ত অপরিচিত মাতাল যুবক সিডনী কার্টনও এই সূত্রে পরিচিত হয়ে উঠলো ম্যানেট-পরিবারের সঙ্গে। ডার্নের সঙ্গে তার চেহারার মিল সকলেরই একটা বিস্ময়ের বস্তু হয়ে রইলো!
এই মিল যে ওদের সকলেরই জীবনের উপরে কতখানি ছায়াপাত করবে ভবিষ্যৎ-জীবনে, সে-কথা কিন্তু তখন কেউ বুঝতে পারেনি।
০৪. দণ্ডমুণ্ডের মালিক
প্যারী নগরে বিরাট এক রাজপ্রাসাদ।
রাজপ্রাসাদ বটে কিন্তু এই প্রাসাদের মালিক ঠিক রাজা নন। রাজার ঠিক নিচেই। যাঁদের স্থান, রাজার অসীম প্রতাপ আর ক্ষমতা পরিচালিত হয় যাঁদের হাত দিয়ে ইনি তাদেরই একজন।
এঁর দরবারে সেদিন সকাল বেলায় অতি লোকের আমদানি হয়েছে। সবাই প্রভুর দর্শনের অভিলাষে এসেছে। প্রভু যেন ভুলে না যান, এইজন্যই হাজিরা দেওয়া। আর হাজিরা দিতে যারা এসেছে তারাই কি বড় নগণ্য? দু’চারটে মাকুইস মার্শালও আছে ঐ দলে–যারা নিজের নিজের এলাকায় প্রত্যেকেই হাজার হাজার লোকের দণ্ডমুণ্ডের মালিক।
সারি-সারি ঘর। এক ঘরের ভিতর দিয়ে অন্য ঘরের দরজা। বহুমূল্য আসবাবে, রাজকীয় আড়ম্বরে সাজানো সব ঘর। সব ঘরেই অভ্যাগতের ভিড়। প্রভু আছেন এই সারিবদ্ধ ঘরের শেষ ঘরখানিতে। দরজা বন্ধ করে চকোলেট পান করছেন তিনি। চারজন সুদক্ষ চাকরের সাহায্য দরকার হয় প্রভুর চকোলেট খাবার সময়।
চারজনের জায়গায় তিনজন হলে চলে না। অচল তো হয়ই, প্রভু নিজেকে অবহেলিত, অপমানিত মনে করেন। এ-রকম অঘটন ঘটেনি কোনদিন, ঘটতে যদি–ফরাসী দেশকে রসাতলে দিতেন প্রভু! চারজন ভৃত্যের কমে চকোলেট খাওয়া? কী করে হতে পারে? একজন নিয়ে আসবে চকোলেটের স্বর্ণপাত্র, একজন নাড়বে সেই চকোলেট সোনার কাঠি দিয়ে, আর একজন সোনার তারে গাঁথা চীনদেশের রেশমী কাপড় দিয়ে ঢাকা দেবে প্রভুর অঙ্গ, যাতে চকোলেটের ছিটেফোঁটা
